Abhishek Banerjee

৩৬ দিনে ১০০টি কেন্দ্র ছুঁয়েছেন অভিষেক, তবে ‘সেনাপতি’র পা পড়ল না ববি-অরূপদের মতো অনেক নেতা-মন্ত্রীর বিধানসভায়

অভিষেকের প্রচারের সূচি দেখলে স্পষ্ট, এ বার তিনি বেশি জোর দিয়েছেন উত্তরবঙ্গে। দক্ষিণবঙ্গের সেই সব জায়গায় তিনি বেশি গিয়েছেন, যেখানে যেখানে বিজেপি শক্তিশালী এবং লোকসভা নির্বাচনে নতুন করে শক্তি অর্জন করেছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:০৮
Share:

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

গত ২৩ মার্চ প্রচার শুরু করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষ করলেন ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায়। এই ৩৬ দিনে কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ পর্যন্ত ১০০টি বিধানসভা কেন্দ্র ছুঁয়েছেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’। কিন্তু বেশ কিছু নেতা-মন্ত্রীর কেন্দ্রে প্রচারে যাননি তিনি, যা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণের নিরিখে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।

Advertisement

গত লোকসভা নির্বাচনের আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তৃণমূলের অন্দরে নবীন বনাম প্রবীণ বিতর্ক সপ্তমে উঠেছিল। সেই পর্বেই অভিষেক তাঁর বয়সবিধির কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন সব পেশার মতো রাজনীতিতেও অবসরের বয়স থাকা উচিত। এবং তা কখনওই ৬৫ বছরের বেশি নয়। যদিও লোকসভার প্রার্থী তালিকায় উত্তর কলকাতায় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, দমদমে সৌগত রায়, শ্রীরামপুরে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো প্রবীণদের টিকিট দিয়েছিল দল। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দেখা গিয়েছিল, ওই তিন নেতার প্রচারে যাননি অভিষেক। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারকেও সেই প্রেক্ষিতে দেখতে চাইছে তৃণমূলের অন্দরমহল।

অভিষেক মোট ১০০টি কেন্দ্রে জনসভা এবং রোডশো করেছেন। কিন্তু যে যে বিধানসভা এলাকায় যাননি, সেই তালিকাও ‘তাৎপর্যপূর্ণ’। সেই তালিকায় রয়েছে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের (বালু) হাবরা, ফিরহাদ হাকিমের (ববি) কলকাতা বন্দর, অরূপ বিশ্বাসের টালিগঞ্জ, অরূপ রায়ের মধ্য হাওড়া, মলয় ঘটকের আসানসোল উত্তর, ব্রাত্য বসুর দমদম, ইন্দ্রনীল সেনের চন্দননগর। এ ছাড়়াও কুণাল ঘোষের বেলেঘাটা, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের চৌরঙ্গী, মদন মিত্রের কামারহাটির মতো বিধানসভা কেন্দ্রে প্রচার কর্মসূচি করেননি অভিষেক। প্রকাশ্যে যা-ই হোক, এই নামগুলি নিয়ে অভিষেকের মনোভাব তৃণমূলের অন্দরে সকলেই জানেন।

Advertisement

আবার এ-ও বাস্তব যে, তৃণমূলের অন্দরে তাঁর ‘পছন্দের’ মন্ত্রী বা নেতা বলে পরিচিত অনেকের কেন্দ্রেও প্রচারে যাননি অভিষেক। সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য নাম শশী পাঁজার শ্যামপুকুর, আইএনটিটিইউসি সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র উলুবেড়িয়া পূর্ব, হুগলি-শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি অরিন্দম গুঁইনের চাঁপদানি। ফলে অভিষেকের না-যাওয়ার তালিকাকে নির্দিষ্ট কোনও ‘বন্ধনীভুক্ত’ করা যাবে না বলেই দাবি অনেকের। লোকসভা নির্বাচনের সময়ে অভিষেকের না-যাওয়া কেন্দ্রগুলির মধ্যে একটা ‘ধাঁচ’ স্পষ্ট ছিল। বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়।

বস্তুত, অভিষেক যেখানে যেখানে যেতে পারেননি, সে সব কেন্দ্রের প্রায় সব ক’টিতেই গিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার কোনও কোনও মন্ত্রীর কেন্দ্রে যাননি দু’জনের একজনও। বেলেঘাটায় কুণাল, খড়দহে দেবদীপ পুরোহিত, উত্তর দমদমে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, বন্দরে ফিরহাদ, টালিগঞ্জে অরূপের কেন্দ্রে মমতা প্রচার করলেও শশীর শ্যামপুকুর এবং ইন্দ্রনীলের চন্দননগরে যাননি দু’জনের একজনও। তবে সাংসদ কল্যাণের পুত্র তথা উত্তরপাড়ার তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে কোন্নগর জোড়াপুকুর মাঠে মমতা যে সভা করেছিলেন, সেখান থেকেই ইন্দ্রনীলের কেন্দ্র চন্দননগরের অন্তর্গত ভদ্রেশ্বরের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছিলেন তিনি।

বিজেপি এই ঘটনাকে ‘নতুন তৃণমূল’-এর বার্তা এবং ভোটের পরের কথা মাথায় রেখে ‘আগাম কৌশল’ হিসাবে দেখাতে চেয়েছে। রাজ্য বিজেপির নেতা প্রণয় রায় সোমবার প্রচারের শেষে বলেন, ‘‘অভিষেক অনেক দিন ধরেই নতুন তৃণমূলের কথা বলছেন। যে যে এলাকায় তিনি প্রচারে যাননি, দেখা যাচ্ছে সেগুলিতে প্রার্থী পুরনো তৃণমূলের নেতারা। তা ছাড়া, ভোটের পরের সমীকরণের কথা মাথায় রেখেও এ হেন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন অভিষেক। সকলেই জানেন, ভোটের পরে তৃণমূলে ভাঙন ধরবে।’’

তৃণমূল অবশ্য এর মধ্যে বিরাট কোনও ‘তাৎপর্য’ খুঁজে পায়নি। যেমন বেলেঘাটার প্রার্থী তথা তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল বলেছেন, ‘‘আমার কেন্দ্রে প্রচারে আসার জন্য অভিষেকের অফিস তাঁর তারিখও ঠিক করেছিল। পরে ঠিক হয়, মমতাদি আসবেন। মমতাদি এবং অভিষেক ভাগাভাগি করে প্রচার করেছেন। এখানে ২৯৪টি কেন্দ্র। এক জনের পক্ষে সবটা কভার সম্ভব নয়। দু’জন মিলেমিশে প্রচার করেছেন। এর মধ্যে কোনও আমরা-ওরা নেই।’’

অভিষেকের প্রচারের সূচি দেখলে স্পষ্ট, এ বার তিনি বেশি জোর দিয়েছেন উত্তরবঙ্গে। দক্ষিণবঙ্গের সেই সব জায়গায় তিনি বেশি গিয়েছেন, যেখানে যেখানে বিজেপি শক্তিশালী এবং লোকসভা নির্বাচনে নতুন করে শক্তি অর্জন করেছে। এ বার বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছাপ দেখা গিয়েছে। ৭৪ জন বিধায়ককে টিকিট দেওয়া হয়নি। সেই তালিকায় রয়েছেন অনেক মন্ত্রীও। পাশাপাশিই, কেন্দ্র বদলে দেওয়া হয়েছে ১৫ জন বিধায়কের। তৃণমূলের অন্দরে অনেকেই একে ‘সংস্কার’ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। যার মধ্যে অভিষেকের ‘হয় কাজ করো, নয় বিদায় হও’ তত্ত্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল। তবে তাঁর প্রচারকে নির্দিষ্ট কোনও প্রবণতা দিয়ে এখনই ব্যাখ্যা করতে চাইছে না তৃণমূলের একাংশ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement