বর্ষা এলেই এমন বানভাসি হয় আরামবাগের বিভিন্ন এলাকা। —ফাইল চিত্র।
কাজ যে কিছুই হয়নি, এমনটা নয়। কিন্তু হুগলির এই তল্লাটে অপ্রাপ্তির তালিকাই যেন দীর্ঘতর। সবার উপরে রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণের দাবি। এ বার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আলু চাষে দাম না মেলায় হাহাকার এবংভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ বহুনাম বাদ যাওয়ার উদ্বেগ। স্বাভাবিক ভাবেই ভোটের বাজারে তার প্রভাব পড়ছে।
বন্যাপ্রবণ আরামবাগ মহকুমার, বিশেষ করে খানাকুলের মানুষকবে বানভাসি হওয়া থেকে মুক্তি পাবেন— তার উত্তর কারও জানা নেই। প্রায় প্রতি বছরই বৃষ্টি ওডিভিসি-র ছাড়া জলে ডুবে যায় এলাকা। নদী-খাল সংস্কারে বিপুল টাকা খরচ হলেও স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যাচ্ছে। তাই ভোটের আবহে প্রশ্ন উঠছে, এত খরচের ফল কোথায়?
আরামবাগ মহকুমা দিয়ে বয়ে গিয়েছে দামোদর, দ্বারকেশ্বর, মুণ্ডেশ্বরী ও রূপনারায়ণ। এই সব নদ-নদীর জল খানাকুলে এসেরূপনারায়ণে মেশে। বন্যার সময়ে শাবলসিংহপুর, মাড়োখানা, ধান্যগোড়ি, রাজহাটি, পানশিউলি, নন্দনপুর— বহু এলাকায় একতলা বাড়ির উচ্চতা ছাপিয়ে জল ওঠে। গৃহহীন হয়ে পড়েন বাসিন্দারা। চিংড়ার বাসিন্দা সবুজ ধাড়ার কথায়, “এত জল জমে থাকে যে, বন্যার ১৫ দিন পরেও অন্তঃসত্ত্বাকে ডাঙায় তুলতে ডোঙার সাহায্য লাগে।” অতীতে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে বন্যার্তদের উদ্ধার অভিযানের সাক্ষীও থেকেছে খানাকুল। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু বার অভিযোগ করেছেন, ডিভিসি অতিরিক্ত জল ছাড়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনা কি তা-ই?
সরাসরি জবাব দেন না এলাকাবাসীরা। তবে সবুজ ধাড়া, দেবাশিস শেঠদের মত, শুধু বহু অর্থ ব্যয়ে নদী সংস্কারই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রূপনারায়ণের ড্রেজ়িং ও উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা। দেবাশিসবলেন, “অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও পর্যাপ্ত কালভার্টের অভাবে নদীর স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।” মুণ্ডেশ্বরীর পাড়ে বসে রূপনারায়ণের ড্রেজ়িং নিয়ে সওয়াল করেন রতন মান্না, রতন সাঁতরার মতোচাষিরা। গড়গড় করে বলে যান, কোন কোন নদী-খালে সেতু বা সাঁকোহওয়া জরুরি। কিন্তু সেই সব দাবি রাজনীতির ঘূর্ণিতে হারিয়ে যায় বলেই অভিযোগ।
খানাকুলের তৃণমূল প্রার্থী পলাশ রায়ের দাবি, “রাজ্য সরকার বন্যা প্রতিরোধে কাজ করছে। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে রূপনারায়ণেরসংস্কারও হবে।” বিজেপির রাজ্য সম্পাদক তথা পুরশুড়ার প্রার্থী বিমান ঘোষের পাল্টা অভিযোগ,“খানাকুলের চোখের জল মোছাতে রাজ্য ব্যর্থ। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানেরজন্য কেন্দ্রের টাকা এসেও ফেরত গিয়েছে।”
পাশাপাশিই রয়েছে এসআইআর নিয়ে ক্ষোভ। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনীতে আরামবাগ মহকুমার মধ্যে খানাকুলেই সবচেয়ে বেশি— ২৪৩৪৮ জনের নাম বাদ পড়েছে। এর জন্য বিজেপিকে দায়ী করছেন অনেকে। বাদ পড়া ভোটারদের অনেকেই মহকুমাশাসকের দফতরে ভিড় জমাচ্ছেন, ট্রাইবুনালে আবেদন জানাতে।
তবে উদ্বেগ শুধু ভোটাধিকার নিয়ে নয়। মাঠে এখনও পড়ে রয়েছে আলু। দাম না মেলায় চাষিদেরক্ষোভ চরমে। পুরশুড়ার গোবিন্দপুরের চাষি বিশ্বজিৎ কাঁড়ার জানালেন,বিঘে নয়েক জমিতে ‘পোখরাজ’, ‘হেমাঙ্গিনী’ ও ‘কলম্বো’ প্রজাতির আলু চাষ করে লোকসানের মুখে পড়েছেন। জমিতে পচছে আলু। বিশ্বজিৎকলেজে পড়ার পাশাপাশি ফোটোগ্রাফির কাজ করেন। পরিবার একাধিক সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেলেও তাতে সুরাহা হচ্ছে না। তাঁর দাবি, ফসল বিক্রির উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি করা জরুরি। একই দাবি তুলেছেন খানাকুলের আরএসপি প্রার্থী বিপ্লব মজুমদারও।
মহকুমার অন্য এলাকাতেও একই চিত্র। তারকেশ্বর থেকে ট্রেনে আলু ভিন্ রাজ্যে পাঠানোহলেও, বহু চাষি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। গোঘাটের সুবীর সাঁতরার গলায় অসহায়তা, “ভাগ্যিস ঋণ শোধে এখনও চাপ আসেনি।” শ্যামবাটীর নবরামপালুই ও তরুণ ঘোষদের হিসাব বলছে, বিঘা প্রতি চাষের খরচ ৩০-৩২ হাজার টাকা, উৎপাদন গড়ে ১০০বস্তা (৫০ কেজিতে এক বস্তা)। বিক্রি করে মিলেছে ১০-১২ হাজারটাকা। বিঘা পিছু গড় লোকসান প্রায় ২০ হাজার টাকা। রাজ্য সহায়কমূল্যে আলু কেনার কথা বললেও এলাকায় সেই কাজ শুরু হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী প্রচারে এসে আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু তাতে সংশয় কাটেনি। এমনকি স্থানীয় তৃণমূল নেতারাও উদ্বিগ্ন— এই ক্ষোভ ভোটে প্রভাব ফেলবে না তো?
তবে কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তিও রয়েছে। দীর্ঘদিনের জমি-জট কাটিয়ে গোঘাটের ভাবাদিঘিতে রেল প্রকল্পেরকাজ শুরু হয়েছে। আবার বহুসংঘর্ষ-দেখা আরামবাগ আপাতত শান্ত, এই কৃতিত্ব নির্বাচন কমিশনকে দিচ্ছে বিজেপি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে মহকুমার চারটি আসনই জিতেছিল বিজেপি। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে আরামবাগ বাদে বাকি তিনটিতেও তারা এগিয়ে ছিল। তাদের দাবি, এ বারও ফল হবে ৪-০।
অন্য দিকে, বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা অভয় ঘোষের দাবি, “তৃণমূলের অত্যাচারে মানুষ বীতশ্রদ্ধ। সব শেষ করে দিয়েছে ওরা।” তৃণমূলের আরামবাগ পুরপ্রধান সমীর ভান্ডারীর পাল্টা বক্তব্য, “সিপিএমের নৃশংসতা মানুষ ভোলেনি। মানুষ ওদের ত্যাগ করেছে।”
এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি— আরামবাগকে পৃথক জেলা ঘোষণা করা। সেই দাবি এখনওপূরণ হয়নি। খানাকুলে রাজা রামমোহন রায়ের জন্মস্থান রাধানগরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি, রেল সংযোগও পৌঁছয়নি। সবেসমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। আনাজ সংরক্ষণ কেন্দ্র বা নতুন হিমঘরই বা তৈরি হয় কই? আরামবাগের কালীপুরে নতুন সেতুর অভাবে ভোগান্তি অব্যাহত।
এই ভোট-মরসুমে বহু নির্বাচন দেখা প্রবীণরা— পুরশুড়ারসুভাষ মাইতি বা গোঘাটের তারাপদ রানা— এক সুরে বলছেন, অপ্রাপ্তির তালিকা ছোট হোক। বন্যার দাপট কমাতে চোখে পড়ার মতো উদ্যোগ চাই। তাঁদের কথায়, “ভোট এলেই বেশি করে মনে হয়, আমরা যেন বানের জলে ভেসে এসেছি।”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে