গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
খুব ছোট থেকেই মানবসন্তান বুঝতে শেখে তার পরিবেশ কেমন। পুথিগত বিদ্যা আয়ত্ত করার আগেই পরিবেশের ধারণা তৈরি হয় অনুভবে। কিন্তু তাকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শিক্ষার।
গত কয়েক দশকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ক্রমাগত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, পৃথিবী এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। মানুষের জীবনে প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রকৃতিনিধন। তাই বিশ্ব উষ্ণায়ন, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি ইত্যাদির আশঙ্কা বাড়ছে। কিন্তু কী ভাবে সেই ধ্বংসকে খানিক প্রতিহত করা যায়, তা নিয়ে নিরন্তর চলছে গবেষণা। পরিবেশের ভাল-মন্দ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থার অধীনে কাজ করছেন। এ দেশে এমন পেশাদারদের সংখ্যা নেহাত কম নয়।
স্নাতকে পরিবেশ বিজ্ঞান
এক সময়ে স্নাতক স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ ছিল না। বর্তমানে দেশের মোট ৪৫০টি প্রতিষ্ঠানে এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।
ব্যাচেলর অফ সায়েন্স (বিএসসি) ডিগ্রির অধীনে তিন কিংবা চার বছরের স্নাতক কোর্সে পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারেন দ্বাদশ উত্তীর্ণেরাও। এ ক্ষেত্রে যাঁরা বিজ্ঞান বিভাগে, অঙ্ক, জীববিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা ওই কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন।
যাঁরা কলা বা বাণিজ্য বিভাগের বিষয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন, তাঁরাও পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবেশ বিদ্যা কিংবা এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়টি বেছে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাঁরা পরবর্তীতে ওই বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার সুযোগ পেতে পারেন।
জেনে রাখা প্রয়োজন, স্নাতক স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞানের বর্তমান পাঠ্যক্রমে জীববিদ্যা, রসায়নের সঙ্গে পরিবেশের আন্তঃসম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়গুলি পড়ানো হয়ে থাকে। কলা বা বাণিজ্য শাখার অধীনে পরিবেশ রক্ষার নীতি নির্ধারণ, ব্যবস্থাপন সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা চলে। তবে, উভয় ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সুস্থায়ী উন্নয়ন নিয়ে প্রাথমিক স্তরের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থাকে। স্নাতকোত্তর স্তরে বিশেষ পত্র হিসাবে।
পড়াশোনার সুযোগ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিবেকানন্দ কলেজ, আশুতোষ কলেজ, বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজ, ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইউনিভার্সিটি-র অধীনে সরোজিনী নাইডু কলেজ ফর উইমেন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চন্দননগর গভর্নমেন্ট কলেজ, নেতাজী মহাবিদ্যালয়, শম্ভুনাথ কলেজে ওই বিষয়টি নিয়ে স্নাতকে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।
স্নাতকোত্তর স্তরে কিংবা পিএইচডি-র জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, বোস ইনস্টিটিউট, বেছে নিতে পারবেন পড়ুয়ারা।
রাজ্যের বাইরে পুদুচেরি বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, পুণে বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও এই বিষয়টি পড়ানো হয়।
পেশাগত ক্ষেত্রে কী কী সুযোগ রয়েছে
এ বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে পড়ুয়াদের মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশ বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা লাভের পর কলেজে বা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরিতে আগ্রহ দেখান। এই বিষয় নিয়ে চর্চায় আমেরিকা, ব্রিটেন, জাপান, জার্মানির মতো দেশ এগিয়ে থাকলেও ভারতে তেমন ভাবে কাজ হয় না বলেই জানাচ্ছেন শিক্ষকেরা। এখানে বরং এ দেশের বৈচিত্র্যময় পরিবেশের উপরই জোর দেওয়া হয়।
তাই কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ক্লিন গঙ্গা প্রজেক্ট’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থার ফিনানশিয়াল অ্যাকাউন্টিংয়ের ক্ষেত্রে সুস্থায়ী উন্নয়ন আধিকারিক, কনজ়ারভেশন অফিসার পদে এই বিষয় বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও এনভায়রনমেন্টাল পলিসি অ্যানালিস্ট, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যানালিস্ট, এনভায়রনমেন্টাল কনসালট্যান্ট, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সেফটি অফিসার, সাস্টেনিবিলিটি অ্যাসিস্ট্যান্ট, এনভায়রনমেন্টাল টেকনিশিয়ান পদে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থায় নিয়োগ করা হয়ে থাকে।
তবে, পিএইচডি-র আগে চাকরি পেতে চাইলে এবং ফিল্ড রিসার্চ-এর কাজে আগ্রহী হলে বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণাগারে সহায়ক হিসাবে যোগদান করা যায়। এ বিষয়ে অভিজিৎ জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিবেশ নিয়ে কাজ করে, এমন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সংখ্যা কম নয়। সেখানে পরামর্শদাতা, অ্যানালিস্ট, কনসালট্যান্ট, প্রজেক্ট ম্যানেজারের মতো পদে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়।
শিক্ষক-অধ্যাপকেরা কী বলছেন?
পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার জন্য কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে, দ্বাদশের পর কেরিয়ার গড়ার লক্ষ্যে এই বিষয় কী ভাবে সাহায্য করতে পারে— এ সব নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল বোস ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর (আইআইএসইআর) অধ্যাপক পুণ্যশ্লোক ভাদুড়িকে।
পুণ্যশ্লোক ভাদুড়ির মনে করেন, উচ্চশিক্ষায়, বিশেষত স্নাতকের পাঠ্যক্রম বদলের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনার জন্য সুযোগ থাকা দরকার। তিনি বলেন, “পড়ুয়াদের মধ্যে এখন শুধুমাত্র ভাল নম্বর পেয়ে পাশ করে যাওয়ার তাগিদ দেখা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার। তবেই ভবিষ্যতে এই বিষয় নিয়ে এগোনো সম্ভব।” কারণ হিসাবে তিনি জানান, কাজের চাহিদা থাকলেও বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না। তবে, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর সেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে বলেই তিনি মনে করেন।
পড়াশোনার জন্য পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক হতেই হবে, এমনটা বাধ্যতামূলক নয় বলেই মনে করেন অধ্যাপক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়। নিয়ম অনুযায়ী, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, এমনকি অঙ্ক নিয়ে স্নাতক হওয়ার পরও এই বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষার পরিসর রয়েছে। তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতির সাপেক্ষে এই বিষয় নিয়ে গবেষণার পরিসর বেড়েছে। সংযোজন হয়েছে রিমোট সেন্সিং, জিয়োগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেমস (জিআইএস), কৃত্রিম মেধা, ডেটা অ্যানালিসিস-এর মতো প্রযুক্তিও। তাই প্রথাগত জ্ঞানার্জনের পাশপাশি একটা অনুসন্ধিৎসা থাকা প্রয়োজন।”
এক কথায় বলা যেতে পারে, পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়টি কেরিয়ার গড়ার জন্য আদর্শ হতে পারে। এতে বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি রয়েছে, প্রযুক্তির প্রয়োগের সুযোগ পাওয়া যায়, এমনকী অঙ্কের সমাধানের সূত্র কিংবা ভূগোলের মতো বিষয়ের জ্ঞানও কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। তাই পড়াশোনাই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। বাহ্যিক বিষয় নিয়ে সমান ভাবে চর্চা করতে হবে। কোন ক্ষেত্রে কী কী কাজ হচ্ছে, তার খোঁজ খবর রাখা দরকার।