— প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
বহাল থাকল পুরনো রায়। বাড়ল শুধু টেট পাশ করার সময়সীমা।
স্কুলে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য ‘টিচার্স এলিজিবিলিট টেস্ট’ (টেট) পাশ করা বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৫ সালে। শুক্রবার সেই রায়ের পুনর্বিবেচনার মামলার শুনানি ছিল দেশের শীর্ষ আদালতে। সর্বোচ্চ আদালতও সেই নির্দেশ বহল রাখল। তবে আগে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে টেট পাশের নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৭ সালে ৩১ অগস্ট। শুক্রবার তা বৃদ্ধি করল শীর্ষ আদালত। এখন টেট পাশের সময় এক বছর বাড়ল। আদালতের নতুন নির্দেশ, ২০২৮ সালের ৩১ অগস্টের মধ্যে কর্মরত সকল শিক্ষককে টেট পাশ করতে হবে।
ওই মামলার আইনজীবী ফিরদৌস শামিম শুক্রবার জানান, পুরনো রায়ে উল্লেখ ছিল ২০২৭ সালের ৩১ অগস্টের মধ্যে কর্মরত শিক্ষকেরা টেট প্রশিক্ষিত না হলে তাঁদের স্বেচ্ছাবসর নিতে হবে। নতুন নির্দেশে সেই সময়সীমা বৃদ্ধি করে ২০২৮ সালের ৩১ অগস্ট করেছেন বিচারপতিরা। ফলে সাময়িক স্বস্তি থাকলেও টেট বাধ্যমূলকই থাকছে বলে জানান ওই আইনজীবী।
সূত্রের খবর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরে কর্মরত সকল শিক্ষককে টেট বাধ্যতামূলক। যাঁদের এই যোগ্যতা নেই, তাঁদের আগামী দু’বছরের মধ্যে অর্থাৎ, ২০২৭ সালের ৩১ অগস্টের মধ্যে এই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে যাঁদের চাকরির সময়সীমা শেষ হচ্ছে, তাঁদের এই নির্দেশের আওতার বাইরে রাখা হয়। অর্থাৎ, ২০২৫ থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত যাঁদের চাকরি রয়েছে, প্রবীণ সেই শিক্ষকদের আর টেট-এ বসতে হবে না। তার পরই এই রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হয় বিভিন্ন রাজ্য থেকে। ‘নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি’-র তরফে সম্প্রতি একটি রিভিউ মামলা হয়েছিল। আইনজীবী ফিরদৌস শামিম বলেন, ‘‘এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি মনমোহনের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেন যে, টেট বাধ্যতামূলকই থাকছে। তবে সেই যোগ্যতা অর্জনের জন্য সময়সীমা ১ বছর বৃদ্ধি করে ২০২৮ সালের ৩১ অগস্ট পর্যন্ত করা হল।’’
‘নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি’-র সাধারণ সম্পাদক ধ্রুবশেখর মণ্ডল জানান, মূলত দু’টি বিষয়ের প্রতি বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রথমত, ২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী ১ এপ্রিল ২০১০-এ আইন বলবৎ হয়। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের জুলাই মাসে শিক্ষকদের যোগ্যতা সংক্রান্ত আইন চালু হয়। সেখানে টেট বাধ্যতামূলক করা হয়। তাই আদালতের কাছে তাঁদের আর্জি ছিল, এই আইন বলবৎ হওয়ার আগে যে সকল শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের এই নির্দেশের আওতার বাইরে রাখা হোক। কারণ, ২০১১-র আগে কাজে যোগ দেওয়া শিক্ষকদের টেট বাধ্যতামূলক ছিল না। পাশাপাশি, সারা দেশে কয়েক লক্ষ শিক্ষক রয়েছেন যাঁরা টেট উত্তীর্ণ নন। শিক্ষার অধিকার আইন, আরটিই ২০০৯ এবং এনসিটিই ২০১০-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার জন্য টেট পাশ করা ন্যূনতম এবং বাধ্যতামূলক যোগ্যতা। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, টেট আবশ্যিক যোগ্যতা। কিন্তু সমস্যা হয়েছে ২০১১ পর্যন্ত শিক্ষকতায় নিযুক্তদের নিয়ে। শুক্রবার পুরনো নির্দেশে সামান্য বদল করে সমসয়সীমা এক বছর বৃদ্ধি করেছে আদালত। কিন্তু লক্ষ লক্ষ কর্মরত শিক্ষকের দুশ্চিন্তা রয়েই গেল। ধ্রুবশেখর শুক্রবার বলেন, ‘‘কলকাতায় এসেও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এই সমস্যার সমাধানে আশ্বাস দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে কেন্দ্রকে উদ্যোগী হয়েই নিয়ম পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হতে হবে। পাশাপাশি, বর্তমান রাজ্য সরকারের তরফ থেকে সদর্থক ভূমিকা আশা করছি।’’
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল শুক্রবার বলেন, ‘‘কর্মরত শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক টেট নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী কলকাতায় এসে কথা দিয়েছিলেন, তাঁরা রাজ্যে সরকারে এলে বিষয়টা দেখবেন। সরকারে আসা হল কিন্তু বিষয়টা দেখা হল না! এমনকি, রিভিউ মামলায় কেন্দ্র কোনও আইনজীবীও দেয়নি। এ তো বড় প্রতারণা! কেন্দ্রের সরকার যে শিক্ষক ও শিক্ষা বিরোধী, সেটা আমরা জানতাম।’’
শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারী বলেন, ‘‘গোটা দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই ধুঁকছে। তার উপরে এই নির্দেশে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা আরও অতলে তলিয়ে যাবে। এর মধ্যে দিয়ে শিক্ষার আরও বেসরকারিকরণ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ, তারা যেন অর্ডিন্যান্স জারি করেন যে, নিয়ম বদলাতে হবে। এই একটা পথই খোলা রয়েছে। রাজ্য সরকারের কাছেও অনুরোধ, তারা লিখিত ভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে জানাক। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীও সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন।’’
বিজেপি শিক্ষক সেলের রাজ্য কো-কনভেনর পিন্টু পাড়ুই বলেন, ‘‘ সব শিক্ষকদের বলতে চাই এতে উদ্বেগের কিছু নেই। আমরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলব। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস কেন্দ্রীয় সরকার অর্ডিন্যান্স জারি করে শিক্ষকদের মুখে হাসি ফোটাবে।’’