গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আই-প্যাক ছুটির ঘণ্টা বাজালেও ভোটের ছোটাছুটিতে দমতে চাইছে না তৃণমূল! শনিবার গভীর রাতে ইমেল করে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারের কাজে কর্মরত কর্মীদের ২০ দিনের ছুটিতে যাওয়ার কথা জানায় আই-প্যাক (সেই ইমেলের প্রতিলিপি আনন্দবাজার ডট কম-এর হেফাজতে রয়েছে)। রবিবার সকালে ওই খবর প্রকাশের পর দিনভর ঘটনার ঘনঘটা চলেছে। আই-প্যাকের এ হেন ‘ছুটি’ দেওয়ার খবরে সাময়িক ভাবে হতোদ্যম হয়েছিলেন তৃণমূলের অনেক নেতা। কারণ, প্রথম দফা ভোটের আর বেশিদিন দেরি নেই।
আগামী বৃহস্পতিবার রাজ্যের ১৫২টি আসনে ভোট। সেখানে আই-প্যাক না-থাকলে সমস্যা তৈরি হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। কিন্তু শাসকদল সূত্রের দাবি, আই-প্যাক আনুষ্ঠানিক ভাবে ছ়ুটিতে থাকলেও তৃণমূল ‘বিকল্প বাহিনী’ নামাচ্ছে। কোথাও কোথাও সেই বাহিনী কাজও শুরু করে দিয়েছে। তৃণমূল চাইছে, আই-প্যাকের ছুটির ধাক্কা যাতে প্রাথমিক ভাবে প্রথম দফার ভোটে সামলে নেওয়া যায়। দ্বিতীয় দফার ভোটের জন্য হাতে কিছুটা সময় রয়েছে। সেই মতো পরিকল্পনা করার অবকাশও রয়েছে।
আই-প্যাকে যেমন প্রশিক্ষিতেরা কাজ করেন, তেমনই তৃণমূলেরও একটি পেশাদার টিম রয়েছে। যাদের কাঠামো দলের সঙ্গে যুক্ত। ক্যামাক স্ট্রিটের যে বহুতলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতর, তারই সাত তলায় তৃণমূলের পেশাদার টিমের দফতর। একটি কর্পোরেট কাঠামোয় যা যা থাকা উচিত, সেখানে তা-ই রয়েছে। প্রথম দফায় যে সব জেলায় ভোট হতে চলেছে, সেই সব জেলায় অভিষেকের দফতর থেকে নিয়ন্ত্রিত টিমের প্রশিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা ইতিমধ্যেই ময়দানে রয়েছেন। তাঁরা কাজ করছিলেনই। আই-প্যাকে ছুটির ঘণ্টা বাজার পরে সেই টিমকেই আরও নিবিড় ভাবে আগামী কয়েক দিন ব্যবহার করা হবে বলে সূত্রের খবর।
স্থানীয় স্তরে ভোটের প্রচার কোথায় কী ভাবে হবে, তার রূপরেখা আগেই ঠিক করেছিল আই-প্যাক। বিকল্প বাহিনী সেই কাজই তদারক করবে। জঙ্গলমহলে অভিষেকের দফতরের টিম মাটি কামড়ে কাজ করছে। জঙ্গলমহলের একটি জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মীর কথায়, ‘‘আমরা দলের পদাধিকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করছি। বুথ স্তর এবং অঞ্চল ধরে হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপ তৈরি হচ্ছে। ভোটের দিনের ‘আপডেট’ স্থানীয় স্তর থেকে সেখানেই জানাতে হবে। যার উপর নজরদারি করবেন উচ্চপদস্থেরা।’’ শুধু ভোটের দিনের ঘটনা নয়। বুথ ধরে কোথায় কত ভোট পড়ল, কখন ইভিএম সিল হল, সেই তথ্যও রাখতে হবে। যা গণনার দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। তৃণমূলের অনেকের মতে, আই-প্যাকের মতো এই বাহিনী বহরে বড় না-হলেও কাজ চালিয়ে দিতে অসুবিধা হবে না।
আই-প্যাক তাদের কর্মীদের পাঠানো ইমেল বার্তায় লিখিত ভাবে ২০ দিনের ছুটির কথা বললেও মৌখিক ভাবে ভিন্ন বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে খবর। সূত্রের খবর, সেই বার্তায় বলা হয়েছে, কেউ চাইলে ভোট পর্যন্ত নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আবার কেউ চাইলে ২০ দিনের ছুটি ‘উপভোগ’ করতে পারেন। তবে মৌখিক ভাবে যা-ই বলা হোক না কেন, ইমেলের মধ্যে যে ‘আনুষ্ঠানিকতা’ রয়েছে, তা আই-প্যাক কর্মীদের অনেকের মধ্যে একটি অনিশ্চয়তার বাতাবরণ তৈরি করেছে। বেশ কিছু জেলায় আই-প্যাক কর্মীদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অনেকে বলছেন, সম্ভবত সেই কারণেই তাঁদের অভয় দিতে রবিবার দুপুরে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্য জনসভায় বলেছেন, ‘‘আমি কাউকে চাকরিহারা হতে দেব না।’’ যদিও অভিষেক আই-প্যাক নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু জায়গায় আই-প্যাকের লোকজন রবিবার রাত পর্যন্ত সক্রিয় ভাবে কাজ করছেন, এমনও খবর রয়েছে তৃণমূল সূত্রে। ফলে সর্বত্র ছবি এবং পরিস্থিতি এক নয়।
গত জানুয়ারি মাসের গোড়ায় কয়লা পাচার মামলার সূত্রে আই-প্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে হানা দিয়েছিল ইডি। হানা দিয়েছিল আই-প্যাকের সল্টলেকের দফতরেও। তল্লাশি চলাকালীন দু’জায়গাতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা পৌঁছে গিয়েছিলেন। প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরনোর সময়ে কিছু নথি তিনি তুলে নিয়ে এসেছিলেন। পাশাপাশিই আই-প্যাকের দফতর থেকে দিস্তা দিস্তা কাগজপত্র নিজের গাড়িতে তুলে নিয়েছিলেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি। প্রতীকের বাড়ি এবং আই-প্যাকের দফতর থেকে তাঁর দলের নির্বাচন সংক্রান্ত পরিকল্পনা, গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপন নথি ‘চুরি’ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। সেই মামলার জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। আপাতত মামলাটি শীর্ষ আদালতে বিচারাধীন। সেই ঘটনা থিতু হতে না হতেই গত সোমবার নয়াদিল্লিতে আই-প্যাকের অন্যতম পরিচালক ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিনেশ চান্দেলকে গ্রেফতার করে ইডি। তিনি এখন কেন্দ্রীয় সংস্থার হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর গ্রেফতারির নিন্দায় সরব হয়েছিলেন অভিষেক। সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘‘এটা গণতন্ত্র নয়, ভীতিপ্রদর্শন।’’ তার পরে প্রতীকের স্ত্রী বার্বি জৈন অবং ভাই পুলকিত জৈনকেও তলব করে ইডি। এর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ২০ দিন কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভোটকূশলী সংস্থাটি। সেই মেয়াদ শেষ হতে হতে দু’দফার ভোট, গণনা, এমনকি নতুন সরকার গঠনও হয়ে যাওয়ার কথা। রবিবার রাতেও আই-প্যাকের আর এক কর্তা ঋষি রাজকে নোটিস পাঠিয়েছে ইডি। সোমবার তাঁকে দিল্লির দফতরে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার গভীর রাতে মেল করে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারের কাজে কর্মরত কর্মীদের ২০ দিনের ছুটিতে যাওয়ার কথা জানায় আই-প্যাক। সেই ইমেলের প্রতিলিপি আনন্দবাজার ডট কম-এর হেফাজতে রয়েছে। সেই ইমেলটি ‘সিসি’ করা হয়েছে দু’জনকে। এক জন প্রতীক জৈন, অন্য জন অর্জুন দত্ত। ইমেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই ‘অপারেশন’ বন্ধ রাখা হচ্ছে। লেখা হয়েছে, ‘আইনকে আমরা শ্রদ্ধা করি এবং গোটা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছি। নির্দিষ্ট সময়ে বিচার মিলবে, আমরা নিশ্চিত।’
রবিবার সকাল ১০টা ১৪ মিনিটে আই-প্যাকের ২০ দিনের ছুটির খবর প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার ডট কম-এ। আই-প্যাকের মানবসম্পদ বিভাগের তরফে করা ইমেলের প্রতিলিপিও ব্যবহার করা হয়েছিল প্রতিবেদনের সঙ্গে। খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সারা রাজ্যে শোরগোল পড়ে যায়। বেলা ১২টা নাগাদ তৃণমূলের তরফে একটি বিবৃতি দিয়ে দাবি করা হয়, আই-প্যাকের কাজ বন্ধের খবর ‘ভিত্তিহীন’। তৃণমূল তাদের ওই বিবৃতিতে লেখে, ‘বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে’ এই ধরনের খবর ছড়ানো হচ্ছে। এ-ও লেখে যে, ‘আমরা সংবাদমাধ্যমের একটি রিপোর্ট দেখেছি, যেখানে বলা হচ্ছে, আই-প্যাক পশ্চিমবঙ্গে ২০ দিনের জন্য তাদের কাজ স্থগিত রেখেছে। এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। আই-প্যাকের পশ্চিমবঙ্গের দল তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত। রাজ্য জুড়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রচারের কাজ চলছে। ময়দান থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য ইচ্ছা করা এই বয়ান ছড়ানো হচ্ছে।’ প্রসঙ্গত, আই-প্যাক সংক্রান্ত এই বিবৃতি দলের ‘এক্স’ হ্যান্ডল বা ফেসবুক পেজে পোস্ট করেনি তৃণমূল। সেটি পাঠানো হয়েছিল সংবাদমাধ্যম সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপে এবং সঙ্গে কিছু সাংবাদিককে।
আনন্দবাজার ডট কম-এর ওই খবর ‘ভিত্তিহীন’ বলে তৃণমূল দাবি করলেও আই-প্যাকের তরফে সেই মর্মে কিন্তু কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি বা খবরটিকে কোনও ভাবে, কোনও স্তর থেকেই অস্বীকার করা হয়নি। অনেকের বক্তব্য, আনন্দবাজার ডট কম-এর হেফাজতে-থাকা আই-প্যাকের ওই ইমেলটি যদি ‘ভুয়ো’ হত, তা হলে তো আই-প্যাকের তরফেই সেটি আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হত। কিন্তু সংস্থার তরফে তেমন কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। যা থেকে স্পষ্ট যে, ইমেলটি আসল। তার মধ্যে কোনও ‘অসত্য’ বা ‘ভিত্তিহীনতা’ নেই।
তৃণমূলের ওই বিবৃতির দু’ঘণ্টার মধ্যেই তারকেশ্বরের জনসভায় স্বয়ং মমতা যা বলেছেন, তাতে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, আই-প্যাক আপাতত পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে। কারণ, তার ফলে সংস্থার যে কর্মীদের চাকরি হারাতে হচ্ছে, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কথাই ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। যা প্রকারান্তরে খবরটিকে ‘বৈধতা’ দিয়েছে। মমতা বলেছেন, ‘‘আমাদের তো রোজই ইডি রেড করছে। ইলেকশনের সময় মনে পড়ল? যারা আমাদের পার্টির কাজ করে, তাদের বলছে বাংলা ছেড়ে চলে যাও। তোমাদের তো ৫০টা এজেন্সি আছে। আমাদের একটা আছে। শুনুন, ওদের ভয় দেখালে ওরা আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হবে। আমরা ওদের চাকরি দেব। আমি একটি ছেলেকেও চাকরিছাড়া করব না। সকালে আমি অভিষেকের সঙ্গে কথা বলেই