ভূতে মারে ঢিল, ১০০ কমে ৮৯

মানুষের ভুল নাকি ভূতের কারসাজি! বিনপুর বিধানসভার যে বুথে ১০০% ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনে রিপোর্ট গিয়েছিল, ভোটের তিন দিন পরে সেই হিসেব বদলে যাওয়ায় এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ভোটের রাজ্যে।

Advertisement

কিংশুক গুপ্ত

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০১৬ ০৪:৫৬
Share:

মানুষের ভুল নাকি ভূতের কারসাজি!

Advertisement

বিনপুর বিধানসভার যে বুথে ১০০% ভোট পড়েছে বলে নির্বাচন কমিশনে রিপোর্ট গিয়েছিল, ভোটের তিন দিন পরে সেই হিসেব বদলে যাওয়ায় এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে ভোটের রাজ্যে।

গত ৪ এপ্রিল জঙ্গলমহলে ভোটের পরে বেলপাহাড়ির ১৮ নম্বর লালজল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে ১০০% ভোটের রিপোর্ট জমা পড়েছিল। বলা হয়েছিল, ওই বুথের ৩৩১ জন ভোটারের সকলেই ভোট দিয়েছেন। এর পর ৭ এপ্রিল কমিশনে ফের সংশোধিত তালিকা যায়। এবং তাতে দেখা যাচ্ছে, ভোট দিয়েছেন ২৯৬ জন। অর্থাৎ ভোটের হার ৮৯.৪৩%।

Advertisement

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের দাবি, এর জন্য দায়ী ‘হিউম্যান এরর’ অর্থাৎ মানুষের ভুল। কিন্তু বিরোধীরা এতে ভূতের গন্ধ পাচ্ছেন! আজ, সোমবার দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে তাঁদের আশঙ্কা, কমিশন মুখে যতই আশ্বাস দিক, এ বারও সেই ভূতের নেত্য হবে না তো!

ষোলো আনা ভোট হওয়ায় লালজল নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রচুর কাটাছেঁড়া হয়েছিল। কারণ, যে কোনও বুথে ১০০% ভোট পড়াটা এক অর্থে অবাস্তব। তখন বিরোধীরাও বলেছিল, কমিশন যেখানে এত কড়াকড়ির কথা বলছে, সেখানে এই কাণ্ড হয় কী করে! ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ওই বুথের হিসেব এর পরই প্রায় ১১% কমে যায়! সংশোধনের পরে জেলা থেকে দ্বিতীয় তালিকা পৌঁছয় কমিশনে। যা কোনও মতেই হওয়ার কথা নয়।

তা হলে এ ক্ষেত্রে হল কী করে?

রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী অফিসার দিব্যেন্দু সরকারের দাবি, এ নিয়ে কোনও খবর তাঁর কাছে নেই। আর ঝাড়গ্রামের মহকুমাশাসক নকুলচন্দ্র মাহাতো বলেন, “তথ্য সংকলনের সময় ভুল হয়েছিল। সেটা সংশোধন করা হয়েছে।”

কমিশন সূত্রে খবর, সংবাদমাধ্যমে লালজল নিয়ে তোলপাড়ের পরেই কমিশন খোঁজ নেওয়া শুরু করে। তার পরই এই হিসেব বদল। বিরোধীদের মতে, ১০০% ভোট হওয়ায় লালজল নিয়ে নাড়াচাড়া হয়েছে। হিসেবে মিশে থাকা জল হয়তো কিছুটা ছাঁকাও হয়েছে। কিন্তু জঙ্গলমহলের বেশিরভাগ বুথেই এ বার ভোটের হার চড়া। অন্যত্রও যে জল মিশে নেই তার কি নিশ্চয়তা! সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের কথায়, ‘‘কোনও একটা বুথের হিসেবে যদি এত গরমিল হয়, তবে তা চিন্তার। এমন চললে অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়।’’ তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বলেন, ‘‘বিনপুরে ঠিক কী হয়েছে না জেনে বলতে পারব না। তবে কোনও বুথে ১০০% ভোট পড়া অবাস্তব নয়।’’

প্রশাসন ভুলের দাবি করলেও তা কোন স্তরে হয়েছিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা। ভোট শেষে বিনপুরের সব ইভিএম এবং ভোটদানের তথ্য ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজের রিসিভিং কাউন্টারে জমা দেন ভোটকর্মীরা। প্রিসাইডিং অফিসারের ডায়েরি ও পোলিং এজেন্টদের সই করা ১৭সি ফর্ম মিলিয়ে দেখা হয়। এর পর ‘কমপাইলেশন’ বিভাগের কর্মীরা বুথভিত্তিক তালিকা তৈরি করেন এবং তা ই-মেলে কমিশনে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিকের মতে, ‘‘এই সময় যিনি ডেটা এন্ট্রি করছিলেন, তিনিই ভুল করে মোট ভোটার সংখ্যাটা ‘কপি’ করে প্রদত্ত ভোটের ঘরে ‘পেস্ট’ করে দেন।

তাতেই বিপত্তি।’’

প্রশাসনের আর একটি সূত্র আবার জানাচ্ছে, ভোটের দিন চাকাডোবার সেক্টর অফিসারের কাছে সর্বশেষ যে তথ্য এসেছিল, তাতে ২৯৬টি ভোটের কথাই বলা হয়েছিল। লালজলের বুথটিতে যিনি তৃণমূলের এজেন্ট ছিলেন, সেই বংশী মাহাতোরও দাবি, ‘‘২৯৬ জন ভোট দিয়েছেন, এই তথ্য সমেতই ফর্মে সই করেছিলাম।’’

বিরোধী এজেন্ট ছিলেন না? সিপিএমের বেলপাহাড়ি জোনাল সম্পাদক উদ্ধব মাহাতো বলেন, “আমাদের প্রার্থী দিবাকর হাঁসদার এজেন্ট বাদল মাহাতো ছিলেন। তবে দুপুরে খেতে বেরনোর পরে তিনি আর বুথে যাননি।”

অর্থাৎ বিরোধী এজেন্টের অনুপস্থিতিতে ঠিক কী ঘটেছে, হিসেবের গোলমাল ‘ডাটা এন্ট্রি’র সময় হয়েছে না অন্য কোনও সময়, স্পষ্ট নয়। এতেই কারচুপির আঁচ পাচ্ছেন বিরোধীরা। সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের অভিযোগ, ‘‘প্রশাসনের নিচুতলার কর্মীদের একাংশকে কাজে
লাগিয়ে এই সব কারচুপি করা হচ্ছে।’’ কংগ্রেস প্রদীপ ভট্টাচার্যেরও মত, ‘‘ভুল নয়, কারচুপি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কমিশনের উচিত, ওই বুথের গণনা স্থগিত রাখা।’’ ওই বুথে পুনর্নির্বাচনের জন্য অবশ্য সরকারি ভাবে কমিশনে দাবি জানায়নি বিরোধীরা। সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ডহরেশ্বর সেন বলেন, “কমিশন যেটা ভাল বুঝবে, সেটা করবে।”

ধন্দ কাটছে না কমিশন কর্তাদেরও। এক কর্তার কথায়, ‘‘ওই বুথে ঠিক কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তা জানতে গণনা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কারণ, ইভিএম ও প্রিসাইডিং অফিসারের ডায়েরি স্ট্রং-রুমে বন্দি। নির্বাচন চলাকালীন সে
সব খতিয়ে দেখার এক্তিয়ার কমিশনের নেই।’’

অর্থাৎ লালজলে কতটা জল, তা জানতে আপাতত ১৯-মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement