দুবরাজপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
মমতা বলেন, ‘‘কারও মিথ্যায় ভুলবেন না, আমরা লড়াই করেছি। লক্ষ্মীর ভান্ডার চান! মনে রাখুন সারাজীবন চলবে। বিজেপি বিহারে ভোটের আগে ৮ হাজার দিল। পরে বুলডোজ়ার চলল। আমরা আগে দিয়েছি, তার পরে কথা বলব। যারা বলে করব, করে না। এপ্রিল থেকে পাওয়ার কথা ছিল বাড়তি টাকা। মার্চ থেকে পেয়েছেন তো মা-বোনেরা! বিজেপির কয়েকটি রাজ্যে নিয়ম, ফোন থাকলে, স্কুটি থাকলে (ভাতা) পাবেন না। আমাকে বলে আয়ুষ্মান ভারত করতে দিই না। বেশ করেছি। আয়ুষ্মান করলে কটা লোক পেত? যার স্কুটি, টিভি আছে পাবে না। কটা লোক পাবে? সকলে বঞ্চিত হবে। আমরা স্বাস্থ্যসাথী করেছি। ৯ কোটি মানুষ পায়। মহিলাদের ক্ষমতায়ন হয়েছে। সবাইকে বিনা পয়সায় সাইকেল দিই। গরিব বাচ্চাদের স্কুলের ড্রেস দিই। বই কিনে দিই। মিড-ডে মিল দিই। তফসিলি ছেলেমেয়ে, যারা হোস্টেলে থাকে, তাদের দিই। পুরোহিত, ইমামদের মাসিক ভাতা দিই। আগামী দিনে সব কাঁচা বাড়ি পাকা করে দেব। সব বাড়িতে জল পৌঁছে যাবে। রাস্তার টাকা বন্ধ করেছে, নিজের টাকা থেকে পথশ্রী করছি। রোজ বাবুর বড় বড় ছবি। ছবিতে খরচ না করে গ্যাসে ভর্তুকি দিলে এত টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হত না।’’
মমতার আরও সংযোজন, ‘‘বাইরে থেকে বিজেপি নেতা-নেত্রীরা আসেন। সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আরও লোক এলে আপনার গ্যাসের থেকে ভাগ দিতে হবে। ডাক্তারদেরও বলছে নেবে। দেখছে কে কে আরএসএসের সদস্য। বিজেপি উকুন বাছাই করছে। দেখছে কে প্রিয়পাত্র। কেউ নয়, সকলে আমার লোক। তৃণমূল ছাড়া কোনও দল নেই, যারা বাংলায় ক্ষমতায় আসতে পারে। যতই চক্রান্ত করো, সব ব্যর্থ হবে।’’
সভা শেষে তৃণমূল প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আবেদন জানান মমতা।
মমতার বক্তব্য, ‘‘আজও জানতে পারিনি কার কার নাম বাদ গেছে। সৎসাহস যদি থাকে বিজেপি পার্টির, লিস্ট ঝোলাও। আমাদের না দাও, সাংবাদিকদের দাও। কোনও সাংবাদিককে ঢুকতে দিচ্ছে না শুনেছি। আমাদের তো অ্যাপিল করতে হবে। ২৯-৩০ লাখও যদি হয়, যাদের নাম উঠেছে, তার কৃতিত্ব আমাদের। আমি চাই ১০০ শতাংশ নাম উঠুক। এরা প্রকৃত ভোটার। আমাদের শিবির থাকবে বুথে বুথে। কী ভাবে দরখাস্ত করতে হয় জানবেন। আপনাকে আইনজীবী নিয়োগ করতে হবে না। বিএলএ-রা যেমন কাজ করেছেন, এরা (আইনজীবীরা) কাজ করবে বিএলএ-২ হিসাবে। চালন সুচের দোষ ধরে।’’
মমতার তোপ, ‘‘গ্যাস বেলুন এখন গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। দু’দিন পরে গ্যাস পাবেন কি না জানি না! আবার গরুর গাড়ি। আবার উনুন! কাল বলেছিল ৩৫ দিন লাগবে। চিৎকার করেছিলাম। আজ বলে ২৫ দিন। সব ঝুট। গ্যাসের দাম বেড়েছে। গ্যাস বেলুনের দয়ায় আজ গ্যাসের দাম ১১০০ টাকা। ৭০০ টাকা বাড়িয়েছে। রেলের টিকিট যেমন রোজ বাড়ায়। বড় গ্যাস ২,১০০। আজ বলছে ২৫ দিন (সিলিন্ডার বুকিংয়ের সময়সীমা)। কী দিয়ে রান্না করবে? আমার মাথা খাবে, না কি বিজেপির মাথা। তার পরে বলছে ওরা যে রাজ্যে আছে মাছ, মাংস খাওয়া যাবে না। বাংলা ভাষায় কথা বলা যাবে না। বললেই আপনি বাংলাদেশি। ধরে ধরে মারবে, অত্যাচার করবে। নাম কাটবে। কোনও পার্টি লড়াই করেনি। আমার বুকের পাটা আছে, তাই লড়াই করেছি।’’
‘‘লাইন চান, না কি বিজেপি-কে বেলাইন করতে চান! জোরে বলুন। লাইন দেবেন না বিজেপি-কে বেলাইন করবেন মা-বোনেরা! নোটবন্দির লাইন! আধার কার্ডের লাইন, এসআইআরের লাইন। ব্যাঙ্কে ১৫ লক্ষ টাকা পাঠাবে। বছরে ২ কোটি চাকরি দেবে,’’ বললেন মমতা।
মমতা বললেন, ‘‘বীরভূম আন্তর্জাতিক মাটি। কবিগুরুর মাটি। আমরা সকলকে সম্মান করি। কোথায় ছিল সে দিন বিজেপি? আজ তৃণমূলের সকলকে চোর বলছে নগ্ন ভাষায়। ব্রেন নেই। সবচেয়ে বড় ডাকাতের দল তোমরা। দেশ, রেল, এলআইসি বিক্রি করেছ। যারা দেশ বেচে, তারা বড় বড় কথা বলে। বীরভূম জেলায় নেতা কম না। ভণ্ড তপস্বী। বীরভূমে স্বাধীনতার পর যা হয়নি, বিশ্ববাংলা বিশ্ববিদ্যালয় করে দিয়েছে। কেষ্ট অনেক সাহায্য করেছে। কারণ, বীরভূম জেলা ওর নখদর্পণে। সুতরাং, যখন প্রশাসনিক বৈঠক করতাম, ওরা সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরামর্শ দিত, আমরা কাজ করতাম। আজ বীরভূম জেলা অনন্য। আমি গর্ববোধ করি।’’
বক্তৃতার শুরুতে মমতা বলেন, ‘‘বীরভূমে খুব গরম। প্রথমেই বলি দীর্ঘ দিনের সহকর্মী কেষ্ট (অনুব্রত মণ্ডল) সঙ্গে রয়েছেন।’’ এর পরে বীরভূমের দুবরাজপুর-সহ বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থীদের নাম বলেন তিনি। মমতার কথায়, ‘‘আজ অন্নপূর্ণা পুজোর দিনে এই বীরভূমের মাটি স্পর্শ করতে পেরে ধন্য। এখানে সতীপীঠ রয়েছে। সেগুলি উন্নয়ন করে দিয়েছে। মামা-ভাগ্নে পাওয়ার রয়েছে, তার উন্নয়ন হয়েছে। গ্রামীণ হাসপাতালে বাচ্চাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে। অনেক সেতু, পানাগড়-দুবরাদপুর রাস্তা করেছি। সিউড়ি-রাজনগর রাস্তার উন্নয়ন করেছি। জয়দেব-কেন্দুলি সেতু, অজয়ের উপরে সেতু, পথশ্রীতে টাকা দেওয়া হয়েছে। দেউচা-পচামিতে কয়লাখনিতে এক লক্ষ ছেলে-মেয়ের কর্মসংস্থান হবে। সেখানে কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষতিপূরণও দিয়েছি। চাকরিও দিয়েছি। প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পাবেন। আমরা যখন ক্ষমতায় এসেছিলাম, হাজার বার মানুষজনকে বলতে শুনতাম, রাতে রাস্তায় বসে থাকতাম। শুনতাম, লোডশেডিংয়ের সরকার। এই দেউচা-পচামি হলে বিদ্যুতের চাহিদা মিটবে। অভাব হবে না আগামী ১০০ বছর। বীরভূমে আমার একটা গ্রাম আছে। শহরে থাকি মানে শহুরে মনে করবেন না। ৯৯ শতাংশের একটা গ্রাম আছে। পিতৃভূমি, মাতৃভূমি বীরভূমে। পিতৃভূমিতে যাওয়া হয়নি। নির্বাচনের পরে ঘুরে আসব। বাবা-জেঠুরা দেবোত্তর সম্পত্তি পান। বাবা নেননি। জ্যাঠামশাইদের ছেড়ে দেন।’’
‘‘মা-বোনেরা তৈরি তো! আমার লক্ষ্মী-সরস্বতী, রোশেনারা-মুন্ডা, বাগদি, বাউরি কোথায়! নরেন বাউরিকে ভোট দেওয়ার জন্য আবেদন জানাব। জোড়াফুলে ভোট দেবেন, ভালবাসবেন।’’ প্রার্থীদের এগিয়ে আসতে বলেন। মমতা বলেন, ‘‘রামপুরহাটে আশিসদার (আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়) বিকল্প নেই। লাভপুরে রানা (অভিজিৎ সিংহ)। বোলপুরে (বিজেপি) অমর্ত্য সেনকে অনেক অসম্মান করেছে। তাই চাঁদুকে (চন্দ্রনাথ সিংহ) ভোট দেবেন।’’ এর পরে মন্ত্র পড়েন মমতা। মঞ্চে আদিবাসী মহিলাদের নাচে পা মেলান মমতা।
‘‘কেউ কেউ বলছিলেন, আবার নাকি লকডাউনের কথা ভাবছে, যাতে লোকে বেরোতে না পারে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। কোভিডের সময় তো ছিল। ২০২১ সালে। তখন যদি ভোট করতে পারি, এখন যতই লকডাউন করো, মানুষের মুখে হাতে তালা-চাবি লাগাতে পারবে না। ওটা মানুষের নিজস্ব অধিকার।’’ বললেন মমতা।
মমতা বললেন, ‘‘হাঁদা-ভোদা দুই ভাই, চক্রান্ত করে তাই। যতই করো হামলা, তৃণমূল জিতবে বাংলা। নির্বাচনের পরে পিঠে পোস্টার লাগিয়ে বলতে হবে আমি বিজেপি করি না।’’
‘‘ভোটটা দেবেন তো! যদি ভয় দেখায়, ভয় পাবেন? পাবেন না। এই লোকটা আইন মানে না। বেলাইনের পথিক। সকলে আইনজীবী নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে, যাতে কোনও বজ্জাতি করতে না পারে। জাতের নামে বজ্জাতি করছে। ওরা যত করবে চক্রান্ত, তত হবে ব্যর্থ। যাঁরা লাইনে, তাঁদের বেলাইন করব,’’ বললেন মমতা।
‘‘শান্তি বজায় রাখবেন রামনবমীতে। আগামী কাল কোনও কর্মসূচি রাখিনি। আমাদের অনেকে মিছিল, মিটিং করেন। অন্যরাও করে। নবরাত্রি চলছে। কাল অন্য কাজ করব। বিকেলে ফিরে আসব। সরকারি কাজও আছে। অনেক সই করতে হয় নির্বাচনের সময়ে। কাল গিয়ে করব,’’ বললেন মমতা।
পাণ্ডবেশ্বরের পরে বীরভূমের দুবরাজপুরে বৃহস্পতিবার সভা করেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি বলেন, ‘‘মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ওয়াশিং মেশিনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বিজেপি।’’
‘‘বিজেপি এখন উকুন বাছাই করছে ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন দিয়ে। এই করে কি ভোটাধিকার কাড়া যায়? আজ প্রমাণ করতে হবে, এ দেশ আপনার জন্মভূমি কি না। আপনার বাবা-মা এখানে জন্মেছেন কি না! এ কী কথা। এর পর করবে এনআরসি। তার পরে সেনসাসের নামে, যাদের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে, তার অর্ধেক কাটবে— এটাই পরিকল্পনা। তাই এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অস্তিত্ব, সম্মান, আশ্রয় বাঁচাতে হলে জানবেন, তৃণমূল থাকলে কাউকে যেতে দেবে না। আমরা এসআইআর মানিনি। রাস্তায় পাঁচ দিন পড়েছিলাম। কোর্টে গেছিলাম।’’
‘‘এমন করছে, রাষ্ট্রপতি শাসন করে দাও। ডিজি, মুখ্যসচিব সব বদলে দিয়েছে। এত ভয় পায়, আমার সঙ্গে কার্টসি কল করেনি। এগুলো মনে থাকবে। আমি প্রতিশোধপরায়ণ নই। সকলের প্রতি ভরসা আছে। তুমি এখানে লুকিয়ে মেঘের আড়াল থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন করলেও মনে রেখো, আমি একাই একশো। আমার সঙ্গে মানুষ। এখন কোনও দুর্ঘটনা, হিংসা হলে বিজেপি, ভ্যানিশ কুমারকে দায়িত্ব নিতে হবে। মনে রাখবেন, আমার হাতে এখন ক্ষমতা নেই।’’