তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া রোডে মমতার জনসভায় ‘বিপত্তি’। তাঁর সভাস্থলের কিছুটা দূরে বিজেপি মাইকিং শুরু করে বলে অভিযোগ। তার জেরে সভায় কয়েক মিনিটের সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়েই তা শেষ করতে হয় মমতাকে। তৃণমূলনেত্রী বলেন, “কেন করবে এটা? ইলেকশনের কতগুলো রুলস আছে। তা হলে ওরাও যেদিন মিটিং করবে তোমরা পাল্টা লাগিয়ে দেবে। তখন পুলিশ তুলতে আসলে, মেয়েদের ধরে এফআইআর করবে। এটা পার্শিয়ালিটি।”
এর পরে মঞ্চ থেকেই কাউকে ফোন করেন তৃণমূলনেত্রী। শেষে মাইক হাতে নিয়ে বলেন, “মিটিং আমার পক্ষে করা সম্ভব? পারমিশন নিয়ে। এ বার আপনারা বলুন। সাধারণ মানুষ দেখতে পাচ্ছেন। আমি সব অফিশিয়াল পারমিশন নিয়েছি। তার পরে আপনারা দেখুন, কী অ্যাটিটিউড। ওরা পশ্চিমবঙ্গকে দখল করতে জোর করে যা করছে, তা ঠিক নয়। ওরা যদি এটা আমার কেন্দ্রে করতে পারে… আমি এক মাস এখানে ছিলাম না। আমি রাজ্যে ঘুরছিলাম ২০০ আসনের জন্য। অভিষেকও প্রায় ১০০ আসনের জন্য প্রচার করছে। আপনারা যদি এমন আচরণ করেন, তা হলে আমি দুঃখিত। আমাকে আইনি পদক্ষেপ করতে হবে। আমি সেটা করব। তা হলে বুঝতে পারছেন, পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করছে। এই দেখুন, সামনে চিৎকার করছে, যাতে আমি মিটিংটা করতে না পারি। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি কাল এখানে র্যালি করে দেব। আমি এই অসভ্যতামি করতে পারব না। এটা খুব অপমানজনক। আমি আপনাদের নমষ্কার জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি। যদি পারেন, ভোটটা আমায় দেবেন। আমার সিম্বল নম্বর ২। কিন্তু এর প্রতিবাদে আপনাদের ভোটটা দিতে হবে। আমাকে মিটিং পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না। আমি পারমিশন নিয়েছি। তা-ও।”
জানা যাচ্ছে, এই ঘটনাকে ঘিরে তৃণমূল এবং বিজেপি উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভবানীপুরের প্রথম জনসভা শেষ করে মমতা পৌঁছোন চক্রবেড়িয়া রোডে দ্বিতীয় জনসভায়।
মমতা বলেন, “এখন যে ভোট হল(প্রথম দফায়) তাতে আমরা ১০০ পার করে গিয়েছি। আরও যে আসনগুলিতে ভোট রয়েছে, সেগুলিতেও আপনাদের সকলকে ভোট দিতে হবে। তা হলে আমাদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হয়ে যাবে। না হলে, একটু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে এরা কিনে নেয়। এ ভাবে মহারাষ্ট্র, গুজরাতের সরকার ভেঙেছে। এই জন্য আমি চাই, আপনারা সকল আসনে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিন।”
মমতা বলেন, “জঙ্গলমহলে ভোটের সময়ে ৩০০০ টাকা দেবে বলে সকলকে ফর্ম ফিলাপ করিয়েছিল। আজ আমি অনেক ছবি, ভিডিয়ো দেখলাম, সেই সব ফর্ম জঙ্গলে ফেলে চলে গিয়েছে। কী প্রতারণা করে!”
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, “আপনাদের ভয় করে না? কখনও ইডি, কখনও সিবিআই। মিরাজ তো গুজরাতি। ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটির চিফ। আমার কাছে জমি চেয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় করবে। আমি জমি দিয়েছিলাম বেহালায় বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য। টাকাও দিয়েছিলাম। কিন্তু ওর বাড়িতে গিয়ে রেড করল। কেন? কারণ ও আমার ইনকাম ট্যাক্স কেস করে। আমি তো তখন ভাবিনি ও গুজরাতি না মারোয়াড়ি না রাজস্থানি না বাঙালি? তা হলে কেউ কেউ কেন এটা ভাবে? আমি যেখানে থাকি, সেটাই আমার ঘর, সেটাই আমার পরিবার।”
মমতা বলেন, “বলছে বাইক বন্ধ। দোকান বন্ধ। সব বন্ধ। শুধু তোমরা একা চলবে, আর কেউ চলবে না? মানুষ বাইরে বিপদে পড়লে কী করে যাবে? কোর্টে কেস করে আটকানো হয়েছে। জোরজুলুম করছে। হামলা করছে। অত্যাচার করছে। দিল্লি মনে রেখো, আগামী দিন তোমাদের বদলা নেওয়ার পালা। আমি কোনও দিন বদলার কথা বলিনি। কিন্তু আমি ভোটের মাধ্যমে বদলা নেব। ’১১ সালে বলেছিলাম বদলা নয়, বদল চাই। আর এ বার বলছি, বদল নয়, গণতান্ত্রিক বদলা চাই।”
মমতা বলেন, “আপনার কী দরকার পড়ল যে দু’লক্ষ পুলিশ বাইরে থেকে নিয়ে এলেন? সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে এলেন? এত ফোর্স কেন? পশ্চিমবঙ্গকে জোর করে দখল করা যাবে না। লোকে যদি মন থেকে চায়, তো লোক (ভোট) দেবে। লোকের উপর ভরসা রাখো।”
মমতা বলেন, “উত্তরপ্রদেশে প্রতিদিন মহিলাদের উপর অত্যাচার করা হয়। পুলিশের কাছে যেতেও দেয় না। আমাদের এখানে এত লোক থাকে, একটা-দু’টো ঘটনা ঘটলে, আমরা তাকে সমর্থন করি না। আমরা অ্যাকশন নিই। আমরা দেড় মাসের মধ্যে অভিযুক্তকে ফাঁসিতে চড়িয়েছি, এমন উদাহরণও রয়েছে।”
অমিত শাহের মন্তব্যের পাল্টা দিয়ে মমতা বলেন, “আপনারা বলছেন কলকাতাকে আমি ঝুপড়ি বানিয়ে দিয়েছি। তা হলে কি গরিবেরা থাকবেন না? দোকানদার থাকবেন না? যে আপনার বাড়িতে কাজ করেন, দোকানে কাজ করেন, যাঁরা শ্রমিক, কৃষক, তাঁদের দরকার নেই?” মমতা আরও বলেন, “আমরা বাড়িতে, দোকানে অনেককে কাজে লাগাই। আমেরিকায় গিয়ে দেখুন, সব নিজেদের করতে হয়। পুরো বাসন ধোয়া থেকে কাপড় কাচা সব নিজেকে করতে হয়। আর এখানে দেখুন আপনাকে কত সাহায্য করে। আর যে সাহায্য করছেন, তাঁদের বলছেন ঝুপড়িবাসী? এটা বলা ঠিক নয়। এক দিন আপনারাও এমনই ছিলেন, আজ বড় হয়েছেন। কোটি কোটি টাকা হয়েছে। সকলকে সম্মান করুন। সকলে কোটিপতি হন না। তাতে কী হয়েছে?”
মমতা বলেন, “এখানে দু’লক্ষ ফোর্স পাঠিয়েছে শুধু ভোট ক্যাপচার করার জন্য। ছাপ্পা ভোট দেওয়ার জন্য। লোকের উপর ভরসা নেই।”
মমতা বলেন, “এটা বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে অন্তত আপনারা ভবানীপুর কেন্দ্রে তৃণমূল জোড়াফুলকে ভোট দেবেন, সেই আবেদন থাকবে। আমার চিহ্নটা দু’নম্বরে আছে।” আঙুলে দুই দেখিয়ে বলেন, “যেটা ভিক্ট্রি চিহ্ন। আপনারা জানেন, সরকার আমরাই গড়ব। সরকারকে, পার্টির যা যা সিদ্ধান্ত— আমাকেই লিড করতে হবে। একটা ভোট হয়ে গিয়েছে। নিশ্চিন্তে থাকুন, খুব ভাল হয়েছে।”
ভবানীপুরবাসীকে ‘মিনি ইন্ডিয়া’র কথা বলে মমতা বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের এটাই গৌরব। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, সম্প্রীতি। পশ্চিমবঙ্গ সব সময়েই সুশোভিত, বিকশিত, সুরভিত, পুষ্পিত। সব সময়ে পল্লবিত। পশ্চিমবঙ্গে মানুষের মান-মর্যাদা আছে, অতিথি পরায়ণতায় জানে। অতিথিকে সম্মান দেয়, সব সংস্কৃতিকে সম্মান দেয়।”
মমতা বলেন, “আমি বেশি কথা বলব না। আমি জানি, আপনারা সব ভাষা বোঝেন। একসঙ্গে মিনি ইন্ডিয়ার মতো পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। শান্তিতে থাকেন। ভাল করে ব্যবসা করেন, দোকান সামলান। সব কিছু ভাল ভাবে করেন আপনারা। আপনাদের কোনও দিন কোনও সমস্যা হয়নি। কারণ আমরা কোনও দিন সমস্যা করতে দিই না। সবাই আমাদের ভাই-বোন।”
মমতা বলেন, “ঈশ্বরের আশীর্বাদ রয়েছে। তাই আমাদের একটি সভাও বাতিল হয়নি। শুধু এক দিন খুব সাইক্লোন ছিল। ওই দিন আমার দেরি হয়েছিল, তা-ও পৌঁছেছি।”
ভবানীপুরে মমতা বলেন, “এত গরম বাপরে বাপ। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূমে মিটিং করা খুব কষ্টকর। লু বইছে বাইরে। লু-এর সঙ্গে লড়াই করে আমাকে এই সব মিটিং করতে হচ্ছে।”
ভবানীপুরের শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিট থেকে কালীঘাট রোডের ক্রসিং পর্যন্ত একটি পদযাত্রা করেন মমতা। পদযাত্রার পরে ভবানীপুরেই পর পর দু’টি জনসভা রয়েছে তৃণমূলনেত্রীর।