মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
মমতার কথায়, ‘‘যতই করো চক্রান্ত, সব হবে ব্যর্থ। যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা। তৃণমূল জিতবে বাংলা। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যৌবন জিতবে বাংলা। সকলে প্রণাম, জোহার। জয়হিন্দ। এলাকায় আটকে দেয়, মা-বোনেরা ওই দিন রান্না না করে ভোটবাক্স পাহারা দেবেন। গণনার দিন পাহারা দেবেন। আপনারা সহযোদ্ধা।’’
মমতার বক্তব্য, ‘‘সিরাজ জোড়াফুলের প্রার্থী। আমার প্রার্থী। ২৯৪টি কেন্দ্র আমাদের মানে বাংলার। মানে বাংলা বাঁচানোর, চক্রান্তকারীদের ধ্বংস করে দেওয়ার। স্বাধীনতা আন্দোলনকে সম্মান জানানোর। বাংলা মানে আমরা সবাই। কুৎসায় ভুলবেন না। তৃণমূলের সরকার আসায় যা পাচ্ছেন, সব বন্ধ করবে। বুলডোজ়ার চালিয়ে বাইরের লোকেরা এসে বাংলা দখল করবে। ভিটেমাটি ছাড়া করবে। সতর্ক থাকুন। সকাল ভোট দিন। নাম কেটেছে, অনলাইনে আপিল করুন। আমরা আইনজীবী দেব। যেটুকু নাম উঠেছে, আমরা কোর্টে কেস করেছিলাম বলে।’’
মমতা বললেন, ‘‘দেশটাকে বিজেপি যে ভাবে চালাচ্ছে, ২ মাসের মধ্যে দিল্লি ছেড়ে পালাতে হবে। দিল্লিতে যারা থাকবে না, তারা কাকে চমকাবে? দুটো কান কাটা। যা পারে মিথ্যা বলে। করছে লুট, বলছে ঝুট। লুটেরার দল। ভোট কাটার দল। এসআইআরের নামে মানুষকে অসম্মান করার দল। ২০০ প্রাণ নেওয়ার দল। বাংলার খাওয়া-পরা বন্ধ করার দল। মাছ-মাংস খেতে পারবেন না, যদি কেউ টাকা নিয়ে বিজেপি-কে ভোট দেন!’’
‘‘আপনার এই জেলা টগবগ করবে। তাজপুরের গভীর বন্দর, ডানকুনি করিডর, জগন্নাথ ধাম— কোনটা বাকি। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। আরও হবে। ভুলে যান প্রার্থী আমি না তুমি। প্রার্থী আদিবাসী না খ্রিস্টান, হিন্দু না মুসলমান, এক জন প্রার্থী জেতা মানে আমাদের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এক জনের হার মানে বিজেপি সব কেড়ে নেবে। ভোটের আগে দেয় ক্যাশ, তার পর দেয় গ্যাস। এক মাস জ্বলবে। তার পর গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। পেট্রলও পাবেন না,’’ বললেন মমতা।
মমতার বক্তব্য, ‘‘সব ঘরে পানীয় জল পৌঁছে দেব। যুবসাথী যুবকদের পকেটখরচ। সকলের চাকরির ব্যবস্থা করব। কারও কাছে তাঁদের যাতে হাত পাততে না হয়, তাই টাকা। ওরা নগ্ন ভাষায় কথা বলে। আমরা সৌজন্যের ভাষায় কথা বলি। দেশে বেকারের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলায় ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমিয়েছি। ২ কোটি ছেলেমেয়েকে চাকরি দিয়েছি। আগামী দিনে আরও দেব।’’
‘‘কন্যাশ্রী দেওয়ার সময় ঠিক ছিল হিন্দু না মুসলমান পাবে? এক কোটি মেয়ে পায়। জনজাতি, তফসিলিদের জন্য শিক্ষাশ্রী আছে। নবম শ্রেণিতে উঠলে সাইকেল পায়। একাদশ শ্রেণিতে উঠলে স্মার্টফোন পায়। আমাদের সরকার বিনা পয়সায় খাদ্য, সেবা দেয়। লক্ষ্মীর ভান্ডার, সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথী কে দেয়? আমরা দিই। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা দিই, যার এক একর জমি রয়েছে। যার এক কাঠা জমি রয়েছে, তাকে ৪ হাজার টাকা দিই। ভাগচাষিরাও ২০০০ টাকা করে বছরে দু’বার পাবেন। আমাদের অঙ্গীকার, লক্ষ্মীর ভান্ডার সারাজীবন চলছে, চলবে। আমরা ৩০ লক্ষ বাড়ির জন্য ৬ মাসে টাকা দিয়েছি। আগামী দিনে সব কাঁচা বাড়ি পাকা করে দেব।’’
‘‘আমাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে। বাংলার মানুষ তোমাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে। জবাব চাই, জবাব দাও। দাঙ্গা করে ক্ষমতায় এসেছিলে কেন! কেন মাছ, মাংস খেলে মারবে! অন্য রাজ্যে গিয়ে কথা বললে হোটেলে থাকতে দেবে না। বাংলাকে শেষ করতে চায়। যদি বাঁচতে চান, ভিটেমাটি, পরিবার নিয়ে ভাল থাকতে চান— তা হলে জোড়াফুলের বিকল্প নেই।’’
‘‘যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে সব ধর্মের মানুষ থাকে। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান, তফসিলি থাকে। এই যুদ্ধ লড়াই করে গণতন্ত্রকে বাঁচানোর। এই যুদ্ধে ভেদাভেদ নয়। যারা এসআইআর লাইনে দাঁড়িয়ে অসম্মান করেছে, নাম কেটেছে, তাদের ভোট নয়। নির্বাচন আসলে নগদ। হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ঢুকেছে লোক।’’
‘‘আমি জগন্নাথ ধাম করলে কত কথা বলে। আজ তাদের মুখ থেকে ধর্ম শুনতে হবে? আমি রামকৃষ্ণকে বিশ্বাস করি। বিবেকানন্দ, গান্ধীজি, নেতাজি, রবীন্দ্র-নজরুলকে বিশ্বাস করি। এই মাটিতে জন্ম ক্ষুদিরামের। গান গেয়েছিলেন, একবার বিদায় দে মা। সেই ভারত জ্বালিয়ে ছারখার করছে বিজেপি। আমাদের শত্রু।’’
‘‘বিদ্যাসাগরের কোন মাটিতে জন্ম? বীরসিংহপুরে। এই মা বলার শব্দ জুগিয়েছেন তিনি। আমরা গর্বিত। মাতঙ্গিনী, বীরেন্দ্র শাসমল, সতীশ সামন্তের জন্য গর্বিত। রবীন্দ্র-নজরুলের জন্য গর্বিত। মেয়েদের সহমরণে যেতে হত। বিধবা বিবাহের প্রচলন ছিল না। বিদ্যাসাগর চালু করেন। এই জেলা সম্প্রীতি, স্বাধীনতার জেলা। জাগরণের জেলা। সংখ্যালঘুদের সংরক্ষণ নেই। তফসিলি জাতি, জনজাতিদের জন্য সংরক্ষণ রয়েছে। মনে রাখবেন, সংখ্যালঘুদের ৩৩ শতাংশ ভোট রয়েছে। ওরাও আমাদের ভাই-বোন। হিন্দু ঘরের মেয়ে হয়ে এই সরকার চালাতে পারি, সকলে কি আমায় ভোট দেয়নি? সমর্থন দেয়নি?’’
‘‘বিরোধী দলকেও সম্মান করি। সে তার কাজ করবে, গালি দেবে আমায়। আমি সৌজন্য দেখাব। কিন্তু দুর্বল হব না। কথাটা খারাপ বললাম? সব ধর্মকে বলব। বিজেপি ধর্ম মানে না। কাশীতে অনেক মন্দির ভেঙেছে। দিল্লিতে বাঙালিকে মারতে গিয়ে কালীমন্দির ভেঙেছে।’’
‘‘মা-বোনেরা, কোনও ধর্ম ওরা মানে না। স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল মেদিনীপুর। মাতঙ্গিনী হাজরা সকলের গর্ব। ইংরেজরা গুলি করেছিল। পিছিয়ে যাননি। তাঁর নামে সেতু পিছাবনি। হলদিয়ায় তাজপুর বন্দর, দিঘায় জগন্নাথ মন্দির, শালবনিতে বিদ্যুৎ প্রকল্প, একটার পর একটা প্রকল্প উঠছে,’’ বললেন মমতা।
‘‘আপনারা চান লক্ষ্মীর ভান্ডার চলুক! কোনও ভেদাভেদ নেই। ভাববেন না সিরাজ খান সংখ্যালঘু। অপপ্রচার হবে। আমার কাছে সংখ্যালঘু, মহিলা, তফসিলি— সকলেই থাকবে। সংখ্যালঘুরা কি প্রশ্ন করেছেন, মমতা ব্রাহ্মণের ঘরের মেয়ে, তাঁকে কেন মুখ্যমন্ত্রী করা হবে? করেননি। মুসলিমকে প্রার্থী করা হলে হিন্দুরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। তা হলে আমার অসম্মান হবে। সব ক’টি আসন গুরুত্বপূর্ণ। একটা সিটে হারলে বিজেপি আপনার মাছ খাওয়া বন্ধ করবে। অসম্মান করবে। বাইরে কাজ করতে গেলে হোটেলে থাকতে দেবে না। পরিযায়ীরা আসতে চাইছে, ট্রেনের টিকিট দেয় না। এই ষড়যন্ত্রকারী দলকে চান? দেখবেন ফুল শুকিয়ে যাবে।’’
‘‘পানীয় জল পৌঁছোনোর জন্য ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প করেছি। দীর্ঘ দিন দিল্লির জমিদারদের কাছে আবেদন জানিয়েছি, যে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান করে দিন। প্রতি বছর মানুষ বন্যায় ভাসে। প্রতি বছর আসে, জানি মানুষের কী কষ্ট। এত দিন বলার পরেও কেন্দ্রীয় সরকার করে দেয়নি। আমরা দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়েছিলাম। এটা রূপায়িত হলে পাঁশকুড়াও উপকৃত হবে।’’
‘‘সকলকে বলব একসঙ্গে কাজ করুন। এখানে ফুলচাষি রয়েছেন। তাঁদের জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিলাম। বিজেপি ক্ষমতায় এসে বন্ধ করেছে। ফুলচাষিদের জন্য অনেক কিছু করেছি। কোলস্টোরেজ, প্যাকেজিং, পরিবহণ ও অন্য সহযোগিতা করেছি। এখানে নতুন কলেজ দিয়েছি। সিদ্ধিনাথ কলেজ। সংখ্যালঘু, তফসিলিদের জন্য হস্টেল হয়েছে।
‘‘নারায়ণগড়, বেলদা, দাঁতন, মেদিনীপুর, খড়্গপুর, সব আমার পুরাতন প্রাচীন জায়গা। অবিভক্ত মেদিনীপুরে মাতঙ্গিনীর লড়াই জানেন! মাতৃভাষায় যে কথা বলতে শিখেছি, তা-ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সৃষ্টি। তাঁকে প্রণাম জানাই। তিন জায়গায় স্বাধীনতা আগে ঘোষণা হয়। তার মধ্যে মেদিনীপুর একটা। সংগ্রামের মাটি মেদিনীপুর। দীর্ঘ দিন এখানে আসি।’’
‘‘আমাকে বসিয়ে রেখে এত বক্তৃতা করলে সমস্যা হয়। আমাকে অনেক জায়গায় যেতে হয়। কখনও ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে।’’