— প্রতীকী চিত্র।
চার তলা স্কুলবাড়ি, তবু জায়গা হচ্ছে না পড়ুয়াদের।
কলকাতার বিটি রোড হাই স্কুলের শিক্ষকেরা নিয়মিত স্কুলে আসছেন। সেখান থেকেই ক্লাস করাচ্ছেন অনলাইনে, কারণ পড়ুয়ারা বাড়িতে। আসলে স্কুলভবনের তিন ও চার তলার ঘরগুলি দু’সপ্তাহ আগেই বরাদ্দ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জন্য। ওই কক্ষগুলিতে নবম-দশমের ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের ক্লাস হচ্ছে নীচের তলার কক্ষগুলিতে। ফলে নিচু ক্লাসের পড়ুয়াদের আর স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। তারা বাড়ি থেকে অনলাইনে পড়াশোনা করছে। কারণ ভোট আসছে।
আবার দমদমের নারায়ণদাস বাঙ্গুর মেমোরিয়াল মাল্টিপারপাস স্কুলেও একই ভাবে শিকেয় উঠতে বসেছে পঠনপাঠন। কারণ, ভোট আসছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ স্কুলেরই প্রাক্তনী। প্রধানশিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়া জানিয়েছেন, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ুয়া রয়েছে এ স্কুলে। তাদের সংখ্যা প্রায় ১৪৫০। এ দিকে শিক্ষক রয়েছেন ৩৬ জন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন শিক্ষককে নির্বাচনী কাজে নিয়োগ করা হয়েছে।
এ চিত্র রাজ্য জুড়ে। কোনও কোনও স্কুলের শিক্ষকেরা এখনও পালন করে চলেছেন বিএলও-র দায়িত্ব। ব্যাঘাত ঘটছে পঠনপাঠনে। এরই সঙ্গে রয়েছে পাঠ্যবইয়ের আকাল। শিক্ষাবর্ষের তিনটি মাস শেষ হতে চলেছে, বহু পড়ুয়াই এখনও হাতে পায়নি বই। এ দিকে এপ্রিল থেকে শুরু হতে চলেছে সামেটিভ পরীক্ষা।
শিক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন, এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা আদৌ নেওয়া যাবে তো? পরীক্ষা হলেও কি যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে?
বিটি রোড হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য জানান, শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুল ভবনে রয়েছে, এটাই একমাত্র সমস্যা নয়। তাঁদের স্কুলের ২৭ জন শিক্ষক বিএলও হিসাবে কাজ করছেন। স্কুলে এসে ক্লাস করাতে পারছেন মাত্র ২৯ জন। এ দিকে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ পড়ুয়া রয়েছে। ফলে ক্লাস সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। অনলাইনে ক্লাস করিয়ে কোনও ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে তাঁরা। সংঘমিত্রা বলেন, “এ ভাবে চলতে থাকলে অভিভাবকেরা আমাদের উপরে আস্থা হারিয়ে ফেলবেন।”
নারায়ণদাস বাঙ্গুর স্কুলের প্রধানশিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়াও জানিয়েছেন, তাঁরা কথা বলেছেন অভিভাবকদের সঙ্গে। সামেটিভ পরীক্ষা এগিয়ে এনে ২৭ মার্চ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, “কোনও ক্রমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। ৪ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী স্কুলে থাকতে পারে। তার আগেই পরীক্ষা শেষ করতে হবে। ”
কিন্তু যদি প্রশাসন সেটা না মেনে নেয় তাহলে কী হবে? আশঙ্কিত প্রধানশিক্ষক বলেন, “ জানি না কী হবে। হয়ত অর্ধেক পরীক্ষা করেই বাকি বন্ধ করে দিতে হবে!” স্কুলশিক্ষা যে ভয়ঙ্কর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এটা বার বার বলেন তিনি।
এরই পাশে রয়েছে পাঠ্যবই না পাওয়ার সমস্যা। বিভিন্ন স্কুলে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই এখনও পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার হরিনাভি সুভাষিণী বালিকা শিক্ষালয়ের প্রধানশিক্ষিকা পামেলা সরকার বলেন, “কিছু বই মার্চের চতুর্থ সপ্তাহেও পাওয়া যায়নি। জানি না কী করে পরীক্ষা নেওয়া হবে।” একই কথা হাউরি দীননাথ হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষিকা দীপান্বিতা সরকারের। পাঠ্যবই না পেলে পরীক্ষা কী ভাবে নেওয়া যাবে তা জানেন না শিক্ষকদের কেউই।
কোভিড অতিমারি পরিস্থিতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায়। তার কুফল এখনও রয়ে গিয়েছে ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে। এ রাজ্যের বহু স্কুলও ভুগছে সেই সমস্যায়— কমছে পড়ুয়ার সংখ্যা, পড়ছে পঠনপাঠনের মান। এরই মধ্যে গত নভেম্বর থেকে এসআইআর এবং তার পর বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর প্রভাব পড়ছে স্কুলের নিয়মিত পঠনপাঠনে।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “স্কুল শিক্ষার শিকড়ে আঘাত করা হচ্ছে বার বার, সমাজে তার প্রভাব পড়বেই। যে কোনও কারণেই হোক বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। এই অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন।”