TMC Candidate List

সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা! দেরি হয়ে গেল না তো?

এই প্রার্থিতালিকা অভিষেকেরও অগ্নিপরীক্ষা। সীতাকে যেমন তাঁর সতীত্বের প্রমাণ দেওয়ার জন্য অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল, তেমনই তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষায় উপনীত হচ্ছেন বিধানসভা ভোটে।

Advertisement

অনিন্দ্য জানা

শেষ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫৫
Share:

মমতা এবং অভিষেক সংস্কারের স্রোতে তরী বাইতে শুরু করলেন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কিসের সংস্কার? তৃণমূলের। কোথায় সংস্কার? দলের প্রার্থিতালিকায়। কোন অগ্নিপরীক্ষা? বিধানসভা নির্বাচন।

Advertisement

দলগঠনের প্রায় তিন দশক পরে এবং সরকারে থাকার ১৫ বছরের মাথায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আসন্ন বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী নির্বাচনে যে সংস্কারধর্ম পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা নজিরবিহীন! হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তাঁর বাড়ির লাগোয়া দফতর থেকে মমতা-অভিষেক (না কি অভিষেক-মমতা) বিধানসভা ভোটের যে প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে ৭৪ জন বিধায়ক বাদ! কেন্দ্র বদলে দেওয়া হয়েছে ১৫ জন বিধায়কের। প্রার্থিতালিকায় ১০৩টি নতুন মুখ।

কিন্তু তৃণমূলে সে অর্থে কোনও ‘ঝড়’ ওঠেনি। কিছু মান-অভিমান, কিছু মন কষাকষি, কিছু চোথের জল, কিছু গোসাঘরে খিল, ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলের ছবি বদলে দেওয়া বা সমাজমাধ্যমে অমুক ‘যোগ্য’ প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও টিকিট দেওয়া হল না-র মতো ক্বচিৎ বুড়বুড়ি উঠেছে মাত্র। কারণ, ‘বিক্ষুব্ধ’ হয়ে যাওয়ার মতো কোনও দল নেই। বস্তুত, যাঁরা নিজেদের ‘বঞ্চিত’ মনে করছেন, তাঁদের দোষ নেই। কারণ, প্রার্থিতালিকায় কাটছাঁট যা হতে পারত, ততটাও হয়নি। গত কয়েক মাস ধরে যা শোনা যাচ্ছিল, শেষপর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হলে দলের অন্দরে বোমা পড়ত। ক্ষোভের বোমা নয়, বিস্ময়ের বোমা! প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছিল, প্রায় ১০০ জন বিধায়ককে টিকিট দেওয়া হবে না। যাঁদের মধ্যে প্রচুর মন্ত্রীও থাকবেন। বাস্তবে ততটা হয়নি। ভারসাম্যের খাতিরে কিছু নেতা ‘গোললাইন সেভ’ করতে পেরেছেন।

Advertisement

যে প্রার্থিতালিকা ঘোষিত হয়েছে, তার ছত্রে ছত্রে ‘সেনাপতি’ অভিষেকের ছাপ স্পষ্ট। আরও স্পষ্ট দলের অন্দরে সংস্কারের ছাপ। সেই স্পষ্টতার এক নম্বর নিদর্শন যদি হয় ‘পারফরম্যান্স’-এর নিরিখে টিকিটপ্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি এবং বিভিন্ন বড়-মেজো-সেজো খাপ মারফত উমেদারি করে বাদ পড়া, তা হলে তার খুব কাছাকাছির দু’নম্বরে আছে টলিউডের গ্ল্যামারচিক্কণ চরিত্রদের সচেতন ভাবে বাইরে রাখা। অর্থাৎ, টালিগঞ্জপাড়ার কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রীকে নতুন করে টিকিট না-দেওয়া। যাঁরা গতবার টিকিট পেয়েছিলেন এবং জিতেছিলেন, তাঁরা প্রায় সকলেই আছেন। ‘প্রায়’, কারণ, উত্তরপাড়ার কাঞ্চন মল্লিক এবং বারাসতের চিরঞ্জিৎ বাদ পড়েছেন। প্রথমজনের গত পাঁচ বছরে যা ‘কো কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ়’ থেকেছে, তাতে তিনি বাদ না-পড়লেই আশ্চর্য হতে হত। দ্বিতীয়জন গত মেয়াদ থেকেই ‘অনিচ্ছুক’ ছিলেন বলে জনশ্রুতি। এ-ও বলা হচ্ছিল, সে বার মমতাই তাঁকে ছাড়তে চাননি। এ বার অবশ্য তিনি ‘ছাড়’ পেয়েছেন। রয়ে গিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী, লাভলি মৈত্র, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সোহম চক্রবর্তী। শেষোক্ত অভিনেতার কেন্দ্রটি অবশ্য বদলে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতির পঙ্কে নিমজ্জিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়, মানিক ভট্টাচার্য বা জীবনকৃষ্ণ সাহা যে টিকিট পাবেন না, তা দুগ্ধপোষ্য শিশুও জানত। সে শিশু অবশ্য এমনও ভেবেছিল যে, সেই যুক্তিতেই রেশন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এবং দীর্ঘ দিন জেল খেটে-আসা জ্যোতিপ্রিয় ‘বালু’ মল্লিকও টিকিট পাবেন না! কিন্তু শিশু তো, হাজার হোক, শিশুই। বিপুলা এ তৃণমূল পৃথিবীর কতটুকু সে জানে! সপ্তাহখানেক আগে মুকুল রায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গিয়ে কাঁচরাপাড়ায় বিশাল শামিয়ানার নীচে হট্টগোলের মধ্যে যাঁর সঙ্গে দেখা হল, তিনি তখন থেকেই ভোটের টিকিট পাওয়া নিয়ে নিশ্চিত। কেন্দ্র নিয়েও নিশ্চিন্তই ছিলেন। চারপাশের ভিড়ভাট্টা এবং কিচিরমিচিরের মধ্যে গলা খাদে নামিয়ে বালু বলেছিলেন, ‘‘বারাসত, বারাসত।’’

বিস্মিত হয়ে বললাম, হাবড়া নয়? এক টেনিয়ার এগিয়ে দেওয়া লস্যির ছোট গ্লাসটা আলগোছে প্রত্যাখ্যান করে দীর্ঘদিনের মধুমেহ রোগী বললেন, ‘‘না-না। হাবড়া নয়। বারাসত। কথা হয়ে গিয়েছে।’’

কিন্তু কে না জানে, কেউ কথা রাখে না! এখনও। ফলে তালিকায় বালুর নামের পাশে ‘হাবড়া’ই লেখা হয়েছে। বার্তা খুব স্পষ্ট। টিকিট দেওয়া হল বটে। কিন্তু নিজের মুরোদে জিতে আসতে হবে। যেমন নির্মল মাজিকে পাঠানো হয়েছে হুগলির গোঘাটে। টিকিট পেয়েছেন মদন মিত্রও। যিনি, যতদূর তাঁর ঘনিষ্ঠ বলয় থেকে জানতে পেরেছিলাম, কামারহাটিতে আবার প্রার্থী হওয়ার খুব একটা আশা করছিলেন না। এমন আরও কিছু কিছু উদাহরণ রয়েছে। যাঁরা দলের প্রার্থিতালিকায় নবীন-প্রবীণের ট্র্যাপিজ়ের খেলায় দোদুল্যমান ছিলেন। কিন্তু ভারসাম্যমূলক সমাসে তলায় জাল পেতে দিয়ে শেষমেশ তাঁদের মানরক্ষা করা হয়েছে।

সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দলের দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকেই অভিষেকের ‘দর্শন’ স্পষ্ট। যাঁরা নির্বাচনী রাজনীতিতে আসবেন এবং দলের হয়ে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের ২৪ ঘণ্টার রাজনীতিক হতে হবে। সেই দর্শন বলে, যাঁরা পেশাগত ভাবে এবং ‘প্যাশনেট’ রাজনীতিক নন, তাঁদের এই পথে পা না-বাড়ানোই উচিত।

দ্বিতীয়ত, জনপ্রতিনিধি হলে নিজের এলাকার জন্য কাজ করতে হবে। সেটাই প্রথম এবং শেষ কথা। অভিষেকের কাছে ভোটের টিকিট পাওয়ার ১ থেকে ১০ নম্বর যোগ্যতা হল ‘পারফরম্যান্স’।

তিন, ভাবমূর্তি স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল রাখতে হবে।

এ ছ়াড়াও ‘এক ব্যক্তি এক পদ’, রাজনীতিকদের অবসরের বয়ঃসীমার মতো আরও কিছু কিছু জোরালো অভিমত তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ রাখেন। যা নিয়ে দলের অন্দরে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। কারণ, এমত চিন্তভাবনা যে কোনও রাজনৈতিক দলের কাছে আদর্শ ঠিকই। কিন্তু একই সঙ্গে কল্পলোকও বটে। রাজনীতি উত্তরোত্তর যে জায়গায় গিয়ে পৌঁছোচ্ছে, তাতে দলের মেনুতে সাড়ে বত্রিশ ভাজা রাখা ছাড়া উপায় নেই। পশ্চিমবঙ্গের শাসকশিবিরের এক বর্ষীয়ান নেতা একদা বলেছিলেন, ‘‘দল করতে গেলে সকলকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়। অত বাছবিচার করলে চলে না।’’ অর্থাৎ, যাদবপুরে একজন হার্ভার্ডের অধ্যাপক সুগত বসুর সঙ্গে বীরভূমে একজন অনুব্রত ‘কেষ্ট’ মণ্ডলকেও লাগে।

সম্ভবত এই ফ্যাক্টরেই তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় এ বার ১০০ শতাংশ সংস্কার দেখা গেল না। কিন্তু তৎসত্ত্বেও যে তালিকা হয়েছে, তা এককথায় ‘সাহসী’। এবং ‘সংস্কারমুখী’। যে সংস্কারের কাজ প্রার্থিতালিকা ঘোষণা মারফত শুরু হল, তা তৃণমূলের মতো একটি অবামপন্থী দলে কার্যকর করা খুব সহজ নয়। খানিকটা ‘ধীরে চলো’ নীতি নিতে হয়েছে। কিন্তু তৃণমূলের শীর্ষনেতৃত্ব একই সঙ্গে এ-ও বিলক্ষণ জানতেন যে, ‘ঝাঁকুনি’ না-দিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসও বলে, যে কোনও সংস্কারসাধন করতে গেলেই একটু ধীরে এগোতে হয়। অনেকটা পৃথিবীর ঘূর্ণনের মতো। পৃথিবী দৈনিক নিজেই নিজের কক্ষপথে ঘোরে। কিন্তু সেই ঘূর্ণন এতটাই ধীরে ধীরে ঘটে যে, আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু বুঝতে পারি ঘূর্ণন জারি আছে। সেই কারণেই দিন গড়িয়ে রাত হয়, আবার রাত কেটে দিন। অর্থাৎ, পৃথিবী যে নিজ কক্ষপথে আবর্তিত হচ্ছে, সেটা যেমন সত্য, তেমনই অকাট্য যে, সেই ঘূর্ণন এমন দ্রুতগতিতেও হচ্ছে না, যাতে আমাদের মাথা-টাথা চোঁ করে ঘুরে যায়! আমরা টাল সামলাতে না-পারি।

তৃণমূলের মতো একটি দল, যারা ঐতিহ্যগত ভাবে ঠিক এর বিপরীত অবস্থানে থেকে এসেছে, সেখানে প্রায়োগিক অর্থে যে কোনও ধরনের পরিবর্তন, যে কোনও ধরনের সংস্কার করা আরও কঠিন। বনবন করে ঘোরাতে গেলে মাথা ঘুরে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সে কথা মনে রেখেও বলছি, তৃণমূল যে প্রার্থিতালিকা পেশ করেছে, তা দলের ইতিহাসে একটা ‘কোয়ান্টাম জাম্প’! এই ধরনের উল্লম্ফন তৃণমূল আগে দেয়নি। অবশ্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না। ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা (মতান্তরে, স্থিতাবস্থা বিরোধিতা) যে জায়গায় তৃণমূলকে নিয়ে ফেলেছে এবং তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতি ও জনপ্রতিনিধিদের একাংশের কালিমালিপ্ত ভাবমূর্তি, তাতে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে গাড্ডা গভীরতর হত।

প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ওজন এমনিতেই সাংঘাতিক। কাঁধে সেই সাংঘাতিক বোঝা নিয়ে তৃণমূলকে ভোটে যেতে হচ্ছে, সেটাই তাদের কাছে যথেষ্ট উদ্বেগের। সেই বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো রয়েছে পার্থের বান্ধবীর বাড়িতে টাকার পাহাড়, আরজি কর হাসপাতালের নারকীয় ঘটনা এবং তৎপরবর্তী নাগরিক আন্দোলনের মতো ‘শাসকের পক্ষে বিপজ্জনক’ সঙ্কেত। সেই ‘বিপদঘন্টি’ শুনে সংস্কারের পদক্ষেপ না করে গয়ংগচ্ছ ভাবে চললে সমস্যা আরও গূঢ় হতে পারত। সংস্কার অতএব, অনিবার্যই ছিল। সেইজন্যই প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করার আগে দলের সর্বময় নেত্রীকে বলতে হল, ‘‘যাঁদের টিকিট দিতে পারিনি, তাঁরা দুঃখ পাবেন না। নতুনদের আসতে দিতেই হয়।’’

এই ‘সংস্কারমুখী’ প্রার্থিতালিকায় কি বিপদের আশঙ্কা পুরোপুরি এড়িয়ে ফেলা গেল? এখনই বলা যাবে না। তা বোঝা যাবে ভোটের ফলপ্রকাশের পরে। ১০৩ জন নতুন প্রার্থী যাঁরা তরুণ এবং নবীন মুখ, যাঁদের মাথায় কোনও ব্যক্তিগত কৃতকর্মের বোঝা নেই, যাঁরা লেখা শুরু করছেন সাফসুতরো স্লেট নিয়ে, গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন মুখ এবং মুখোশ ভুলে গিয়ে তাঁদেরই শাসকদলের প্রতিভূ হিসাবে বেছে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভোট দিলেন, না কি ব্যক্তি-পরিচয় স্বচ্ছ হলেও দলীয় পরিচয়ের ‘গাদ’ তাঁদের ডুবিয়ে দিল , ৪ মে দুপুরের মধ্যে তা স্পষ্ট হবে।

একই সঙ্গে এ-ও স্পষ্ট হবে যে, আগামিদিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কোন পথে এবং কাদের দ্বারা চালিত হতে চলেছে। আমরা যারা সাধারণ নাগরিক, তাদের শাসনভার কাদের হাতে থাকবে। রাজ্যশাসনের সঙ্গে কি তাঁরাই জড়িত থাকবেন, যাঁদের ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন, যাঁরা শিক্ষিত, যাঁরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সামাজিক পরিচয় থেকে রাজনীতিতে এসেছেন? আমরা কি তাঁদেরই দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হব? না কি আমাদের আবার পুরনো ঐতিহ্যেই ফিরে যেতে হবে?

সেই নিরিখে দিয়ে তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা পশ্চিমবঙ্গীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণও বটে। যা সমান্তরাল ভাবে রাজ্যের ভোটারদেরও পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছে।

একইসঙ্গে এই প্রার্থিতালিকা অভিষেকেরও অগ্নিপরীক্ষা। সীতাকে যেমন তাঁর সতীত্বের প্রমাণ দেওয়ার জন্য অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়েছিল, তেমনই তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষায় উপনীত হচ্ছেন বিধানসভা ভোটে।

২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তাঁর এই নিরীক্ষার ছোট নমুনা দেখা গিয়েছিল। কঠিন ভোটে তৃণমূল ২৯টি আসন পেয়েছিল। বিজেপির আসন কমেছিল। সেই সাফল্যের স্প্রিংবোর্ডের উপর ভিত্তি করে অভিষেক বিধানসভা ভোটের সাঁতারপুলে ঝাঁপ দিয়েছেন। যে লড়াই আরও কঠিন। কারণ, এই যুদ্ধ সরকার রাখার। এই যুদ্ধ চতুর্থ বারের জন্য রাজ্যের দখল নেওয়ার। এই লড়াইয়ে আসনের সংখ্যা অনেক বেশি, স্থানীয় ‘ফ্যাক্টর’ অনেক বেশি, প্রতিষ্ঠান বা স্থিতাবস্থা বিরোধিতাও অনেক বেশি। দু’বছর আগের লোকসভা ভোটে বেশি আসন জিতলেও শহর এবং মফস্‌সল বা আধা শহর এলাকায় তৃণমূলের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। যে শহুরে ভোটারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ঝোঁক বেশি, সেই শহুরে ভোট তৃণমূলের পাশ থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে দেখা গিয়েছিল।

সেখানেই সংস্কারধর্ম পালন করতে নেমেছেন অভিষেক। এবং সেই কঠিন কাজে সঙ্গে পেয়েছেন দলের সর্বময় নেত্রীকে। যে জনাকীর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূলের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হল, সেখানে দু’টি মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল, যা সবচেয়ে গভীর এবং ইঙ্গিতবাহী।

সাংবাদিক বৈঠকে প্রারম্ভিক বক্তব্য জানিয়ে ১৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের মাথায় মমতা তাঁর বাঁ পাশে বসা অভিষেককে প্রার্থিতালিকা পড়তে বললেন। জবাবে অভিষেক বললেন, ‘‘তুমি শুরু করো।’’ দ্বিতীয়, সাড়ে ২৩ মিনিটের মাথায় চাঁচলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে তালিকার পাতা উল্টোলেন মমতা। কয়েক সেকেন্ড পরে হাতের মাইক্রোফোন মুখ থেকে একটু দূরে সরিয়ে কাগজের তাড়া অভিষেকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘তুই একটু পড় না!’’ অভিষেক প্রার্থিতালিকা হাতে নেওয়ার পরে বললেন, ‘‘বাদবাকিটা অভিষেককে বলছি পড়ে দিতে।’’ তার পর থেকে পুরো তালিকা অভিষেকই পড়লেন।

বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থিতালিকা মারফত যে সংস্কারের পথে তৃণমূল চলতে শুরু করেছে, তা সফল হলে দ্বিতীয় মুহূর্তটি সম্ভবত ‘সন্ধিক্ষণ’ হিসাবে থেকে যাবে। সেই মুহূর্তেই ‘স্টার্টিং ব্লক’ থেকে ছিটকে বেরোল ‘নতুন তৃণমূল’।

সেই তৃণমূল সকলের আগে ‘ফিনিশিং পয়েন্টে’ পৌঁছবে কিনা, তার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা শাসকশিবির। জাতি হিসাবে সাধারণ ভাবে বাঙালি খুব সহজে পরিবর্তন চায় না। সিপিএমকে এই বাঙালিই সাড়ে তিন দশক সময় দিয়েছিল। ইতিহাস বলে, যখনই কোথাও কোনও স্থিতাবস্থার বদল ঘটে, যখনই আমরা একটি ঘরের দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে অন্য ঘরে প্রবেশ করি, তখনই কিছু ‘হোঁচট’ আসে। যা অবশ্যম্ভাবী এবং স্বাভাবিক। রাজনৈতিক সংস্কারই হোক বা অর্থনৈতিক, তাতে প্রাথমিক ভাবে বাধা পড়ে। কারণ, আমাদের মানসিকতা সংস্কারধর্ম মানতে চায় না, শৃঙ্খলা মানতে চায় না। তবু কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও সময়ে সংস্কার শুরু করতে হয়। নইলে ইতিহাসের গতি রুদ্ধ হয়।

অভিষেক এবং মমতা সেই বহতা স্রোতে তরী বাইতে শুরু করেছেন।

পুনশ্চ: অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতরের সমস্ত ঘড়ি সময়ের চেয়ে ১০ মিনিট ‘ফাস্ট’। যাতে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা যায়। দলের অন্দরে সংস্কারধর্ম প্রয়োগ করতে গিয়ে তৃণমূলের সেনাপতি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারলেন কি? না কি একটু দেরি হয়ে গেল?

এই প্রয়াসের পাদটীকা হিসাবে ৪ মে পর্যন্ত সেই সংশয়টা সম্ভবত থেকে যাবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement