—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
একই দিনে রাজ্যের দুই জেলায় দুই মৃত্যু। নেপথ্যে ‘এসআইআর আতঙ্ক’। শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন তাঁরা। পরিবারের দাবি, বুথ স্তরের আধিকারিকদের (বিএলও) কাছ থেকে শুনানির নোটিস পাওয়ার পর থেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন হুগলির রিষড়া এবং পূর্ব বর্ধমানের বৈকুন্ঠপুরের দুই বাসিন্দা। ভয়ে এবং আতঙ্কে রিষড়ার ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ধনঞ্জয় চতুর্বেদীর মৃত্যু হয়। অন্য দিকে, বৈকুন্ঠপুরের বাসিন্দা ফুলমালা পাল (৫৭) আত্মহত্যা করেন। দু’টি ঘটনার সঠিক তদন্ত দাবি করেছে তাঁদের পরিবার। এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতরও।
এসআইআর শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন রিষড়ার বাসিন্দা ধনঞ্জয়। আগামী ৪ জানুয়ারি ছিল শুনানির দিন। পরিবারের অভিযোগ, এ নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন। শুক্রবার সকালে রিষড়া মাতৃসদনে ভর্তি করা হয় তাঁকে। সেখানেই মৃত্যু হয় ওই বৃদ্ধের। পরিবার সূত্রে খবর, বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন ধনঞ্জয়। বাড়িতে শয্যাশায়ী হয়ে ছিলেন। তবে শারীরিক অসুস্থার মধ্যেই এসআইআর সংক্রান্ত সব বিষয়ে খবর রাখতেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে ধনঞ্জয়ের। বৃদ্ধের ছেলে রাজেন্দ্র চতুর্বেদী জানান, তাঁর বাবা বড়বাজারের একটি স্কুলে চাকরি করতেন। তাঁরা রিষড়ার প্রায় ৮০ বছরের বাসিন্দা। তাঁরা আগে রবীন্দ্রসরণিতে থাকতেন। এখন এনএস রোডের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। গত ২৯ ডিসেম্বর বিএলও শুনানির নোটিস দিয়ে যান। তার পর থেকেই তাঁর বাবা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তিনি বলেন, “বাবা চিন্তিত ছিলেন এটা ভেবে— শুনানিতে কোথায় যেতে হবে, কী করে যাবেন, নাম বাদ গেলে কী হবে, এসব নিয়ে। আমাকেও ৫ জানুয়ারি শুনানিকেন্দ্রে ডাকা হয়েছে।” বৃদ্ধের ছেলের প্রশ্ন, “নির্বাচন কমিশন বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের হয়রান করছে কেন বুঝতে পারছি না। আমাদের সব নথি থাকা সত্ত্বেও কেন শুনানিতে ডাকা হবে?”
অন্য দিকে, এসআইআরের আতঙ্কে পূর্ব বর্ধমানের বৈকুন্ঠপুর-২ পঞ্চায়েতের রায়নগর এলাকার বাসিন্দা ফুলমালা পাল (৫৭) আত্মঘাতী হন। শুক্রবার সকালে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেই রেললাইনে গিয়ে ট্রেনের নীচে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। বর্ধমান স্টেশনের জিআরপি মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
পরিবারের অভিযোগ, এসআইআরের খসড়া তালিকায় স্বামী এবং পুত্রের নাম থাকলেও ফুলমালার নাম আসেনি। ২০০২ সালের এসআইআরের তালিকাতেও নাম ছিল না তাঁর। তাই শুনানির জন্য তাঁর কাছে নোটিস এসেছিল নির্বাচন কমিশনের। পরিবারের অভিযোগ, নোটিস পাওয়ার পর থেকেই আতঙ্কে ছিলেন ফুলমালা। পরিবারকে আতঙ্কের কথা জানিয়েছিলেন তিনি। স্বামী সুনীল পাল বলেন, “আমরা আস্বস্ত করেছিলাম আমাদের তো নাম আছে তোমার চিন্তা করার কিছু নেই। কিন্তু তার পরেও বিষয়টা নিয়ে চিন্তার মধ্যেই ছিল।”
মৃত্যুর খবর চাউর হতেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। তৃণমূলের দাবি, এসআইআরের শুরু থেকেই এই ধরনের ঘটনা রাজ্যে ঘটছে। নাম না-আসার জন্যই ভয়ে ও আতঙ্কেই ফুলমালার মৃত্যু হয়েছে। আবার বিজেপির পাল্টা দাবি, এসআইআর আতঙ্কে নয় বরং ফুলমালা আত্মহত্যা করেছেন পারিবারিক কারণে। বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন, “ওঁর জামাই ওই এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য। তাই এই ঘটনাকে এসআইআরের আতঙ্ক বলে চালাতে চাইছে।”
শুক্রবার সন্ধ্যায় মৃতা ফুলমালার দেহ রাস্তায় রেখে বিক্ষোভ দেখান তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। ফুলমালার মৃতদেহ রায়নগরে পৌঁছোনোর আগেই এসে যান বিধায়ক নিশীথ মালিক, জেলা যুব সভাপতি রাসবিহারী হালদার, তৃণমূল ২ নম্বর ব্লকের সভাপতি পরমেশ্বর কোনার এবং ১ নম্বর ব্লকের সভাপতি মানস ভট্টাচার্য। দেহ আসা মাত্রই স্লোগান দিতে থাকেন নেতা-কর্মীরা। এর পর তাঁরা রাস্তা অবরোধ করেন। তাঁরা জানান, একের পর এক মৃত্যু ঘটছে ‘এসআইআর আতঙ্কে’। এর বিহিত না হওয়া অবধি ছাড়বেন না তাঁরা। রাতে আত্মঘাতী পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। তিনি বলেন, “নোটিস পেয়ে কয়েক দিন না খেয়েছিলেন ফুলমালা। তার পর আত্মঘাতী হন। এর জন্য দায়ী কেন্দ্রীয় সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকেরা।”