— প্রতীকী চিত্র।
সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কুলতলি এলাকার পিয়ালি নদীর বহু অংশ মজে যাচ্ছে। নদীর দু’পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ইটভাটা। নভেম্বর থেকে মে মাসের মধ্যে সেখানে কাজ করতে আসেন ভিন্ রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকেরা। কুলতলির এই মজে যাওয়া নদীতে জোয়ার-ভাটা এখনও খেলে।
বর্ষায় কূল ছাপানো জল প্রায়ই দু’পাশের এলাকা ভাসায়। চঞ্চলা নদীর মতোই কুলতলির রাজনীতিতেও বিরোধী হাওয়া মাঝেমধ্যেই তেড়েফুঁড়ে ওঠে। শাসকের আধিপত্যে ফাটল ধরায় সেই ঝড়।
২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের ভোটে কুলতলি থেকে জিতেছিলেন বামপ্রার্থী রামশঙ্কর হালদার। ব্যবধান কমলেও ২০১৬ সালের ভোটে এই কেন্দ্র সিপিএমের হাতছাড়া হয়নি। তবে, ২০২১ সালের নির্বাচনে এখানে জয়ী হন তৃণমূলের যুবনেতা গণেশ মণ্ডল।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও এই কেন্দ্র থেকে এগিয়ে ছিল শাসকদল। জামতলা থেকে কুলতলি যাওয়ার পথে কুন্দখালির কাছে রাস্তার পাশেই চারতলা ব্যাঙ্কোয়েট হলের ধাঁচে বিশাল পার্টি অফিসে গণেশের কার্যালয়। উপরের দু’টি তলে থাকা কয়েকশো কর্মী নিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধ সামলাচ্ছেন তিনি।
কুলতলির সাফল্য কী? ডান হাতে প্ল্যাটিনামের ব্রেসলেট ও তিন আঙুলে সোনার আংটি পরা হাতের তালু ছড়িয়ে গণেশ বললেন, ‘‘খুনোখুনির রাজনীতি বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনা। মানুষের কাজ ও ব্যবসার স্বার্থে শান্তি ফিরেছে কুলতলিতে।’’ পাশাপাশি, তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর প্রকল্পগুলির কারণে বাজার এলাকায় বাতিস্তম্ভ, ছাত্রাবাস, মিড-ডে মিলের ছাউনি, আবাস যোজনার বাড়ি, মৈপীঠে বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। সেই সঙ্গে গণেশের প্রতিশ্রুতি, মৈপীঠ-কলকাতা বাস পরিষেবা, একাধিক সেতু, সড়ক ও পর্যটন কেন্দ্রের বিকাশ এবং মৎস্য-হাব নির্মাণ। ২০২১ সালের থেকে এ বার ব্যবধান বাড়ানোর আশা করছেন তিনি। এসআইআরের কারণে কুলতলির কয়েক হাজার ভোটারের নাম বাদ নিয়েও ভাবিত নন গণেশ।
কুন্দখালি থেকে ফেরার পথে একাধিক রাস্তার বেহাল দশা চোখে পড়ল। কৈখালি ঘাটের কাছে কংক্রিটের নতুন বাঁধ হয়েছে। মৈপীঠে জঙ্গল লাগোয়া বহু গ্রামে বাঁধের উপরে তৈরি কংক্রিটের রাস্তা ভেঙেছে। সঙ্কীর্ণ নদী বাঁধের উপর দিয়ে যাতায়াত কষ্টকর। যুব আবাস থাকলেও লোকের দেখা নেই। সেখানেই শুকনো মাছ আর নদীর কাঁকড়া বিক্রি করছিলেন এক মহিলা। বললেন, ‘‘লোক কোথায়? দিনে ১০০ টাকা তোলাই কষ্টকর।’’
এলাকায় চাষের জমি কিনে ‘বাইরের’ লোক হোম-স্টে, রিসর্ট তৈরি করলেও স্থানীয় লোকের কপাল খোলে না। তাই কাঁটামারি গ্রামের সুমিত ও রবিকে বাড়ি থেকে দূরে যেতে হয় কাজের সন্ধানে। সুমিত সর্দারের বাবা সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান। সুমিত এখন তামিলনাড়ুতে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করেন। রবি সর্দারের বাবাও বাঘের আক্রমণে মারা গিয়েছেন। কলকাতা লাগোয়া এলাকায় কাজে যান রবি। দু’জনের কেউই সরকারি ক্ষতিপূরণ পাননি। ভোট নিয়ে জানতে চাইলে তাঁরা বললেন, ‘‘আমরা সরকারি সুবিধা পাইনি। আগে কাজ, তার পরে ভোট।’’
আশপাশের পাড়ায় বিদ্যুৎ পৌঁছলেও এলাকায় ভোল্টেজ এতই কম যে, আলো জ্বলে টিম টিম করে। মাতলা নদীর ধারে জঙ্গলের বাফার জ়োন লাগোয়া এলাকায় অনাদি হালদারের বাড়ি। মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক বার বাঘের মুখ থেকে ফিরেছেন। গত ডিসেম্বরে তাঁর স্ত্রী মারা যান। স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ও পাননি। বাড়িতে দু’টি ছোট ছেলেমেয়ে। জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি পেলে এখনও তাদের ঘরে রেখেই মৌচাক ভাঙতে যাবেন। তাঁর কাছেও ভোটের আলাদা বার্তা নেই।
এ হেন কুলতলির ভোটের ময়দানে সলতে পাকাচ্ছে বিজেপি। তাদের প্রার্থী মাধবী মহলদার। পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়াই করা মাধবী স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়েছেন। তাঁর হয়ে নির্বাচনী সভা করছেন শঙ্কর মাঝি। পেশায় অধ্যাপক শঙ্কর প্রয়াত তৃণমূল নেতা গোপাল মাঝির ভাই। ২০২১-এর নির্বাচনে টিকিট না পেয়ে গোপাল বিজেপিতে যান। আবু তালেব, নবকুমার নস্কর, রামকৃষ্ণ দাস এক সময়ের সক্রিয় সিপিএম কর্মী হলেও এখন বিজেপি করছেন। মাধবী বলছেন, ‘‘এলাকায় ধানকল, বহুমুখী হিমঘর, বারুইপুর-কুলতলি-মৈপীঠ রেলপথ হওয়ার কথা।’’
ওই কেন্দ্রে রয়েছেন সিপিএমের বর্ষীয়ান নেতা রামশঙ্কর হালদার, এসইউসি-র শঙ্কর নস্কর এবং কংগ্রেসের রূপা হালদার। সিপিএম লড়াইয়ে থাকলেও বামেদের লোকবল কমেছে। এসইউসি এবং কংগ্রেস, দু’দলের দুই প্রার্থী কিছু ভোট কাটলেও দাগ কাটার মতো লড়াইয়ে নেই। এলাকার বামকর্মীরা নৌকা ভাসাতে হাওয়া বদলের অপেক্ষা করছেন। আর বিজেপি নেতা ও কর্মীরা তাঁদেরই পাশে চাইছেন।
কুলতলির তুলনায় অনেকটাই একপেশে আর নিস্তরঙ্গ জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্র।
২০১৬ সাল থেকে সেখানকার বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস। ২০১৬ সালে তাঁর জেতার ব্যবধান ছিল ১৫ হাজারের মতো। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দল এগিয়েছিল ১৯ হাজার ভোটে। ২০২১ এবং ২০২৪ সালে ওই ব্যবধান ৩৯ এবং ৪৪ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। প্রাক্তন শিক্ষক বিশ্বনাথের আশা, এ বার ব্যবধান আরও বাড়বে।
সন্ধ্যা হতেই জয়নগরের রাস্তা যানজটে হাঁসফাঁস করে। পুর এলাকায় এবং গ্রামে পানীয় জলের সুবন্দোবস্ত হয়নি। মোয়ার হাব এখনও চালু হয়নি। বিশ্বনাথ নিজের প্রচারে যে প্রচুর টাকা খরচ করেছেন, তা এলাকায় ঘুরলেই বোঝা যায়। টুপি, টি-শার্ট, মিনারেল ওয়াটারের বোতলে নিজের ছবি এবং দলের প্রতীক লাগিয়ে নজরে আসতে চেয়েছেন তিনি। প্রায় চল্লিশ হাজার জলের বোতল জনসংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তাঁর বিপরীতে বিজেপি প্রার্থী অলক হালদার, সিপিএমের অপূর্ব প্রামাণিক, কংগ্রেসের তাপস বৈদ্য এবং এসইউসি-র নিরঞ্জন নস্কর। মূলত শাসকদলের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তি, বদলের তাগিদকে পুঁজি করে ময়দানে নেমেছেন বিজেপির অলক। তিনি চেষ্টা করছেন বিরোধী ভোট এক জায়গায় আনতে। কিন্তু তরুণ, স্বল্প পরিচিত এই প্রার্থী কতটা সফল হবেন, সংশয় থাকছেই।
সিপিএমের অপূর্ব প্রামাণিক প্রাক্তন যুবনেতা। তুলনায় পরিচিত মুখ। আগেও ভোটে লড়েছেন। তিনি বিকল্প রাজনীতির কথা বলছেন। গত নির্বাচনের তুলনায় এ বার ভোট বাড়ানোর আশা করছে বামেরা।
এ দিকে, জয়নগর পুর এলাকায় কংগ্রেসের কিছু ভোট রয়েছে। সেটুকু ধরে রাখাই লক্ষ্য কংগ্রেসের। এসইউসি প্রার্থী, দলের যুব সংগঠনের প্রাক্তন নেতা। এক সময়ে জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্র এসইউসি-র জেতা আসন হলেও, তাতে ভাঙন ধরেছে বহুকাল। ফলে অল্প কিছু শতাংশ ভোট পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতে পারে এসইউসি প্রার্থীকে।
সুন্দরবনের কাছাকাছি থাকা কুলতলিতে পিয়ালি নদীর শান্ত জলে বদলের ঢেউ উঠবে কিনা, বোঝা যাবে ফল বেরোনোর পরে। তবে জয়নগর সম্ভবত জয়ের ধারায় বদল করবে না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে