সম্পাদকীয় ১

সহজ পথ

ই তিহাসের ছদ্ম অভিমানের হাতে ভূগোলের নাস্তানাবুদ হওয়া ভারতীয় উপমহাদেশে নূতন নহে। তবে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নৌবাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে কুনাট্যটি এত দিন চলিতেছিল, তাহা এই ভারতীয় উপমহাদেশের মাপেও রীতিমত বিরল।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৫ ০০:০৫
Share:

ই তিহাসের ছদ্ম অভিমানের হাতে ভূগোলের নাস্তানাবুদ হওয়া ভারতীয় উপমহাদেশে নূতন নহে। তবে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নৌবাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে কুনাট্যটি এত দিন চলিতেছিল, তাহা এই ভারতীয় উপমহাদেশের মাপেও রীতিমত বিরল। ভারতের কলিকাতা, হলদিয়া বা পারাদ্বীপ বন্দর হইতে বঙ্গোপসাগর হইয়া বাংলাদেশের আশুগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ বা খুলনায় পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছাইতে সময় লাগে বড় জোর দশ ঘণ্টা। ডায়মন্ড হারবার হইতে রানাঘাটের পথে তিব্বত যাইতে যত সময় লাগে, তাহার তুলনায় সামান্যই বেশি। কিন্তু, ইতিহাসের হিসাব কখনও ত্রৈরাশিকে কষা হয়, কখনও আবার ভগ্নাংশে। তেমনই বিচিত্র হিসাবের দায় মিটাইতে এত দিন ভারত হইতে পণ্যবাহী জাহাজ প্রথমে ভারত মহাসাগর বহিয়া কলম্বো বা সিঙ্গাপুরের বন্দরে ভিড়িত। সেখানে মাল উঠিত বাংলাদেশি জাহাজে, এবং সেই জাহাজ যত দিনে বাংলাদেশি বন্দরে পৌঁছাইত, তত দিনে গঙ্গা পদ্মায় স্বভাবতই বহু জল বহিয়া যাইত। বাণিজ্যে বিলম্ব, প্রবল খরচ— সব মিলাইয়া এক চূড়ান্ত অস্বাভাবিক ব্যবস্থা। এত দিনে দুই দেশের সচিবরা নৌবাণিজ্য সংক্রান্ত প্রোটোকলে স্বাক্ষর করিলেন। আর ঘুরপথে নহে, অতঃপর দশ ঘণ্টার সহজ পথেই এক দেশ হইতে অন্য দেশে পণ্যবাহী জাহাজ পৌঁছাইবে।

Advertisement

ঘুরপথের ইতিহাসটি সহজবোধ্য। দেশ ভাগের পর পূর্ববঙ্গ হইয়াছিল পশ্চিম পাকিস্তান— শত্রু দেশ। ফলে, তাহার সহিত সরাসরি বাণিজ্যিক সংযোগ বজায় রাখার সমস্যা ছিল। কিন্তু, ইতিহাসের সেই অধ্যায়টি তো ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই ফুরাইয়াছে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাইবার পর তাহার সহিত ভারতের কোনও কূটনৈতিক বৈিরতা ছিল না। তাহা হইলে নৌবাণিজ্যের এই বিচিত্র পথটি আরও ৪৪ বৎসর টিকিয়া থাকিল কোন যুক্তিতে? এখানেই ইতিহাসের হাতে ভূগোলের পরাজয়। অর্থনীতির যুক্তি যে পথে হাঁটিতে চাহে, ইতিহাসের ভূত আসিয়া সেই পথ রোধ করিয়া দাঁড়ায়। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যের সহজ পথটি আটকাইয়া রাখিবার পিছনে সরকারের কোনও গূঢ় অভিসন্ধি ছিল কি না, সেই প্রশ্ন হয়তো উঠিবে। কিন্তু, তাহার সদুত্তর মিলিবে না। উত্তরের প্রয়োজনও নাই। যাহা হইয়াছে, তাহা ভুল, এবং অতি বিলম্বে হইলেও সেই ভুল সংশোধিত হইয়াছে— এই উপলব্ধিটুকুই আপাতত যথেষ্ট। এই সহজ পথে যাহাতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ে, তাহা যেন উভয়পক্ষের নিকটই লাভজনক হইয়া উঠে, তাহা নিশ্চিত করাই এখন কর্তব্য।

বাংলাদেশের সহিত বাণিজ্যের প্রসার হইলে ভারতের পরোক্ষ লাভ তাহার প্রত্যক্ষ লাভের তুলনায় ঢের বেশি। এত দিনে স্পষ্ট, নরেন্দ্র মোদীও প্রতিবেশী দেশগুলির সহিত কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতিসাধনে তাঁহার পূর্বসূরিদের তুলনায় খুব আগাইয়া নাই। একমাত্র ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এই দেশটির সহিত ভারতের সম্পর্কে ক্রমোন্নতি হইয়াছে। তাহার পিছনে উভয় দেশের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সদিচ্ছার মস্ত ভূমিকা আছে। কূটনৈতিক সদিচ্ছা বজায় রাখিবার শ্রেষ্ঠ রাস্তা অর্থনীতির। বাংলাদেশের সহিত বাণিজ্যিক সম্পর্ক দৃঢ়তর হইলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেরও উন্নতি হইবে। ইতিমধ্যেই ছিটমহলের সমস্যা মিটিয়াছে, বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর হইয়াছে। এই ইতিবাচক পরিবেশটিকে বজায় রাখা, তাহাকে আরও আগাইয়া লইয়া যাওয়াই বিধেয়। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক মহাশক্তি হিসাবে ভারতের দায়িত্বই অধিকতর। বাংলাদেশ বারংবার প্রমাণ করিয়াছে, তাহারা সহযোগিতার পথেই হাঁটিতে চাহে। সেই বার্তাকে তাহার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া ভারতের কর্তব্য।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement