ছবি: মৃণাল মাইতি
নৈনিতাল (অ)যাত্রা
জিম করবেটের নৈনিতাল, বিবেকানন্দের আলমোড়া, গাঁধীজির কৌশানি, রামায়ণ কথিত কুমায়ুন পর্বত বহু বছর ধরেই ভ্রমণপিপাসু বাঙালিকে টানছে। হাওড়া থেকে ট্রেনে করে সরাসরি নৈনিতাল যাওয়ার একটাই ট্রেন: বাগ এক্সপ্রেস। ১৩০১৯ নম্বর ট্রেনটি হাওড়া থেকে রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে ১৩৫১ কিমি পথ অতিক্রম করে কাঠগুদাম পৌঁছয় সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে। সময় নেয় প্রায় ৩৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। আবার রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে কাঠগুদাম স্টেশন থেকে ছেড়ে হাওড়া পৌঁছয় দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে। সময় নেয় প্রায় ৩৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। দুর্গাপুর স্টেশন থেকে রাত ১২টা ২৮ মিনিটে বাগ এক্সপ্রেস। রিজার্ভেশন অনুযায়ী স্লিপার ক্লাস এস-৬-এ চড়ে বসলাম কাঠগুদামের উদ্দেশ্যে। অবাক ব্যাপার, এ রকম একটি দূরপাল্লার ট্রেনে প্যান্ট্রি কার নেই। ট্রেনে চা পাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন স্টেশনে বহিরাগত চা হকারদের কাছ থেকে চা কিনতে হচ্ছে। প্রতি কাপ ১০ টাকার চায়ে মুখ দেওয়া যায় না।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সিটের দখল চলে গেল লোকাল যাত্রীদের দখলে। নৈনিতালের আকর্ষণে যাওয়ার সময়ের যন্ত্রণাটা তবু সয়ে গেছিল। আসার সময় সবাই যন্ত্রণা টের পেলাম হাড়ে হাড়ে। পুরনো দিনের হিন্দি সিনেমার মতো পাহাড় ঘেরা কাঠগুদাম স্টেশন। রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ট্রেন ছাড়ল হাওড়ার উদ্দেশ্যে। ভারতীয় ফৌজিতে আমাদের কামরা (এস-৩) ঠাসা ছিল। সকাল ৬টা নাগাদ লখনউ জংশনে ট্রেন ঢুকল। ফৌজিরা নেমে যেতে ট্রেনটা একটু খালি হল। লখনউ জংশন ছাড়ার মিনিট দশের পরে বাদশানগর স্টেশনে এসে ট্রেনটি দাঁড়াল সকাল সাতটার দিকে। প্রায় হাজারখানেক ডেলি প্যাসেঞ্জার (ডিপি) রে রে করে উঠে পড়ল। রিজার্ভেশন করা যাত্রীদের সঙ্গে বাগ্যুদ্ধ শুরু হল। প্রতিবাদী যাত্রীরা বুঝলেন এখানে কেউ ভাই নেই, সকলেই দাদা। সিটের দখল চলে গেল ডিপিদের দখলে। আমার সিটে তিন জন বর্ষীয়ান ভদ্রলোক বসলেন। তাঁদের একজন গোরক্ষপুরে নামবেন। যাত্রাপথ প্রায় ৬ ঘণ্টা। তাঁদের কাছ থেকে জানলাম, স্লিপার ক্লাসে নাকি তাঁরা বৈধ ভাবেই চাপতে পারেন। টিকিটে নাকি তেমনটাই লেখা আছে। ভদ্রলোক টিকিট বের করে দেখালেন। কিন্তু স্লিপার ক্লাসে অ্যালাও লেখা আছে কোথাও দেখাতে পারলেন না। বুঝলাম স্লিপার ক্লাসে চড়ে ডেলি যাতায়াত করা এই সব এলাকার সনাতন ঐতিহ্য। বহু বছরের অভ্যাসে মজ্জায় অভিযোজন হয়ে তাঁরা নিজেদের বৈধ যাত্রী বলেই ভাবেন। সকাল ৯টা নাগাদ গৌড় জংশনে এসে দাঁড়াতে ট্রেনটা প্রায় খালি হয়ে গেল। বেলা ১২টা নাগাদ আমাদের ট্রেনটি গোরক্ষপুরে এসে পৌঁছল। আবার যাত্রীরা সিটের দখল নিলেন।
যাত্রাপথে কোনও সময়েই টিটিই বা রেল পুলিশ চোখে পড়েনি। এ দিকে ট্রেনের টয়লেটে জল নেই। নারকীয় অবস্থা। গোরক্ষপুরে দুপুরে খাবার দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা পরিমাণে যেমন কম, তেমনই গুণগত মানেও কম। জলের পাউচ প্যাকেট ছিল না ইত্যাদি। মধুপুর পর্যন্ত ট্রেনটি ঠিকঠাক সময়েই চলছিল। তার পর থেকে প্রতিটা ছোট ছোট স্টেশনে দীর্ঘ বিরতি-সহ দাঁড়াতে লাগল।
এই যন্ত্রণার কারণে বহু পর্যটকই বর্তমানে লখনউ হয়ে যাচ্ছেন। আমার সহকর্মীরা যাঁদের নৈনিতাল দেখার অভিজ্ঞতা আছে তাঁরা শুনে আঁতকে উঠে বললেন, ওই ট্রেনে কেউ চাপে? খুব ভুল করেছ। তোমার উচিত ছিল লখনউ হয়ে যাওয়া।
রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমার প্রশ্ন, কেন কাঠগুদাম যাওয়ার একমাত্র ট্রেনটির সম্পর্কে যাত্রীদের এমন ভীতিকর ধারণা থাকবে? নৈনিতালের আকর্ষণ বাঙালির থাকবেই। তাই যাত্রীদের সুবিধার্থে প্রথমেই যা করা দরকার তা হল ট্রেনটির আধুনিকীকরণ। দ্বিতীয়ত, ট্রেনে খাদ্য নিরাপত্তা ও চা-কফির সহজলভ্যতার লক্ষ্যে প্যান্ট্রি কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তৃতীয়ত, সকাল ৭টার দিকে লখনউ ও গৌড় স্টেশনের মধ্যে কোনও ট্রেন কমিউনিকেশন না-থাকায় এই এক্সপ্রেসই ডিপিদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এই দুটি স্টেশনের মধ্যে যদি ইএমইউ বা ডিএমইউ চালানো যায় তা হলে বাগ এক্সপ্রেসের যাত্রীরা কিছুটা রেহাই পাবেন বলে মনে হয়। পঞ্চমত, আনরিজার্ভড কম্পার্টমেন্ট ছাড়া অন্য যে কোনও শ্রেণিতে সাধারণ যাত্রীদের চড়া বেআইনি ঘোষণা করতে হবে। ষষ্ঠত, যাত্রীদের নিরাপত্তার উপর জোর দিতে হবে।
মৃণাল মাইতি। বাঁকুড়া