West Bengal Election 2026 Results

ক্ষমতার রথে চেপেই আগমন! তৃণমূল সরতেই অভিষেকের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা, এ বার কোন পথে দলের ‘সেনাপতি’?

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে অভিষেকের ক্ষমতা ক্রমে বেড়েছিল তৃণমূলের অন্দরে। শুধু আনুষ্ঠানিক ভাবে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া নয়, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণও চলে গিয়েছিল তাঁর হাতে। তৃণমূলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে কালীঘাটের পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে মাথা তুলেছিল ক্যামাক স্ট্রিট।

Advertisement

শোভন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ২২:৪২
Share:

(বাঁ দিকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দল ক্ষমতায় থাকালীন ১২ বছর আগে তিনি সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। ১২ বছর পরে তিনি সরাসরি বিরোধী পরিসরে। প্রথম বার। তৃণমূল ক্ষমতা থেকে চলে গেল। তিনি কী করবেন?

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে সরতেই জল্পনা শুরু হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি কি বিরোধী পরিসরে রাজনীতি চালিয়ে যাবেন? নাকি ভিন্ন কোনও পথে হাঁটবেন? জল্পনা এই কারণেই যে, অভিষেকের রাজনীতিতে আসা, নেতা হয়ে ওঠা, সবই তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে। ২০১১ সাল পরবর্তী সময়ে।

আপাতত মঙ্গলবার বিকাল ৪টেয় মমতার সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে হাজির হবেন অভিষেক। সেখানে দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে একটা দিশা তাঁরা দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলেই মনে করছে তৃণমূলের অন্দরমহল। সে দিশা কোন পথে চলবে, তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে জল্পনা এবং আলোচনা শুরু হয়েছে।

Advertisement

তৃণমূলে অভিষেকের ক্ষমতা যত বেড়েছে, ততই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁর উপাধি। কখনও তাঁকে অভিহিত করা হয়েছে ‘যুবরাজ’ বলে, কখনও বলা হয়েছে ‘সেনাপতি’। তাঁর জন্মদিনে তৃণমূল কর্মীদের একটি গোষ্ঠীর যে সংগঠিত উদ্‌যাপন দেখা যেত, তা যে কোনও বলিউড তারকার চেয়ে কম নয়। তাঁর কনভয় গেলে স্তব্ধ হয়ে যেত রাজপথ। কিন্তু ক্ষমতার পলেস্তরা খসে পড়ার পরে অভিষেকের কী হবে, তিনি রাজনীতিতে কী ভাবে সক্রিয় থাকবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। হারের পরে সোমবার বিকালে প্রকাশ্যে এসেছিলেন অভিষেক। আলিপুর সার্ভে বিল্ডিং চত্বরে তিনি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিজেপির সংস্কৃতি দেখছেন!’’ দৃশ্যতই বিধ্বস্ত অভিষেক গাড়িতে উঠে তার পরে যান সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে। সেখানে ভবানীপুরের গণনা চলছিল। কিন্তু অভিষেককে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। পরে হেস্টিংসের গণনাকেন্দ্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়।

দলের অন্দরে কিছু সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন অভিষেক। বিধানসভা ভোটের প্রার্থিতালিকাতেও তার ছাপ ছিল। কিন্তু সেই সংস্কার যে অনেক দেরিতে শুরু হয়েছিল, তা বোঝা গেল নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে। অভিষেক বরাবরই তৃণমূলের পুরনো সংস্কৃতির বিপরীতে হেঁটেছেন। ‘নতুন’ তৃণমূলের কথা তাঁর কাছে শোনা গিয়েছে। দল চালানোর পদ্ধতি নিয়ে কখনও সখনও নেত্রী মমতার সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্যও হয়েছে। তবে সে মতানৈক্য আবার মিটে গিয়েছে সঙ্কটকালে।

তৃণমূলে ক্ষমতার ব্যাটন যে মমতা তাঁর পরে অভিষেকের হাতেই তুলে দিয়েছেন, দলের অন্দরে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। অভিষেককে দলের মূলস্রোতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন মমতাই।

২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে অভিষেককে দলে অন্তর্ভুক্ত করার পর্বে তৃণমূলে নতুন যুব সংগঠন তৈরি হয়েছিল। যুব তৃণমূল ছিলই। সমান্তরাল সংগঠন হিসাবে মাথা তুলেছিল ‘যুবা’। যার মাথায় বসানো হয়েছিল অভিষেককে। সেই সময়ে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তী সময়ে সৌমিত্র খাঁয়ের হাত থেকে যুব তৃণমূলের সভাপতি পদ যায় অভিষেকের হাতে। তার পরে কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল ‘যুবা’। এর মধ্যেই ২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ হন অভিষেক। তার পর থেকে সমান্তরাল ভাবে তৃণমূলের ক্ষমতা এবং তৃণমূলের অন্দরে অভিষেকের ক্ষমতা বেড়েছে।

শুভেন্দুর মতো তৃণমূল ছেড়ে গিয়ে অন্য শিবিরে প্রতিষ্ঠা পাওয়া অনেকেই নানা সময়ে অভিষেকের ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, রাজনীতি করে অভিষেকের উত্থান হয়নি। পারিবারিক সূত্রে মমতার ভাইপো হওয়ার কারণে তিনি ক্ষমতার ইমারতের উপর প্যারাস্যুটে করে এসে নেমেছিলেন। যদিও সে কথার জবাব দিতে গিয়ে মমতা একাধিক বার বলেছেন, ‘‘অভিষেক অনেক ছোট থেকে রাজনীতি করে। ওর যখন দু’বছর বয়স, তখন একা একা বাড়িতে মিছিল করত আর স্লোগান দিত— দিদিকে মারলে কেন? সিপিএম জবাব দাও!’’

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে অভিষেকের ক্ষমতা ক্রমে বেড়েছিল তৃণমূলের অন্দরে। শুধু আনুষ্ঠানিক ভাবে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া নয়, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণও চলে গিয়েছিল তাঁর হাতে। তৃণমূলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে কালীঘাটের পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে মাথা তুলেছিল ক্যামাক স্ট্রিট। এখন তিনি লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা। গত পাঁচ বছরে একাধিক বার বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে মমতার সঙ্গে তাঁর মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। কখনও কখনও তা সংঘাতেও পর্যবসিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাঁর নিজেকে গুটিয়ে রাখা এবং ভোট মিটতেই ‘ছুটি’তে চলে যাওয়া তৃণমূলের অন্দরে নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছিল। তবে বিধানসভা ভোটের সময় মন দিয়েই প্রচারে নেমেছিলেন অভিষেক। ভোটের প্রচার যখন মধ্যগগনে, নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহেরা যখন বাংলায় ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছিলেন, সেই পর্ব থেকেই ভোটের পরে ডিজে বাজানোর কথা বলতে শুরু করেছিলেন অভিষেক। বলেছিলেন, ‘‘৪ তারিখে জেতার পরে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সঙ্গে ডিজে-ও বাজবে।’’ শাহকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছিলেন, ‘‘ক্ষমতা থাকলে ৪ তারিখ বেলা ১২টার পরে বাংলায় থাকবেন!’’

ডায়মন্ড হারবারে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সাত লক্ষাধিক ভোটে জিতেছিলেন অভিষেক। তাঁর নিরাপত্তার বহর, জীবনযাপন নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে কম আলোচনা নেই। কার্যত ‘ডায়মন্ড হারবারের মুখ্যমন্ত্রী’ হয়ে উঠেছিলেন অভিষেক। তৃণমূল ক্ষমতা থেকে সরতেই কৌতূহল, বিজেপি তাঁর কনভয়ের বহর, নিরাপত্তাবেষ্টনী, তাঁর বাড়়ির সামনে পুলিশি প্রহরার দুর্গ রাখবে কি না। না-রাখলে অভিষেকই বা কী করবেন? বিরোধী পরিসরে তিনি খাপ খাওয়াতে পারবেন? কারণ, বিরোধী পরিসরে থেকে রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়নি।

যদিও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, অভিষেক যখন থেকে সাংসদ, তখন থেকে দিল্লির রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী পরিসরেই রয়েছে তৃণমূল। গত কয়েক বছরে সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী পরিসরে তৃণমূলের যে উচ্চতা বেড়েছে, তার নেপথ্যেও অভিষেকের ভূমিকা রয়েছে। তা ছাড়া, ২০১৯ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে কায়দায় ঝাঁপিয়েছিল, তাতে ‘বিরোধী’ হিসাবেই শাসকের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে তাঁকে। ইডি-সিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে।

তবে পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। সেই অংশের বক্তব্য, অভিষেক যা-ই করে থাকুন, সে সবের সঙ্গে জুড়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ক্ষমতা, পুলিশ এবং শাসকদলের বাহিনী। এগুলোকে বাদ দিয়ে অভিষেককে রাজ্য রাজনীতি কখনও দেখেনি। তৃণমূল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন অভিষেকের বয়স ছিল ২৪ বছর। তার আগে তাঁর ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠন করার অভিজ্ঞতা ছিল না। দিল্লিতে পড়াশোনার পরে কিছু দিন একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করছিলেন। তার পর থেকে রাজনীতিতেই আছেন। ছিলেন ক্ষমতার রাজনীতিতে। সোমবার দুপুরের পর থেকে তিনি বিরোধী পরিসরে।

শুধু শুভেন্দু নন। মুকুল রায়ের মতো নেতারও তৃণমূল ছাড়ার নেপথ্যে অভিষেকের ‘ভূমিকা’ ছিল বলে তৃণমূলের অন্দরেই আলোচনা রয়েছে। প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার, সম্বোধনের ভঙ্গি, পুরনোদের সরিয়ে নতুনদের তুলে আনার প্রক্রিয়া নিয়েও কম আলোচনা তৃণমূলে ছিল না। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষমতায় থাকা তাতে অনেকটা প্রলেপ দিয়ে রেখেছিল। দেড় দশকের ক্ষমতা হারানোর পরে সে সব রাংতা খসে পড়তে শুরু করেছে। বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর আলোচনায় উঠে আসছে প্রার্থীচয়নে অভিষেকের সংস্কারনীতিও। রাজনীতি সম্পর্কে কম বয়সের ‘রোমান্টিকতা’ই তৃণমূলের জন্য কাল হল কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

অভিষেকের হাত ধরে তৃণমূলে কর্পোরেট সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল। গোড়ার দিকে তা নিয়ে নানা কথা থাকলেও ২০২১ সালের নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের বিপুল জয় সেই সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। টিকে থাকতে গিয়ে অনেক প্রবীণও সেই সংস্কৃতি মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু দল ক্ষমতা থেকে সরতেই দল পরিচালনায় সাংস্কৃতিক বদল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংগঠনে নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার পরে জেলায় জেলায় প্রবীণদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত নতুনদের জায়গা করে দিয়েছিলেন অভিষেক। কোচবিহারে রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বদলে পার্থপ্রতিম রায় বা হিপ্পিদের নেতা হয়ে ওঠা, হাওড়ায় অরূপ রায়ের বদলে পুলক রায় বা গৌতম চৌধুরীদের উত্থান, দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে শোভন চট্টোপাধ্যায়দের ‘মুছে’ দিয়ে শামিম আহমেদ, জাহাঙ্গির খানদের তুলে আনা— এমন উদাহরণ অনেক।

গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে নতুন তৃণমূলের কথা বলছিলেন অভিষেক। বিধানসভার প্রার্থিতালিকায় তার ছাপও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু অভিষেকের নতুন তৃণমূলের তত্ত্ব ১৫ বছরের স্থিতাবস্থা-বিরোধিতার ঢেউকে সামলাতে পারল না। ভেঙে পড়ল তৃণমূলের ক্ষমতার সৌধ। দেড় দশক পরে পশ্চিমবঙ্গ আরও একটা পরিবর্তন দেখল। বহুদিনের ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছোল বিজেপি। অভিষেক ডিজে বাজানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু সোমবার দুপুরের পর থেকে তৃণমূলের রিংটোনে বেহালার করুণ সুর।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement