মৃত ছাত্র আয়ুষকুমার নাথ। ছবি: সংগৃহীত।
বন্ধ স্কুলের দরজা। শুনশান চত্বর। গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। আগামী ১৫ জুন পড়ুয়ারা ফিরবে। ফের বসবে ক্লাস। শিক্ষক-শিক্ষিকারাও হয়তো আসবেন। ফিরবে না শুধু তৃতীয় শ্রেণির আয়ুষকুমার নাথ।
বছর আটেকের ওই ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে গত ২৪ মে। স্কুলের গাফিলতিতেই মৃত্যু হয়েছিল আয়ুষের, অভিযোগ করেছিলেন পরিবারের লোকজন। মঙ্গলবার, ১০ দিনে ক্ষৌরকর্ম সারলেন তাঁরা। বড়ছেলের পারলৌকিক কাজের পর আয়ুষের বাবা আশিস নাথ সাফ জানালেন, ছোটছেলে আবেশও আর ফিরবে না ওই স্কুলে। ভরসা নেই। ভয় পাচ্ছেন তাঁরা।
বাঁশদ্রোণীর বেসরকারি স্কুলে ছাত্র মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আশিস। মঙ্গলবার আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধির কাছে দাবি করেন, স্থানীয় থানা এবং লালবাজারেও প্রভাব খাটাচ্ছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। মৃত্যুর তদন্তের পরিবর্তে আন্দোলনকারী অভিভাবকদের গ্রেফতারিতেই ব্যস্ত পুলিশ, অভিযোগ এমনই। বুধবার, শিশুসন্তানের শ্রাদ্ধশান্তির কাজ করবেন আশিস। তার আগে আর কোনও বিষয় নিয়ে ভাবতে পারছেন না। তবে, দোষীদের শাস্তির জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত তিনি।
যদিও মঙ্গলবার পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, লালবাজারের তত্ত্বাবধানে তদন্ত চলছে। ইতিমধ্যেই নেতাজিনগর থানা তদন্তকারী আধিকারিক বদলও হয়েছে। তুলনায় প্রবীণ এক আধিকারিক এখন তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন। যে কোনও সমস্যায় মৃতের পরিবারকে পুলিশি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে খবর।
মঙ্গলবার মৃত বালক আয়ুষকুমার নাথের পারলৌকিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন তাঁর বাবা। ক্ষৌরকর্মের মাঝেই তিনি দবি করেন, স্কুলের গাফিলতি না থাকলে তাঁর আট বছরের ছেলেকে এ ভাবে চলে যেতে হত না। আশিসের অভিযোগ, গত ১৩ মে বাঁশদ্রোণী এলাকার ওই বেসরকারি স্কুলে সকাল পৌনে ৮টা নাগাদ ঢোকে তাঁর সন্তান। তার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে বছর আটেকের আয়ুষ। অভিযোগ, ক্লাস চলাকালীন শিক্ষিকাকে সে কথা জানালেও কোনও লাভ হয়নি। তাকে বাড়ি পৌঁছনোর ব্যবস্থা করা হয়নি। বরং আয়ুষকে মাথা নিচু করে বসতে বলেন শ্রেণিশিক্ষিকা।
গোটা সময়টাই আয়ুষ সে ভাবে বসে থাকে। ছুটির পর সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যায়, চোট লাগে গুরুতর। স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে পরিবারের লোকজন এসএসকেএম-এ ভর্তি করান। প্রায় ১০ দিন অচৈতন্য থাকার পর ২৪মে রবিবার মৃত্যু হয় ওই বালকের। আয়ুষের বাবা এ দিনও জানান, তাঁরা যখন সন্তানকে দেখতে পান তখন বেলা ১২টা বেজে গিয়েছে। অর্থাৎ চার ঘণ্টা ওই শিশু অসুস্থ অবস্থাতেই ছিল। সেই সময়ে যদি পরিবারের লোককে জানানো হত তা হলে আয়ুষকে বাঁচানো যেত।
এই ঘটনার বিচার চেয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন অভিভাবকদের একাংশ। ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দিন বিক্ষোভ চলে। একই সঙ্গে চলে রাস্তা অবরোধও। অবশেষে রাত ১২টা নাগাদ পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবস্থান তুলে দেয়। অভিভাবকদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। পরে তাঁরা জামিনে ছাড়া পেয়েছেন।
এ বিষয়ে আশিস বলেন, ‘‘পুলিশ ওই বিক্ষোভের তদন্ত নিয়েই ব্যস্ত। আমার ছেলের মৃত্যুর তদম্ত আদৌ কি হচ্ছে? বুঝতে পারছি না।” তিনি অভিযোগ করেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় থানা ও লালবাজারেও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমার ছোটছেলে আর ওই স্কুলে পাঠাব না। এক ছেলেকে হারিয়েছি। ছোটটাকে কার ভরসায় রাখব? কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”