প্রতীকী ছবি।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে পঠনপাঠনের পদ্ধতি। বদলাচ্ছে মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও। সারা দেশে এ বছরই প্রথম দ্বাদশ শ্রেণির মূল্যায়ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে করেছে সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন-এর (সিবিএসই)। ফলপ্রকাশের পর তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন না উঠলেও, খাতার প্রতিলিপি দেখার পর পদ্ধতি নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলছেন পরীক্ষার্থীরা।
সিবিএসই-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল স্ক্যানিং পদ্ধতিতে এ বছর প্রায় ৯৮ লক্ষ খাতা দেখা হয়েছে। এর আগে পরীক্ষকেরা খাতা দেখতেন কাগজে-কলমেই। এই প্রথম অনলাইনে দেখা হল পরীক্ষার্থীদের খাতা।
প্রাথমিক ভাবে এই পদ্ধতি নিয়ে কোনও সমালচনা হয়নি। কিন্তু দ্বাদশের ফলপ্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে অভিযোগ। ১৩ মে ফলপ্রকাশ হয়েছে দ্বাদশ শ্রেণির। গত বছর পাশের ছিল ৮৮.৩৯ শতাংশ, এবং ২০২৪-এ ছিল ৮৭.৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৪-এর তুলনায় ২০২৫-এ পাশের হার বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এর চিত্রটা খানিক আলদা। ২০২৬-এ পাশের হার ৮৫.২০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ২.৭৮ শতাংশ গত বছরের তুলনায় কম। শুধু পাশের হার কম হয়ে যাওয়া নয়, সমাজমাধ্যম জুড়ে একের পর এক অভিযোগ উঠছে কম নম্বর পাওয়া নিয়েও। পদ্ধতিগত ত্রুটির দিকেই আঙুল তুলছেন পরীক্ষার্থীরা।
কিন্তু কী ভাবছেন শিক্ষকেরা?
কলকাতার গোখলের মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা দেবযানী সরকার পড়ুয়াদের অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তাই দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “ডিজিটাল মাধ্যমে কোনও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে মানেই সেখানে ভুল হওয়ার পরিমাণটা অনেকটা কম। আর নতুন কোনও পদ্ধতির সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হলে কিছুটা সময় দিতেই হয়।” তাঁর দাবি, বোর্ডের তরফে বার বার আশ্বস্ত করা হচ্ছে পড়ুয়াদের সমস্ত অভিযোগই খতিয়ে দেখা হবে। পড়ুয়ারা যদি ভাল পরীক্ষা দিয়ে থাকেন তা হলে নিশ্চয়ই তাঁরা সেই অনুযায়ীই নম্বর পাবেন।
কলকাতার সিবিএসই বোর্ড অধীনস্থ বেশির ভাগ স্কুলের শিক্ষকেরা এ বিষয়ে একমত। তার অন্যতম কারণ, হাতেকলমে খাতা দেখার চেয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে খাতা দেখা অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং নির্ভুল।
লক্ষ্মীপত সিংহানিয়া অ্যাকাডেমির অধিকর্তা মীনা কাক বলছেন, “খাতা দেখার সময় শিক্ষকদের স্ক্রিনেই নির্দিষ্ট ‘রুব্রিক্স’ বা নম্বর দেওয়ার নিয়ম বলা থাকে। সঙ্গে থাকে সঠিক উত্তর। তাই পক্ষপাতিত্বের কোনও সুযোগ থাকে না। দ্রুত ফলপ্রকাশ করা যায়।”
ডিজিটাল খাতা দেখার পদ্ধতিটি খুবই ভাল এবং স্বচ্ছ বলেই মনে করছেন শিক্ষকদের একাংশ। তবে শুধু পরীক্ষার্থী নন, শিক্ষকদেরও এই পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে খানিকটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন তাঁরা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের অনলাইনে খাতা দেখার প্রক্রিয়া শিখতে আরও বেশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বলেই মনে করছেন অনেকে।
অভিযোগ উঠেছিল স্ক্যান করা খাতা বেশ অস্পষ্ট। নিজেদের হাতের লেখা বুঝে উঠতে পারছেন না পরীক্ষার্থীরা। তা হলে শিক্ষকরা কী ভাবে খাতা দেখবেন! এই প্রসঙ্গে বিড়লা ভারতীর (সরলা বিড়লা গ্রুপ অফ স্কুলস) প্রধানশিক্ষিকা মধুমিতা শীল বলেছেন, “শিক্ষার্থীরা এই ওএসএম পদ্ধতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হচ্ছে। তাই শুধু ভাল উত্তর লিখলেই হবে না। এই ক্ষেত্রে তাঁদের ‘ওএসএম-বান্ধব’ পদ্ধতিও মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ, স্পষ্ট মার্জিন দেওয়া, স্পষ্ট অক্ষরে নম্বর লেখা এবং এমন কালি ব্যবহার করা যা স্ক্যানারে পরিষ্কার দেখা যায়।”
ওএসএম প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করার কথাও বলেছেন শিক্ষকদের একাংশ। অনেকেই মনে করছেন, খাতা স্ক্যান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কতগুলি পাতা স্ক্যান করা হল তার একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা যদি পরীক্ষার্থীদের নথিভুক্ত ফোন নম্বরে চলে যায়, তা হলে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে। কারণ, একজন পড়ুয়া জানে, সে কোন পরীক্ষায় কতগুলি পাতা নিয়েছেন। তাই খাতা দেখার সময়ই যদি পাতার হিসাব থাকে, তা হলে খাতা হারানো অভিযোগ তোলার জায়গা থাকবে না।
পাশাপাশি, উঠে এসেছে আরও একটি দিক। শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, পরীক্ষা হচ্ছে অফলাইনে, খাতায়কলমে। কিন্তু খাতা দেখা হচ্ছে অনলাইনে। এই পদ্ধতি পরিবর্তনের পক্ষে মত দিচ্ছেন অনেক শিক্ষকই। তাঁরা মনে করছেন, পরীক্ষাও সরাসরি কম্পিউটারে নেওয়া হয় তা হলে স্ক্যান করা বা খাতার অস্পষ্টতা সংক্রান্ত সমস্যা থাকবে না।
পদ্ধতিতে অন্য কিছু পরিবর্তনের কথাও উঠে আসছে কলকাতার স্কুলগুলি থেকে। আদিত্য অ্যাকাডেমি গ্রুপ অফ স্কুলসের অধিকর্তা সবিতা সাহা বলেন, “পরীক্ষার্থীদের টাকা দিয়ে নিজেদের খাতা দেখতে হচ্ছে। একটি পদ্ধতির স্বচ্ছতা যাচাই করার জন্য কোনও মূল্যতালিকা স্থির করা উচিত নয় বলে আমি মনে করি। প্রথমবার মূল্যায়িত খাতা ডাউনলোড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা উচিত।” তা ছাড়া, তিনি মনে করেন পদার্থবিজ্ঞানের নিউমেরিক্যাল বা ইতিহাসের উত্তরের জন্য কী ভাবে এক বা দুই নম্বর দেওয়া হচ্ছে, তা যদি শিক্ষার্থীরা বিস্তারিত ভাবে জানতে পারেন, তবে তাঁরা নিজেরাই নিজেদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। এতে বিতর্ক কমবে।
সমাজমাধ্যম জুড়ে একের পর অভিযোগ উঠলেও বোর্ডের তরফে পড়ুয়াদের অযথা আতঙ্কিত না হওয়ারই বার্তা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকমহলের একাংশও বোর্ডের উপর ভরসা রাখতে বলছেন। পাশাপাশি নতুন পদ্ধতিকে প্রযুক্তিগত ভাবে আরও কতটা উন্নত করা যায় সেই দিকেও নজর দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন শিক্ষকদের একাংশ।