(বাঁ দিকে) মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
এত দিন ছিল বদলি বা সাসপেন্ড সংক্রান্ত হুঁশিয়ারি। এ বার চাকরি না-রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েই মালদহ-কাণ্ডের পরে রাজ্য প্রশাসনের সর্বস্তরের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির বিবেচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে কমিশনকেই। তার পরেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও), রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি (আইনশৃঙ্খলা), কলকাতার পুলিশ কমিশনার, সমস্ত জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক, পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপারদের নিয়ে বৈঠক করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চ। দিল্লির নির্বাচন সদনে গিয়েছেন মুখ্যসচিব দুষ্যন্ত নারিয়ালাও। সূত্রের দাবি, সকলের উদ্দেশে কমিশনের হুঁশিয়ারি— এর পরে কর্তব্যে এমন একটিও গাফিলতি ঘটলে চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে যে কোনও আধিকারিকের।
রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কর্মরত বিচারকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বাড়াতে কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্টও। মালদহের ঘটনার তদন্তভার এনআইএ-কে দেওয়া হয়েছে বলে খবর। কলকাতায় সিইও দফতরের সামনে অশান্তির ঘটনায় এ দিনই কলকাতা পুরসভার দুই কাউন্সিলর-সহ ছ’জনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় এফআইআর দায়ের হয়েছে।
কমিশনের এক কর্তার কথায়, “বিশেষ আইনি ক্ষমতায় চাকরি থেকে বরখাস্ত, আগাম অবসরে বাধ্য করার মতো এমন নানা শাস্তির ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের হাতে। এ দিন বৈঠকে সকলকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে— এখন আর বদলি বা সাসপেন্ড করাতেই কমিশন থেমে থাকবে না। তেমন গাফিলতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির পথে হাঁটবে। কারণ, মালদহের ঘটনায় বড় মাপের গাফিলতি রয়েছে।”
এ দিন মালদহের জেলাশাসক এবং পুলিশ কমিশনার সরাসরি কমিশনের তোপের মুখে পড়েন। জানতে চাওয়া হয়, গোলমালের সময়ে তাঁরা কোথায় ছিলেন? কেন জেলাশাসককে ফোনে পাওয়া যায়নি? বাংলোয় বসে থাকা জেলাশাসকের একমাত্র কাজ কি না? ঘটনাস্থলে পুলিশ সুপার কেন যাননি, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। পুলিশ সুপার জানান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং অন্য আধিকারিকেরা সেখানে গিয়েছিলেন। পাল্টা কমিশনের প্রশ্ন, তবে কি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকেই জেলা সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হবে! এই সূত্রে রাজ্য পুলিশের ডিজিও কমিশনের তোপের মুখে পড়েন। কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁকে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কোনও ত্রুটি বরদাস্ত করা হবে না। এই বৈঠকের পরে ডিজি সব পুলিশ সুপার এবং কমিশনারদের নিয়েবৈঠক করেন।
সূত্রের দাবি, কলকাতার পুলিশ কমিশনার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কেন করতে পারছেন না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। নতুন করে কমিশনকে প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে কি না, তা জানতে চাওয়াহয়েছে। প্রসঙ্গত, গত সোমবার থেকে সিইও অফিসের সামনে টানা বিক্ষোভ চলছে। একই প্রশ্ন তোলাহয়েছে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারের উদ্দেশেও। কমিশনের নির্দেশ— যে দুষ্কৃতী বা অভিযুক্তরা এখনও পুলিশের নিরাপত্তা নিয়ে ঘোরাফেরা করছে, সেই নিরাপত্তা প্রত্যাহার করতে হবে রাত ১২টার মধ্যে। এক কর্তার কথায়, “জেলাশাসকদের কমিশন বলেছে—আইন মেনে কাজ করতে না পারলে তাঁরা যেন ইস্তফা দেন।” তবে এ দিন স্বরাষ্ট্র সচিবের ভূমিকার প্রশংসা করেছে কমিশন।
প্রশাসন সূত্রের দাবি, কর্মরত বিচারকেরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে হাই কোর্টের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মালদহের ঘটনা দেখে ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড থেকে আসা বিচারকেরাও আতঙ্কিত। তাই সব জায়গায় এসআইআর-এ কর্মরত বিচারকদের নিরাপত্তা পর্যাপ্ত হারে বাড়াতে বলা হয়েছে। বিচারকদের নিরাপত্তায় গাফিলতি এবং মালদহের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যে বরদাস্ত করা হবে না, সেই বার্তাও দেওয়া হয়েছে। বুধবার মালদহে কর্মরত বিচারকদেরআটকে রেখে যে অবরোধ হয়েছে, তা সরাসরি বিচার ব্যবস্থার উপরে আঘাত বলেই মনে করছে হাই কোর্ট। এই ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনের ভূমিকায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ আদালত। একটি সূত্রের দাবি, বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনা জানতে পেরেই হাই কোর্টের তরফে মুখ্যসচিবকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাঁর সাড়া মেলেনি।তখন স্বরাষ্ট্রসচিবকে ডেকে পাঠায় আদালত। পরবর্তী সময়েও মুখ্যসচিবকে পাওয়া যায়নি বলে খবর। সূত্রের খবর, বুধবার রাতেই এই ঘটনা নিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে একাধিক আর্জি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে জমা পড়েছে। তবে এসআইআর-মামলা যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের হাতে এবং শীর্ষ আদালতের নির্দেশেই রাজ্য এবং প্রতিবেশী দুই রাজ্যের বিচারকেরা এসআইআর-এর কাজে নেমেছেন, তাই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় হাই কোর্ট প্রশাসন। প্রধান বিচারপতির দফতর থেকে এ দিন সকালে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টকে লিখিত ভাবে জানানো হয়।
এ দিনই পুলিশ দুটি মামলা রুজু করেছে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে। যাতে নাম রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের দুই কাউন্সিলর সচিন সিংহ এবং শান্তি রঞ্জন কুণ্ডুর। নাম রয়েছে বিএলও অধিকার রক্ষা মঞ্চের নেতা মইদুল ইসলাম-সহ কয়েকজনেরও। সোমবার থেকেই নির্বাচন কমিশনের অফিসের সামনে দফায় দফায় গোলমাল হয়ে চলেছে। তাতে সংশ্লিষ্টরা ছিলেন বলে খবর। অভিযোগ, মঙ্গলবার রাতে অভিযুক্ত দুই কাউন্সিলরের নেতৃত্বে অশান্তি হয়। আর তাতেই নির্বাচন কমিশনের তরফে পুলিশকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়। রাজ্যে সর্বত্র অবৈধ জমায়েতের উপরেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে