রাহুল গাঁধীর এখন অখণ্ড অবসর। অসমের নির্বাচনের ফলটি তিনি গভীর ভাবে পড়িয়া দেখিতে পারেন। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহরাও কাজটি করিলে ভাল করিবেন। একটি সর্বভারতীয় দলের রাজ্য স্তরের সহিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সম্পর্কটি ঠিক কোন তারে বাঁধা উচিত, অসমের ফলাফল তাহা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলিয়া দিয়াছে। যে রাজ্যে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি, এবং যেখানে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মুসলমান, সেখানে রাহুল গাঁধী বদরুদ্দিন আজমলের সহিত জোট করিয়া উঠিতে পারিলেন না। আজমল তাঁহার আসনে কংগ্রেসের প্রার্থীর নিকট হারিয়াছেন, কিন্তু রাজ্যে তাঁহার দলের ভোটের ভাগ অক্ষত। অন্য দিকে, কংগ্রেসের ভোট দশ শতাংশ-বিন্দু কমিয়া গিয়াছে। রাজ্যে মুসলমান ভোট যে ভাগ হইয়াছে, তাহা সম্ভবত রাহুল গাঁধীও বুঝিতেছেন। বুঝিতে অন্যদের এতখানি দেরি হয় নাই। তরুণ গগৈদের পক্ষে যাহা বলা সম্ভব ছিল না, বদরুদ্দিন আজমল তাহা বলিয়া দিয়াছিলেন— রাহুল গাঁধীর কারণেই বিজেপি সুবিধা পাইল। রাজ্য-রাজনীতির সহিত সংযোগহীন কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতেই রাজ্যের রাশ থাকিলে যাহা হওয়ার, অসমে কংগ্রেসের তাহাই হইয়াছে। ভরাডুবি।
সাম্প্রতিক অতীতে দিল্লি এবং বিহারে বিজেপিরও ভরাডুবিই হইয়াছিল, এবং কার্যত একই কারণে। অসমে নরেন্দ্র মোদী বিজেপির প্রচারের মুখ ছিলেন না, দল সর্বানন্দ সোনোয়ালকে সামনে রাখিয়াছিল। ঘুঁটি সাজাইবার দায়িত্বও ছিল সোনোয়াল ও হিমন্ত বিশ্বশর্মার উপর। সিদ্ধান্তটি দ্বিবিধ কারণে লক্ষণীয়। এক, মোদী ঝড়ের ভরসায় না থাকিয়া, অথবা কিরণ বেদীর ন্যায় কাহাকে উপর হইতে চাপাইয়া না দিয়া ভূমিপুত্রদের উপর নির্ভর করা; দুই, দলের স্থানীয় নেতৃত্বে ওজন আনিতে অসম গণ পরিষদ হইতে আগত সোনোয়াল ও সদ্য কংগ্রেস-ত্যাগী বিশ্বশর্মাকে দায়িত্ব দিতে দ্বিধা না করা। ফলাফল বলিতেছে, জল মাপিতে বিজেপি নেতৃত্বের ভুল হয় নাই। বিধানসভা নির্বাচনে স্থানীয় প্রশ্ন এবং স্থানীয় আবেগের গুরুত্ব কতখানি, বিহারের ভুল হইতে বিজেপি সম্ভবত শিখিয়াছে। অসম গণ পরিষদ ও বোরো পিপলস ফ্রন্ট-এর সহিত জোটও তাৎপর্যপূর্ণ। সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ নহে, অসমের মাটিতে যে অসমিয়া খণ্ডজাতীয়তাই অধিকতর কার্যকরী হইবে, এই কথাটি বুঝিতে পারা বিজেপি-র পক্ষে গিয়াছে। ১৯৮৩ সালের যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী আইন সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমিয়ার মতে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী তোষণের হাতিয়ার ছিল, তাহার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা জিতিয়া সোনোয়াল ‘জাতীয় নায়ক’-এর শিরোপা পাইয়াছিলেন। তাঁহাকেই সেনাপতি করিবার মধ্যে বিচক্ষণতা অনস্বীকার্য।
বিজেপি যে ভাবে তাহার মেরুকরণের রাজনীতিটিকে ব্যবহার করিয়াছে, তাহাও লক্ষণীয়। আর্যাবর্তের হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তানমার্কা জাতীয়তাবাদ নহে, অনুপ্রবেশ-বিরোধী আবেগ ব্যবহার করিয়া বিজেপি তাহার রাজনীতি সাজিয়াছিল। তাহার মধ্যে নিহিত হিন্দুত্ববাদ বিলক্ষণ ছিল, কারণ বাংলাদেশ হইতে আগত মুসলমানরাই ‘অনুপ্রবেশকারী’, আর হিন্দুরা ‘শরণার্থী’। আগ্রাসী জাতীয়তাবাদও ছিল। কিন্তু বিজেপি-র কৃতিত্ব এখানেই তাহাদের সর্বভারতীয় রাজনীতিকে দলটি অসমের স্থানীয় রাজনীতির খাপে পুরিয়া ফেলিতে পারিয়াছে। দিল্লি হইতে নির্বাচনটি পরিচালিত হইলে কাজটি এমন মসৃণ ভাবে হইত কি না, সন্দেহ আছে। তরুণ গগৈ বিজেপির আরও একটি সুবিধা করিয়া দিয়াছিলেন। খণ্ডজাতীয়তার বড় দাবি উন্নয়ন। তাঁহার তিন দফার শাসনে গগৈ তাহার ব্যবস্থা করিতে ব্যর্থ। সেই ফাঁকটিও বিজেপি মোক্ষম ব্যবহার করিয়াছে। কী ভাবে রাজ্যে লড়িতে হয়, বিজেপি শিখিয়াছে। কংগ্রেস শিখিবে, ভরসা নিতান্তই কম।