গ্রাফিক : আনন্দবাজার ডট কম
মেয়েদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করতে চালু হয়েছিল ‘কন্যাশ্রী’। এই প্রকল্পের একপ্রান্তে ছিল ছাত্রীদের স্কুলমুখী করার উদ্দেশ্য, অন্য দিকে তাদের অপরিণত বয়সের বিয়ে ঠেকানো।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কন্যাশ্রী প্রকল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে গত দেড় দশকে। সরকার বদলে যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠছে কন্যাশ্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে। যদিও প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, চালু এ সব জনমুখী প্রকল্প বন্ধ করবে না নবগঠিত বিজেপি সরকার। তবে, দাবি উঠছে, সকলের জন্য এই প্রকল্প না রেখে আর্থিক সঙ্গতিকে মানদণ্ড করা হোক।
২০১১-এ ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন সরকার কন্যাশ্রী প্রকল্প শুরু করে ২০১৩-এ। বেশ কয়েক বছর সফল ভাবে ওই প্রকল্পের কাজ চলার পর ২০১৭-এ রাষ্ট্রপুঞ্জের সেরা সমাজিক প্রকল্পের সম্মান লাভ করে। সে বছর ৬২টি দেশের ৫৫২টি সামাজিক প্রকল্পের মধ্যে সেরার স্বীকৃতি পায় ভারতের ‘কন্যাশ্রী’। সমাজের সবস্তরের কন্যাসন্তানের জন্যই এই প্রকল্প চালু হয়েছিল।
এর পর দেশের বিভিন্ন রাজ্যে একই রকম প্রকল্প চালু করা হয়। উত্তরপ্রদেশের ‘মুখ্যমন্ত্রী কন্যামঙ্গল যোজনা’ চালু হয় ২০১৯-এ, রাজস্থানে ‘মুখ্যমন্ত্রী রাজশ্রী যোজনা’ চালু হয় ২০১৬-এ, ওই বছরই মহারাষ্ট্রে শুরু হয় ‘মাজি কন্যা ভাগ্যশ্রী’ প্রকল্প প্রভৃতি। তবে এ সব ক্ষেত্রে প্রকল্পগত কিছু পার্থক্য রয়েছে।
‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের ক্ষেত্রে আয়ের ঊর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট না হওয়ায় সকলকেই এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ বার শিক্ষকদের একাংশই দাবি করছেন, সামাজিক এই প্রকল্প চলতে থাকুক। কিন্তু উপভোক্তার পরিবারের আয়ের ঊর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট হোক। শুধু কন্যাশ্রী নয়, ‘সবুজসাথী’ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই দাবি তুলছেন শিক্ষকদের একাংশের।
প্রতি বছর ১৪ অগস্ট কন্যাশ্রী দিবস পালন করত তৃণমূল সরকার। গত বছর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, রাজ্যে ৯৩ লক্ষের বেশি ছাত্রী কন্যাশ্রীর সুবিধা পাচ্ছে। ২০২৬ সালে সেই লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি করার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। স্কুল স্তরে কন্যাশ্রী, কলেজে কন্যাশ্রী-২ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কন্যাশ্রী-৩ পাওয়া যায়। মমতা জানিয়েছিলেন, এ জন্য সরকার প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যায় হচ্ছে। এই প্রকল্পের জন্য মেয়েদের স্কুলছুট কমেছে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
একই ভাবে সবুজ সাথী অর্থাৎ সব ছাত্রছাত্রীদের সাইকেল বিতরণের প্রকল্পও চলছে। ২০২৫ সালের হিসেব অনুযায়ী, ‘সবুজসাথী’ প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ১ কোটি ৩৮ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে সাইকেল দিয়েছে রাজ্য সরকার। এ বারে এই সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার যেন রাশ টানে তেমনটাই চাইছেন শিক্ষকদের একাংশ।
অ্যাডভান্সড সোসাইটি ফর হেডমাস্টার্স অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেসেস সংগঠনের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক চন্দন মাইতি বলেন, ‘‘প্রকল্পগুলি খুবই ভাল। কিন্তু আয়ের ঊর্ধ্বসীমা দেখে তবেই সেই সব ছাত্রীদের এর আওতায় নিয়ে আসা উচিত।’’ তিনি জানান, ১৩ বছরের পর থেকেই বছরে ১ হাজার টাকা এবং ১৮ বছরের পরে এককালীন ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এমন বহু পরিবার রয়েছে যাঁদের কাছে এই পরিমাণ অর্থের কোনও প্রয়োজন নেই।
শিক্ষকেরা অনেকেই দাবি করছেন, যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের অর্থ সাহায্য করলেও বাকিদের এই প্রকল্পের আওতায় আনার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং উদ্বৃত্ত অর্থ স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নে কাজে লাগানো হোক।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল সম্প্রতি এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য রাজ্য সরকারের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনিও আবেদন করেন যে এই প্রকল্প চলুক কিন্তু কারা এর সুবিধা পাবে সেটা সরকার ঠিক করুক। আয়ের ঊর্ধ্বসীমা ঠিক করুক রাজ্য সরকার। সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলকে বাঁচাতে অন্য ক্ষেত্রে এই ব্যায় করলে শিক্ষার সার্বিক উন্নতি হবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘‘রাজ্যের সাধারণ মানুষ দান খয়রাতি চান না, সার্বিক উন্নতি চান। সরকার সেটাই করুক।’’