রায় শোনার পর উল্লসিত জনতা। ছবি: এএফপি।
যে সমস্ত দাবিতে এক সময় কেঁপে উঠেছিল ঢাকার শাহবাগ স্কোয়ার, তারই একটিতে বুধবার সিলমোহর পড়ল। দীর্ঘ টালবাহানার পর প্রায় আড়াই বছরের বিচারপর্ব শেষে মতিউর রহমান নিজামির মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিল বাংলাদেশের ট্রাইবুনাল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, গণধর্ষণ, লুঠপাট, অগ্নিসংযোগ— এমনই বিভিন্ন মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে বুধবার এই নির্দেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১।
গত বছরের শুরুর দিকে শাহবাগ স্কোয়ার-সহ গোটা দেশ জামাতে ইসলামির নৃশংস বিরোধিতা উপেক্ষা করে জামাত-নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে গর্জে ওঠে। কাদেরের ফাঁসি তো বটেই, পাশাপাশি ওই বিক্ষোভের অন্যতম দাবি ছিল, গোলাম আজম, সাকা চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামি-র মতো যে সমস্ত গণহত্যাকারীকে প্রশাসন গ্রেফতার করেছে তাঁদেরও ফাঁসি দিতে হবে। নিজামের বিচারপর্ব দীর্ঘায়িত হওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। কিন্তু শেষমেশ সেই দাবিতে ট্রাইবুনালের সিলমোহর পড়ায় কার্যত খুশি সে দিনের সেই সব আন্দোলনকারী।
কে এই মতিউর রহমান নিজামি?
সূত্রের খবর, পাবনার মহম্মদপুর গ্রামে ১৯৪৩ সালে তাঁর জন্ম। ১৯৭১-এ তিনি ছিলেন জামাতে ইসলামির তৎকালীন ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। তখনকার সেই নিখিল পাকিস্তান ইসলামি ছাত্র সঙ্ঘের বর্তমান নাম ইসলামি ছাত্র শিবির। ’৭১-এর কুখ্যাত গুপ্তঘাতক আল বদর বাহিনীর প্রধানও ছিলেন তিনি। ২০১০ সালের জুনে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এর পরে ওই বছরের অগস্ট মাসে জানানো হয়, তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারপর্ব শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব চলে। কিন্তু চট্টগ্রাম অস্ত্রলুঠের অন্য একটি মামলার বিচারও পাশাপাশি চলতে থাকে। সে জন্য সপ্তাহে দু’দিন নিজামিকে চট্টগ্রামে হাজিরা দিতে হত। ফলে, বিচারপর্ব দীর্ঘায়িত হয়। কিন্তু গত ৩০ জানুয়ারি ওই মামলায় নিজামিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরই পাশাপাশি, ২০১৩-র নভেম্বরে নিজামির বিরুদ্ধে সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় শেষ বলে জানায় ট্রাইবুনাল। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে যে কোনও দিন রায় ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যেই ওই বছরের ডিসেম্বরে অবসরগ্রহণ করেন ট্রাইবুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার ফাঁকে পেরিয়ে যায় প্রায় দু’মাস। নতুন চেয়ারম্যান আসায় ফের এক প্রস্থ শুনানি হয়। এর পরে রায়ের দিন নির্ধারিত হয় গত ২৪ জুন। কিন্তু সেই দিন সকালে জেলের ভিতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নিজামি। কারা কর্তৃপক্ষ ট্রাইবুনালকে সে কথা জানালে, রায় ঘোষণা সে দিনের মতো স্থগিত হয়ে যায়। ট্রাইবুনালের যুক্তি ছিল, অপরাধীর অনুপস্থিতিতে রায় ঘোষণা অমানবিক। এর পরে গত জুলাইতে কারা কর্তৃপক্ষ ট্রাইবুনালকে নিজামি-র সুস্থতার খবর জানায়। তার প্রায় চার মাস পর মঙ্গলবার ট্রাইবুনাল জানায়, বুধবার নিজামির সাজা ঘোষণা করা হবে।
এ দিন সকাল থেকেই এই রায় ঘোষণাকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ও তার আশপাশের এলাকা। হাইকোর্ট এবং ট্রাইবুনালে ঢোকার সমস্ত গেটে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও র্যাব। দোয়েল চত্বর থেকে হাইকোর্ট মাজার পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। শাহবাগ মোড়েও বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় নামানো হয় সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী বিজিবি-কে।