WB Elections 2026

পুলিশের লাঠি সয়ে সিঙ্গুরে শিল্প চান ‘মাতঙ্গিনী হাজরা’ও

সিঙ্গুরের পরে হিন্দমোটর— মোটরগাড়ির কথা উঠলেই হুগলি শিল্পাঞ্চল যেন ডরায়। বন্ধ কলকারখানা বরাবরই শিল্পাঞ্চলে চর্চার বিষয়।

রাজীব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৫
Share:

ঘরের দাওয়ায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নিজের ছবি হাতে বসে সরস্বতী দাস। নিজস্ব চিত্র ।

সিঙ্গুরের উত্তর বাজেমেলিয়ার ঢালাই রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে ‘মাতঙ্গিনী হাজরা’র বাড়িতে। বাড়ির পাশেই টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো কারখানার পরিত্যক্ত জমি, যেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছিল রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্প-স্বপ্ন। সে দিন প্রথম যে ক’জন জমি বাঁচাতে লাঠি হাতে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সরস্বতী দাস সদ্য পঁচানব্বই পেরিয়েছেন। ‘মাতঙ্গিনী হাজরা’ নামে পরিচিত হয়ে যাওয়া সরস্বতীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক গ্রামীণ এই জনপদের সকলের জানা। সিঙ্গুরে এলে ‘মাসিমা’র (সরস্বতী) খবর না নিয়ে ফেরেন না মুখ্যমন্ত্রী। ঘরের দাওয়ায় বসে সেই সরস্বতী বলছিলেন, ‘‘জমি ফিরে পেয়েছে সবাই। যেখানে চাষ হয়, সে জমিটুকু বাদ দিয়ে বাকি অংশে শিল্প হোক।’’ হিন্দমোটর কারখানা চত্বরে ঢোকার আগে চা বিক্রি করতেন সহদেব দাস। বলছিলেন, ‘‘এখন কারখানার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে ভয় করে। সাপ-বেজি ঘোরে। মনে হয়, ঘন জঙ্গলে হাঁটছি। বিকেল হলে এই রাস্তায় পা দেয় না কেউ। এই তো ক’দিন আগেই একটি মেয়েকে টেনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করল!’’

সিঙ্গুরের পরে হিন্দমোটর— মোটরগাড়ির কথা উঠলেই হুগলি শিল্পাঞ্চল যেন ডরায়। বন্ধ কলকারখানা বরাবরই শিল্পাঞ্চলে চর্চার বিষয়। সিঙ্গুরের বাজেমেলিয়ার বাসিন্দা প্রদ্যোত পাত্র, সুনীল পাত্রদের আক্ষেপ, ‘‘পরিযায়ী হয়ে গিয়েছি। লিলুয়ায় কাজ করতে যাই। টাটা-র কারখানা হলে হয়তো এমন হত না।’’ তাঁরা মনে করেন, ‘‘আলোচনা করে জমি নিলে এই পরিস্থিতি হত না। এখানে শিল্প হোক, মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে। তা না করলে আগে যা হয়েছে, পরেও তা-ই হবে।’’ সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনের উৎসস্থল বেড়াবেড়ির বাসিন্দা কাজল পাত্রের কথায়, ‘‘শিল্প হলে ভাল হত। কিন্তু হল না। আমরা চাই, চাষের অংশটুকু বাদ দিয়ে বাকি জমিতে শিল্প হোক। তাতে উপকৃত হবেন সকলেই।’’

উত্তরপাড়া থেকে শ্রীরামপুর, চাঁপদানি, চন্দননগর, চুঁচুড়া হয়ে সিঙ্গুর— সর্বত্রই বিরোধীদের হাতিয়ার আর তৃণমূলের অস্বস্তির কারণ এই শিল্প-প্রসঙ্গ। উত্তরপাড়ার সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের প্রচারের হাতিয়ারও শিল্প। নিয়ম করে সে প্রসঙ্গে তিনি বিঁধছেন তৃণমূলকে। প্রায় প্রতিটি সভায় বলছেন কর্মহীনদের স্বপ্নভঙ্গের কথা। তাঁর কথায়, ‘‘এ লড়াই শুধু উত্তরপাড়ার নয়, গোটা রাজ্যের বেকারদের। তৃণমূলকে তাঁরা ক্ষমা করবেন না।’’ বিজেপির রাজ্য নেতা, চন্দননগরের প্রার্থী দীপাঞ্জন গুহের অভিযোগ, ‘‘শিল্প টানার পরিবর্তে শিল্পাঞ্চলে জুলুম চালিয়েছে তৃণমূল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সিঙ্গুরে বলে গিয়েছেন, ক্ষমতায় এলে রাজ্যের হাল ফেরাব।’’

শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য পাল্টা বলছেন, ‘‘যতগুলি কারখানা বন্ধ হয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি খুলেছে তৃণমূলের জমানায়। শ্রীরামপুরে সিল্ক-হাব ভারতে নজির হবে। আমাদের আমলে নয়, হিন্দমোটর ২০০৮-এই কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের সরকার ওখানে নতুন করে কী করা যায়, তা ভাবছে। ওখানে ওয়াগন ফ্যাক্টরি হয়েছে।’’

এক সময়ে কোন্নগর, রিষড়া, শ্রীরামপুর, চাঁপদানি, ভদ্রেশ্বর, চন্দননগর শহরের বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙত চটকলের ভোঁ শুনে। জেলায় ১০টি চটকলের মধ্যে তিনটি বন্ধ। চন্দননগরের লিচুবাগানে পঞ্চাননতলার কাছে আড্ডা দিচ্ছিলেন গোন্দলপাড়া চটকলের অস্থায়ী কর্মী ছোটেলাল পাসোয়ান, ডোমন দাসেরা। ছোটেলালের কথায়, ‘‘ঘর ভাড়া মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা। চটকলে রোজ কাজ জোটে না। মাসে আট-ন’হাজার টাকা রোজগার হয়।’’ ডোমন বলেন, ‘‘চটকলে কাজ না পেলে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করি। পাঁচ জনের সংসার চালাতে কমপক্ষে মাসে ১০ হাজার টাকা দরকার।’’ তবে তাঁরা মানছেন, ‘‘এই সঙ্কটে সুরাহা দিয়েছে লক্ষ্মীর ভান্ডার। ওটা না থাকলে পথে বসতে হত।’’ তেলেনিপাড়ার ভিক্টোরিয়া জুটমিলের কর্মী অমিত চৌহানের কথায়, ‘‘শিফ্‌টের সংখ্যা কমায় কর্মী কমেছে। অনেকেই অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছেন কাজের খোঁজে।’’

শ্যামনগর জুটমিলের প্রাক্তন ম্যানেজার কল্যাণ মিত্র কয়েক দশক চটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলছেন, ‘‘গত দশ বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মী কমেছে চটকলে। এখন এক টন পাটের দাম বেড়ে হয়েছে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। একটা চটের বস্তা তৈরিতে খরচ প্রায় ২০০ টাকা। এত দামে কে বস্তা কিনবে? সরকার যা বরাত দেয়, তাতে মিলগুলো চলে। মিলের আধুনিকীকরণ হয়নি। পাট চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন চাষিরা। পাটের আমদানি কমেছে। সমস্যা বাড়িয়েছে মুনাফার জন্য এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর মধ্যে পাট মজুত করার প্রবণতা। ফলে, পাটের দাম আকাশ ছুঁয়েছে।’’

সিটুর হুগলি জেলা সম্পাদক তীর্থঙ্কর রায়ের দাবি, ‘‘ছোট, মাঝারি, বড় মিলিয়ে হুগলি শিল্পাঞ্চলে গত ১৫ বছরে ১২০টির মতো কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তৃণমূল সরকার শিল্পের জমি আবাসন করার জন্য বিক্রি করে দিয়েছে।’’ সিঙ্গুরের তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্নার দাবি, ‘‘দিল্লি রোড ও দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের দু’ধারে অজস্র শিল্প গড়ে উঠেছে গত ১৫ বছরে। বিরোধীরা সে কথা বলেন না কেন?’’ যদিও শ্রীরামপুরের প্রার্থী, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘‘হুগলি শিল্পাঞ্চলে যেটুকু শিল্প রয়েছে, তা সবই কংগ্রেসের আমলে তৈরি। বামেদের সময়ে চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোনো বন্ধ হয়েছে। তৃণমূলের আমলে শিল্পের জমি বিক্রি হয়েছে।’’

ভোটমুখী হুগলিতে শিল্পকে কেন্দ্রে রেখেই চলছে আলোচনা। সিঙ্গুরের ‘মাতঙ্গিনী’ বলছেন, ‘‘কোমরে পুলিশের লাঠির ঘা আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। তবু বলব, শিল্পের জন্য যদি প্রয়োজন হয়, চাষযোগ্য বাদে বাকি জমি দিতে আপত্তি নেই।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন