West Bengal Elections 2026

‘অভিমানী’ অনুব্রত, নিজের কেন্দ্রেই কাজল

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে শেষ বার বীরভূমে ভোট করিয়েছেন অনুব্রত। এর পর ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগেই তাঁর জেলযাত্রা। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের সময়েও তিনি তিহাড় জেলে বন্দি ছিলেন।

নীলোৎপল বিশ্বাস, চন্দন বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৪
Share:

বোলপুরের ভগবৎ নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয় থেকে ভোট দিয়ে বেরিয়ে অনুব্রত মণ্ডল। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।

তাঁরা পারতপক্ষে একে অপরের নাম মুখে আনেন না। কিন্তু নাম মুখে না এনেই পরস্পরের প্রতি এমন বিষোদ্গার চালান যে বাকিদের বুঝতে বাকি থাকে না, লক্ষ্য আসলে কে! এমন দু’জনের উপরেই বৃহস্পতিবার বীরভূমে তৃণমূলের ভোটের বৈতরণী পার করানোর ভার ছিল। এঁদের এক জন অনুব্রত মণ্ডল, অন্য জন কাজল শেখ। কী করলেন তাঁরা? অনুব্রত নিজের ভোটটি দিয়ে দিনভর বোলপুরের দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে থাকলেন। আর কাজল নানুরে নিজের বাড়ির কাছের বুথে ভোট দিয়ে সোজা চলে গেলেন বীরভূমের অন্য প্রান্তে, যেখান থেকে তিনি এ বার প্রার্থী হয়েছেন, সেই হাঁসন কেন্দ্রে। এর পর দিনভর সেখানেই চষে বেড়ালেন নিজের পক্ষে ‘ভোট করাতে’। কিন্তু গোটা জেলার ভোট আদতে করালেন কারা? দু’জনের মধ্যে এক বারও কি ফোনে কথা হল? দিনের শেষে দু’জনের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট, ভোট যুদ্ধের চেয়ে ‘ইগো’-র যুদ্ধ এ দিনও জিতে গিয়েছে বীরভূমে।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে শেষ বার বীরভূমে ভোট করিয়েছেন অনুব্রত। এর পর ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগেই তাঁর জেলযাত্রা। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের সময়েও তিনি তিহাড় জেলে বন্দি ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে বীরভূমের ক্ষমতার মানচিত্রে দ্রুত উত্থান অনুব্রতের বিরোধী গোষ্ঠী বলেই পরিচিত কাজলের। এই সময়ের মধ্যেই জেলা পরিষদের সদস্য এবং জেলা সভাধিপতি হন কাজল। ক্ষমতার ভরকেন্দ্র দ্রুত অনুব্রত থেকে কাজলের দিকে হেলতে থাকে। অনুব্রত জেলে থাকাকালীন যে কোর কমিটি করে দেয় তৃণমূল, তাতে অনুব্রতকে আহ্বায়ক করা হলেও জেলা সভাধিপতি হিসেবে কার্যত জেলা চষে বেড়াতে থাকেন কাজল। এর মধ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে তো বটেই, লোকসভাতেও ভাল ফল করে তৃণমূল। ২০১৯ সালের থেকেও ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান বাড়ে। এই নিরিখে জেলমুক্তির পরের প্রথম এই ভোটে অনুব্রত কী করেন, সে দিকে নজর ছিল সব পক্ষেরই। সে দিক থেকে প্রকাশ্যে তাঁকে শুধু এ দিন দেখা গেল ভোটারের ভূমিকাতেই।

মেয়েকে নিয়ে ভোট দিয়ে আসার পরে বোলপুরের দলীয় কার্যালয়ে বেলা ১১টার মধ্যে ঢুকে যেতে দেখা যায় তাঁকে। গরমে দৃশ্যত বিহ্বল অনুব্রত এর পর শুধু এক বিশ্বস্ত সঙ্গীর সঙ্গে সেই ঘরেই থেকেছেন দিনভর। সেখান থেকেই ফোন ঘুরিয়ে ভোটের খবর নিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। দলীয় কার্যালয়ে বা বাড়িতে তাঁকে ঘিরে পরিচিত ভিড়েরও দেখা নেই এ দিন। অনেক বেশি শান্ত, হিসাবি দেখায় অনুব্রতকে। এত হিসাবি অনুব্রতকে কি মানায়? প্রশ্ন শুনে ফোনে কোথায় কেমন ভোট পড়ছে জেনে নেওয়ার মধ্যেই অনুব্রত বললেন, “হিসাব তো করতেই হবে। এখন আমি জেলার সভাপতি নই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করে দেওয়া কোর কমিটির আহ্বায়ক মাত্র। শুধু মিটিং ডাকা আমার কাজ।” তাই বলে ভোটের দিনও এত চুপচাপ? আস্থাভাজনের ধরিয়ে দেওয়া ফোন সেরে বললেন, “ভোট ভোটের মতো হবে। যা করে দিচ্ছি, তাই তো অনেক। সব জায়গায় তো আমাকে প্রচারে ডাকাও হয়নি।” এর মধ্যেই প্রশ্ন উড়ে আসে, হাঁসন কেন্দ্রে ভোট কেমন হচ্ছে, খবর এল? নেতার উত্তর, “গোটা বীরভূম এক সময় আমার দায়িত্বে ছিল। তখন নিশ্চিত হয়ে সবটা বলতাম। কিন্তু তৃণমূল থেকে দাঁড়ালে, তিনি যে-ই হোন, জিতবেন।” এরপর হিসাবি কায়দায় বলেন, “ওই সব দিকে সংখ্যালঘু ভোট অনেক। ফলে এমনিই জিতব।”

জেলা তৃণমূল সূত্রের খবর, হাঁসন, দুবরাজপুর, নানুরে নির্বাচনের আগে প্রচারে দেখা যায়নি অনুব্রতকে। এই এলাকাগুলির ভার কাজলের উপরেই। তবে হাঁসন ছাড়া এই চত্বরের কোথাওই এ দিন কাজলকে ঘুরতে দেখা যায়নি। নানুরে পাপুড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে নিজের ভোট দিয়ে তিনটি সাদা রঙের গাড়ি নিয়ে পুলিশ এবং নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীর ঘেরাটোপে তিনি ছোটেন প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের হাঁসনে। তার আগে বাড়ি গিয়ে মাকে প্রণাম সারেন কাজল। পথে এক বার গাড়ি থামিয়ে ফোন কানে নেমে যেতে দেখা যায়। নিরাপত্তা বলয় পিছনে রেখে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে কিছু ক্ষণ কথা বলেন তিনি। এর পরে আর থামেননি। হাঁসন বিধানসভার বিভিন্ন এলাকা চষে বেরিয়েছেন। বুথে নেমে কর্মীদের অভিযোগ শুনেছেন। কখনও ফোনে উত্তেজিত হয়ে নির্দেশ দিতে দেখা গিয়েছে, কখনও আবার কর্মীদের কাঁধে হাত রেখে গল্প করেছেন খোশমেজাজে। মিটিয়েছেন নিজস্বীর ‘আবদার’ও। এরই মধ্যে বার দুয়েক বুথে ঢোকার মুখে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে থমকাতে হয়েছে প্রার্থীকে। উজিরপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে তৃণমূল প্রার্থী ঢুকতে গেলে বাধা দেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা। প্রায় ১০ মিনিট তাঁকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললে বুথে ঢোকার অনুমতি মেলে। নওয়াপাড়াতেও বুথে ঢুকতে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, “এখানে আমি না ঘুরলেও জোড়াফুল জিতবে। শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী কেন, আমেরিকা থেকে বাহিনী আনলেও বীরভূমে জোড়াফুল ফোটানো কেউ আটকাতে পারবে না।”

জেলার ১১টি কেন্দ্রেই যাতে ফুল ফোটে, সে ব্যাপারে অনুব্রতের সঙ্গে কথা হল? উত্তর দেন না কাজল। চোখেমুখে ফুটে ওঠে তাচ্ছিল্যের হাসি। ঠিক যে ভাবে কাজলের সঙ্গে কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে অনুব্রত না শোনার ভান করে কানে ফোন তুলে নেন! বোঝা যায়, ভোটযুদ্ধের দিনেও ব্যক্তি-যুদ্ধ ঘোচেনি বীরভূমে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন