আইপিএস অফিসার। দুঁদে পুলিশকর্তা। ছিলেন বিহারের ডিজিপি। সেই পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে রাজনীতির ময়দান ঘুরে তিনি এখন আধ্যাত্মিকতার পথে। ভক্তদের নিয়ম করে প্রবচন শোনান। নানা জায়গায় যান। সেই গুপ্তেশ্বর পাণ্ডে আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এক চাঞ্চল্যকর এবং বিতর্কিত দাবিতে বিহারের প্রাক্তন ডিজিপি গুপ্তেশ্বর অভিযোগ করেছেন, রাজ্যের কুখ্যাত অপহরণচক্রের উৎপত্তি অপরাধজগতের কোনও পাণ্ডার হাতে শুরু হয়নি। বরং তা পুলিশেরই একটি ভুল কৌশলের ফল। বিহারে অপহরণের ঘটনা শুরু করার জন্য অন্ধ্রপ্রদেশ ক্যাডারের এক আইপিএস কর্তার বিরুদ্ধেও আঙুল তুলেছেন তিনি।
সম্প্রতি পটনা বিমানবন্দরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় গুপ্তেশ্বর দাবি করেন, বিহারের এই অপহরণ প্রবণতার মূল গেঁথে রয়েছে সেই সময়ে, যখন পশ্চিম চম্পারণ জেলার বেতিয়া এবং বাঘা অঞ্চল ঘন ঘন ডাকাতির কবলে পড়েছিল এবং একাধিক ডাকাতদল সক্রিয় ছিল ওই অঞ্চলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারের তরফে পুলিশের উপর ব্যাপক চাপ ছিল। বেতিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) অপরাধ দমনে তাঁর ব্যর্থতার জন্য তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। গুপ্তেশ্বরের মতে, সে সময়েই ডাকাতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন এসপি অপরাধীদের সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়ায় আসেন।
বিহারের প্রাক্তন ডিজিপির দাবি, ওই কর্তা ডাকাতদলগুলিকে সরাসরি সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ডাকাতির ক্ষেত্রে পুলিশের কড়াকড়ি ছিল। তাই ডাকাতির পরিবর্তে দলগুলিকে মুক্তিপণের জন্য ধনীদের অপহরণ করার পরামর্শ দেন ওই আইপিএস অফিসার।
গুপ্তেশ্বরের দাবি, ওই আইপিএস কর্তার অপরাধীদের দেওয়া পরামর্শের কারণেই বিহারে অপহরণ একটি সংগঠিত অপরাধ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী কালে রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অপরাধের জাল।
যদিও কোন আইপিএস কর্তার বদান্যতায় বিহারের অপহরণ এবং মুক্তিপণের এত রমরমা হয়েছিল, তা প্রকাশ করেননি প্রাক্তন পুলিশকর্তা। গুপ্তেশ্বর শুধু দাবি করেছেন, ওই আইপিএস কর্তা অন্ধ্রপ্রদেশ ক্যাডারের এবং সে সময় বিহারে ডেপুটেশনে ছিলেন।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় অপহরণ সংক্রান্ত অপরাধের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারকে কৃতিত্বও দিয়েছেন গুপ্তেশ্বর। তাঁর দাবি, নীতীশ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বগ্রহণের পর কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং পুলিশি সংস্কার করা হয়েছে। ফলে অপহরণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে এবং রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি ঘটেছে। তবে আইপিএস কর্তাকে নিয়ে গুপ্তেশ্বরের দাবি স্বাভাবিক ভাবেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বিহারে। বিতর্ক তৈরি হয়েছে। খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন গুপ্তেশ্বর।
এই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিক বার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন গুপ্তেশ্বর। ২০২০ সালে বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের মৃত্যুর সময় সারা দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিহার পুলিশের প্রাক্তন ডিজিপি।
সুশান্তের মৃত্যুর পর টেলিভিশনের পর্দায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন গুপ্তেশ্বর। সুশান্তের মৃত্যুর বিচার চেয়ে সরব হয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে সুশান্তের মৃত্যুর নেপথ্যে অনেক তত্ত্বের কথাও শোনা গিয়েছিল।
সুশান্তের মৃত্যুর ঘটনায় পটনায় একটি এফআইআর দায়ের করারও অনুমতি দেন ১৯৮৭ ব্যাচের আইপিএস কর্তা গুপ্তেশ্বর। মামলাটি তদন্ত করার জন্য পটনা থেকে চার জন পুলিশ সদস্যের একটি দল মুম্বইয়ে পাঠান তিনি, যা বিহার এবং মহারাষ্ট্র সরকারের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জন্ম দিয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট মহারাষ্ট্র সরকারের আপত্তি অগ্রাহ্য করে সুশান্ত সিংহের মৃত্যুর মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল। মহারাষ্ট্র সরকারের এ-ও যুক্তি ছিল, যেহেতু মৃত্যুটি মুম্বইয়ে ঘটেছে, তাই পটনায় এফআইআর দায়ের করার অধিকার বিহার পুলিশের নেই। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত বিহার পুলিশের এফআইআর দায়ের করার অধিকার বহাল রাখে।
গুপ্তেশ্বরকে নিয়ে সে সময় হইচই পড়ে গিয়েছিল বিহার জুড়ে। তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছোয়। সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়োও প্রকাশিত হয় ওই সময়। মিউজ়িক ভিডিয়োটিতে গুপ্তেশ্বরকে ‘বিহারের রবিন হুড’ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছিল। বিহারের প্রাক্তন ডিজিপি নিজেও ওই ভিডিয়োয় ছিলেন।
এর পর ২০২০ সালে বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে ডিজিপি পদ থেকে স্বেচ্ছাবসর নেন গুপ্তেশ্বর। যোগ দেন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের দল জেডিইউ-এ। আশা ছিল, নিজের শহর বক্সার থেকে টিকিট পাওয়ার।
নীতীশের বাসভবনে গুপ্তেশ্বরের জেডিইউ দলে যোগদানের ছবি সে সময় সমাজমাধ্যমে ছেয়ে গিয়েছিল। দলে যোগ দিয়েই বক্সারে জেডিইউ কর্মীদের সঙ্গে একের পর এক সভা করেছিলেন প্রাক্তন পুলিশকর্তা।
তবে এনডিএ জোটের কারণে বক্সার আসনটি বিজেপির ভাগে যায়। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে টিকিট পাওয়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে যায় গুপ্তেশ্বরের। মজার বিষয় হল, বক্সারের আসনে এনডিএ-র হয়ে টিকিট পান অন্য এক প্রাক্তন পুলিশকর্মী সুনীল কুমার।
রাজনীতিতে পা রাখার জন্য গুপ্তেশ্বরের সেটিই প্রথম ‘ব্যর্থ প্রচেষ্টা’ ছিল না। ২০০৯ সালেও বক্সার থেকে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিট পাওয়ার আশায় পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। বিজেপি টিকিট না দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ তাঁকে চাকরিতে পুনর্বহাল হতে সাহায্য করেছিলেন। তবে ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর আর চাকরিতে ফেরেননি গুপ্তেশ্বর।
টিকিট না পেয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান গুপ্তেশ্বর। পা বাড়ান আধ্যাত্মিক জগতের পথে। গুপ্তেশ্বরের দাবি, ভগবানের সেবাতেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি। তবে পুলিশে চাকরি করার সময়েও মন্দির পরিদর্শনের প্রতি তাঁর ভালবাসার জন্য পরিচিত ছিলেন গুপ্তেশ্বর।
বর্তমানে আধ্যাত্মিকতাতেই ‘ডুবে’ রয়েছেন গুপ্তেশ্বর। প্রবচক হিসাবে সারা বছর অযোধ্যা, মথুরা এবং বারাণসীর মতো জায়গায় ঘুরে বেড়ান তিনি। ধর্মোপদেশ দেন ভক্তদের। মনে করা হয়, গুপ্তেশ্বরই বিহার পুলিশের প্রথম কর্তা যিনি পুলিশ থেকে প্রবচক হয়েছেন।
বিহারের প্রাক্তন মুখ্য সচিব ভিএস দুবে এক বার সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, “আমি আইএএস এবং আইপিএস অফিসারদের রাজনীতিতে যেতে দেখেছি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পরে ধর্মকর্মেও মন দিয়েছেন। কিন্তু গুপ্তেশ্বরের ধর্ম বিষয়ে খুব ভাল জ্ঞান রয়েছে। আমি মনে করি তিনি প্রবচক হিসাবে সফল হবেন।” সেই গুপ্তেশ্বরই বিহারের অপহরণচক্র নিয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি তুলে আবার খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন।