—প্রতীকী চিত্র।
“পেটের দায়ে ওড়িশায় গিয়েছি বলে কি সেটা আমার দেশ নয়! ওটা তো বাংলাদেশও না। পাকিস্তানও না!”, বিস্ময় কাটছে না বছর আটাশের সুজন সরকারের। মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জ বিধানসভার দোগাছি ন’পাড়া অঞ্চলে লস্করপুর গ্রামে বসে বলছিলেন ঢেঙ্কানল ফেরত এই পরিযায়ী শ্রমিক। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা দেখিয়েও মার খেয়ে যাঁকে ফিরে আসতে হয়েছে।
রাজ্যের প্রথম দফা বিধানসভা নির্বাচনের দিন, বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝাড়খণ্ডের পাকুড় লাগোয়া গ্রামে সুজন, তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী, মা শেফালি ও বাবা সত্যবান সবে পাশেই লস্করপুর বালিয়াঘাটি হাই স্কুলে ভোট দিয়েছেন। সুজন এক বছরেরও কিছু বেশি আগে ঢেঙ্কানলে ফেরিওয়ালার কাজ করতে গিয়েছিলেন। আয় ছিল মাসে ১৪-১৫ হাজার টাকা। সেখানেই হয় হামলা। সুজন বলেন, “ওরা বলল, ‘তুই মুসলিম,তার পরে বাংলাদেশি’! আমি রুদ্রাক্ষের মালা দেখিয়ে হিন্দু বোঝাতে চাইলে, হনুমান চালিশা গাইতে বলেছিল! বাঙালিরা ও সব কবে গাইতে পারে! না পারায় জামাপ্যান্ট খুলে মারধর করল!” এক প্রৌঢ় তাঁকে বাঁচান।
পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য রাজ্য সরকারের কার্ড পাননি। ‘যুব সাথী’ প্রকল্পে আবেদনে লাভ হয়নি। স্ত্রী ‘লক্ষ্মীরভান্ডার’-এর প্রাপক নন। পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ সুজন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে গিয়েছিলেন। ভোট দিয়ে বলেন, ‘‘নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া ছাড়া, উপায় কই!’’
ভোট দিয়েছেন মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা থানার হোসেননগর গ্রামের মেহেবুব শেখ। অভিযোগ, ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে মুম্বই পুলিশ আর সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) মারধর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। পরে, ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’-এর (বিজিবি) সঙ্গে ফ্ল্যাগ-বৈঠক করে তাঁকে দেশে ফেরানো হয় বলে দাবি। হোসেননগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়ে মেহেবুব বলেন, “এক জন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ভোট দিলাম। ভাল লাগছে।” একই রকম ভাল লাগার শরিক রানিতলার তোপিডাঙা গ্রামের আওয়াল শেখ। বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে এক বছর তামিলনাড়ুর একটি ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক ছিলেন আওয়াল। মার্চ মাসের শেষে হাই কোর্টের নির্দেশে ছাড়া পান। তোপিডাঙার বুথে ভোট দিয়ে আওয়াল বলেন, “খুব মারা হয়েছিল, যাতে মেনে নিই আমি বাংলাদেশের লোক। আমি ভারতীয়। তাই শত অত্যাচারেও সে কথা মানিনি। আজ ভোট দিলাম ভারতীয় নাগরিক হিসেবে।’’
মুম্বইয়ে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন মালদহের মোথাবাড়ির গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামের রহিম শেখ। প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি ভোট দিতে বাড়ি ফিরেছেন। রহিম বলেন, “রোজগারের অর্ধেক টাকা যাতায়াতের খরচেই চলে গেল। তবুও ভোট দিলাম। কারণ, ভোট না দিলে শুনছি, ফের তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দেবে!”
তবে সব পরিযায়ীর ভোট-ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় ভোট দিতে পারলেন না বীরভূমের রামপুরহাট ১ ব্লকের কালিকাপুর গ্রামের একটি বুথের ২৯২ জন। তাঁদের বেশির ভাগই পরিযায়ী শ্রমিক। অনেকেই মুম্বই-কেরলেরাজমিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত। শেষ পর্যন্তনাম উঠবে তালিকায় সে আশায় অতিরিক্ত ট্রেন ভাড়া দিয়ে দু’দিন আগে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু ট্রাইবুনালে আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি। ভোট দিতে বাড়ি ফিরেছিলেন হায়দরাবাদে রাজমিস্ত্রির কাজ করা পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভার কামিনাচক গ্রামের শেখ মইদুল ইসলাম। মা মঞ্জিরা বিবি এবং স্ত্রী মারুফা বিবিকে নিয়ে পৌঁছেও গিয়েছিলেন বুথে। কিন্তু মা এবং স্ত্রী ভোট দিলেও, ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় ফিরে আসতে হয় মইদুলকে। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘তিন হাজার টাকা খরচ করে ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি ফিরেছিলাম মঙ্গলবার। রাজ্যে কর্মসংস্থান যাতে হয়, সে লক্ষ্যে এ বার ভোট দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ভোটাধিকারই তো চলে গিয়েছে!’’
ট্রাইবুনালে আবেদন করেও ভোটার তালিকায় নাম না ওঠায় ভোট দিতে পারেননি পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালের একাধিক পরিযায়ী শ্রমিক। ঘাটালের মূলগ্রামের আতাউল আলি শা মুম্বইয়ে কাজ করেন। ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় কর্মস্থল থেকে ফিরে ট্রাইবুনালে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠেনি। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘কাজ কামাই করে এত দিন পড়ে থাকলাম। লাভ হল না!’’
কোচবিহারের প্রায় তিন লক্ষ বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন্-রাজ্যে কাজ করেন। প্রায় প্ৰত্যেকেই ভোটের জন্য বাড়ি ফিরেছেন। দিনহাটার শালমারার পরিযায়ী শ্রমিক আলতাফ হোসেন, ফজিদুল শেখরা ভোট দিয়ে বলেন, ‘‘আশা করছি, এ বারে ভোটের মাধ্যমে অনেক সমস্যা মিটবে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে