সম্পাদকীয় ১

স্বাগত উদ্যোগ

যে অমনোযোগের দরুন ভারত ও বাংলাদেশের ছিটমহলগুলি এক দিন উত্‌পন্ন হইয়াছিল, সেই একই প্রশাসনিক অমনোযোগ উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে তাহাদের এত কালের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করিয়াছে। একতরফা ভাবে এবং তাড়াহুড়ায় ব্রিটিশ শাসকরা দেশভাগের কাজটি সমাধা করেন। ভারতীয় পরিবার অধ্যুষিত ভূখণ্ড পূর্ব পাকিস্তানে পড়িয়া যায়, আবার পূর্ব বাংলার জমিও ভারতের ভূগোলের অন্তর্ভুক্ত হইয়া পড়ে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৪ ০০:০০
Share:

যে অমনোযোগের দরুন ভারত ও বাংলাদেশের ছিটমহলগুলি এক দিন উত্‌পন্ন হইয়াছিল, সেই একই প্রশাসনিক অমনোযোগ উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে তাহাদের এত কালের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করিয়াছে। একতরফা ভাবে এবং তাড়াহুড়ায় ব্রিটিশ শাসকরা দেশভাগের কাজটি সমাধা করেন। ভারতীয় পরিবার অধ্যুষিত ভূখণ্ড পূর্ব পাকিস্তানে পড়িয়া যায়, আবার পূর্ব বাংলার জমিও ভারতের ভূগোলের অন্তর্ভুক্ত হইয়া পড়ে। এই ছিটমহলের বাসিন্দারা সুদীর্ঘকাল কোনও দেশেরই নাগরিকত্ব পান নাই, স্বাভাবিক জীবনধারণের অধিকারও পান নাই। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হইবার পর দুই দেশের ছিটমহলগুলি হস্তান্তরের প্রস্তাবটি গৃহীত হইলেও তাহা কার্যকর হয় নাই। নয়াদিল্লি অবশেষে ইউ পি এ আমলে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সম্পাদনের পথে অগ্রসর হয়। কিন্তু তখন এক দিকে সংসদীয় বিরোধী দল বিজেপি, অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় এই প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সংবিধান-সংশোধন করা যায় নাই। এখন বিজেপি পরিচালিত এনডিএ সরকারই এই বিষয়ে উদ্যোগী, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সম্মতির সংকেত দিয়াছেন। ইহা শুভ সমাচার।

Advertisement

বিরোধী পক্ষে থাকা কালে এমন অনেক বিল বা প্রস্তাবেরই বিজেপি বিরুদ্ধতা করিয়াছে, ক্ষমতাসীন হইয়া যেগুলি রূপায়ণ করিতে তাহারা ব্যগ্র। সম্ভবত ইহাই ক্ষমতার নিজস্ব নিয়ম। ক্ষমতাহীনতা রাজনীতিকদের মধ্যে যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও বেপরোয়া মনোভাবের জন্ম দেয়, ক্ষমতা তাঁহাদেরই অনেক বেশি দায়িত্বশীল করিয়া তোলে। তখন সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ অপেক্ষা দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা অগ্রাধিকার পাইতে থাকে। ছিটমহল লইয়া বিজেপির মনোভাবের পরিবর্তন তাহারই প্রমাণ। বাংলাদেশের সহিত নিবিড় সুসম্পর্ক গড়ার আবশ্যকতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিলক্ষণ অনুভব করিয়াছেন। আর সেই পথে ছিটমহল বিনিময় এবং তিস্তার জলবণ্টন সংক্রান্ত বিরোধ যে বাধাস্বরূপ, তাহা বুঝিতেও অসুবিধা হয় নাই। সংসদে ছিটমহল বিনিময় বিষয়ক সংবিধান সংশোধনী পাশ হইতে অতএব আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসও এই প্রশ্নে আপন মতান্তর প্রত্যাহার করিয়া লওয়ায় চলতি শীতকালীন অধিবেশনেই সংসদ এই সংশোধনী পাশ করিতে পারিবে। ছিটমহলের বাসিন্দাদের বহু কালের বঞ্চনা ও অসহায়তার দুর্গতি ঘুচিবে।

অতঃপর তিস্তার জলবণ্টন সংক্রান্ত বিরোধটিরও মীমাংসা হওয়া দরকার। বাংলাদেশ যতটা জল চাহিতেছে, ততটা মঞ্জুর করিলে হয়তো উত্তরবঙ্গের নদীসেবিত কৃষি-সেচ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। ক্ষতির পরিমাণ ন্যূনতম রাখিয়া কী ভাবে বাংলাদেশের প্রয়োজনও মেটানো যায়, দেখিতে হইবে। তিস্তার অববাহিকা যেহেতু উত্তরবঙ্গেই ব্যাপ্ত, তাই এ ব্যাপারে যে-কোনও সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহিত আলোচনাসাপেক্ষেই গ্রহণ করা যায়। মনমোহন সিংহের সরকার তাহা না করিয়া রাজ্যকে উপেক্ষা করিয়াছিলেন বলিয়াই মমতা সে দিন প্রধানমন্ত্রীর সহযাত্রী হইতে অস্বীকার করেন, তিস্তা চুক্তিও বিশ বাঁও জলে তলাইয়া যায়। নরেন্দ্র মোদীর সরকার নিশ্চয় যুক্তরাষ্ট্রীয়তার সেই দাবি অস্বীকার করিবেন না। একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও বুঝিতে হইবে, এই জলবণ্টন চুক্তির সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহিত সম্পর্কের বিষয়টি জড়িত। রাজ্যের উপর দিয়া প্রবাহিত হইলেও তিস্তার জলের উপর অধিকার একা রাজ্যের নয়, বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক আইন ও প্রথা অনুযায়ী তাহার অংশীদার। খাগড়াগড় বিস্ফোরণে পলাতক বাংলাদেশি জঙ্গিদের জড়িত থাকা লইয়া ইতিমধ্যেই মমতা-বিরোধী জনমত প্রবল। তিস্তার জল লইয়া অনমনীয় মনোভাব তাহাকে আরও তীব্রই করিবে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement