— প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
নবান্নের নির্দেশে কি কড়া হতে চলেছে শিক্ষকদের হাজিরার নিয়ম? সূত্রের খবর, স্কুল ও উচ্চশিক্ষা দফতরের সব অফিসে ‘ফেস রেকগনিশন অ্যাটেন্ড্যেন্স সিস্টেম’ চালু করা হয়েছে। মুখের ছবির মাধ্যমে হবে হাজিরার পদ্ধতি এ বার চালু হতে পারে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও, মনে করা হচ্ছে এমনই।
গত বুধবার নবান্ন থেকে রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব প্রভাতকুমার মিশ্রের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ১৫ জুন থেকে সরকারি অফিসে বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক হচ্ছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাজ্যের সব স্তরের সরকারি কর্মী-আধিকারিকদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম জারি করা হবে। ১৫ জুন থেকে নবান্নে হাজিরা পদ্ধতি শুরু হবে এই প্রযুক্তিতে। ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ধাপে ধাপে রাজ্যের অন্য সরকারি দফতরগুলিতে চালু হবে এই পদ্ধতি।
এ বার একই মর্মে বিজ্ঞপ্তি দিল বিকাশ ভবন। দফতরের এক কর্তা জানান, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ, এসসিইআরটি-সহ জেলা স্কুল পরিদর্শকের অফিসগুলিতেও এই নির্দেশ কার্যকর হবে।
এর পরই জল্পনা শুরু হয়েছে, তবে কি এ বারে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও শুরু হবে এই প্রক্রিয়া?
ইতিমধ্যেই শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে এই নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। স্কুলের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি চালু করার পক্ষেই রয়েছেন অধিকাংশ শিক্ষক। তাঁদের মতে অতীতে দেখা গিয়েছে, শাসকদলের মদতপুষ্ট হওয়ায় বহু শিক্ষক সঠিক সময়ে ক্লাসে আসতেন না। বার বার অভিযোগ উঠলেও তাঁদের নিয়মে ফেরানো যায়নি। হুগলি জেলার এক স্কুলের প্রধানশিক্ষকের বক্তব্য, ‘‘এমন অনেকে রয়েছেন, যাঁরা বিগত সরকারের আমলে অর্ধেক দিন স্কুলে আসতেন না। কিন্তু মাথায় শাসকদলের হাত থাকায় কিছু বলতে পারতাম না। এ বারে তাঁরা অনেকেই দমে গিয়েছেন। কিন্তু বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু হলে ভাল হয়। কোনও ভাবেই আর কেউ অনিয়মিত হাজিরা দিতে পারবেন না।’’
এত দিন প্রধানশিক্ষকের ঘরেই থাকত হাজিরার খাতা। সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তাঁর ঘরে এসেই সকলে হাজিরা খাতায় সই করতেন। সেই নিয়মের এ বার বদল হতে পারে বলে খবর। যদিও কোনও কোনও স্কুলে নিজ উদ্যোগে আগেই বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করেছিল। যেমন কলকাতার যাদবপুর বিদ্যাপীঠে অনেক দিন আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
এ বার সব স্কুলে এই পদ্ধতি চালু হলেও কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় বলেই দাবি শিক্ষকদের। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘‘এই সিদ্ধান্ত সব দিক থেকেই সমর্থন যোগ্য। শিক্ষকদের শিক্ষকতাই হল আসল কাজ। সেটা না করে কেউ যদি শাসকদলকে সামনে রেখে ফাঁকি দিতে শুরু করেন তাঁদের জন্য এই উদ্যোগ একদম সঠিক। নিময় না মানলে কী শাস্তি হতে পারে সরকার সেটাও ঠিক করে দিক।’’
সূত্রের খবর, বহু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈষম্য। অভিযোগ, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক হলেও স্থায়ী কর্মীরা এই পদ্ধতির ধারে কাছেও যেতে চান না। আর এ ভাবেই বছরের পর বছর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম চলে আসছে বলে অভিযোগ।
তবে, উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি আখেরে পড়াশোনার ক্ষতি করবে বলেই মনে করছেন কলকাতার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি, বায়োমেট্রিক হাজিরা ব্যবস্থা চালু হলে গবেষণার কাজে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। শিক্ষাকর্মীরা অফিসেই বসেই বেশির ভাগ কাজ করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে অধ্যাপনার কাজ শুধুমাত্র ক্লাসেই সীমাবদ্ধ নয়। সে ক্ষেত্রে হয়, ওই শিক্ষকেরা বিপদে পড়বেন, অথবা, তাঁরা বাইরের কাজের পরিসর কমিয়ে ফেলবেন। আখেরে গবেষণা বা পঠনপাঠনেই সমস্যা হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘‘ আগে পরিকাঠামো ঠিক হোক, তারপরে বায়োমেট্রিক।’’
তবে, রাজ্যের বহু কলেজেই অভিযোগ ওঠে শিক্ষকেরা ঠিক মতো ক্লাস করান না। সেই পরিস্থিতিতে রাশ টানতে এই ব্যবস্থা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন অনেকে।
তবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের ভাবধারায় গঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী সঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুশান্ত মজুমদার বলেন, ‘‘ উচ্চশিক্ষার উন্নতির স্বার্থে সরকার এই পদক্ষেপ করলে স্বাগত জানাবো এবং কোনও রকম বৈষম্য না রেখে সার্বিকভাবে এই নির্দেশ রূপায়ণ হবে এই প্রত্যাশা রাখছি।’’