নিতিন নবীন। ছবি: সংগৃহীত।
পর পর দু’দিন ‘ধমক’! তা-ও খোদ সর্বভারতীয় সভাপতির কাছ থেকে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল, বকাঝকার মূল লক্ষ্য শুধু প্রবাসীরা। অর্থাৎ, নির্বাচনের জন্য ভিন্রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে আসা বিজেপি পদাধিকারীরা। কিন্তু পরে স্পষ্ট হয়েছে যে, নিতিন নবীনের একটি ‘তির’ একসঙ্গে তিনটি ‘লক্ষ্যভেদ’ করেছে। প্রবাসীদের মধ্যে যাঁরা ‘ফাঁকি’ দিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ, তাঁরা সতর্ক হয়ে গিয়েছেন। রাজ্য বিজেপির যে অংশ এই প্রবাসীদের নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন, তাঁরা খুশি হয়েছেন। আর রাজ্য বিজেপি বিভিন্ন এলাকায় যে সব সমস্যা সামলাতে পারছিল না, প্রবাসীরা তা দ্রুত সামলে নেওয়ার কাজে মন দিয়েছেন।
২৪ এবং ২৫ মার্চ পশ্চিমবঙ্গ সফরে ছিলেন নিতিন। দলের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে তিনি দু’দিন ধরে লাগাতার একগুচ্ছ বৈঠক করেন। পর পর দু’দিনই একটি করে বৈঠকে প্রবাসী নেতাদের উদ্দেশে তিনি সতর্কবার্তা দেন। প্রথম দিন কলকাতা ও হাওড়া-হুগলি-মেদিনীপুর জ়োনের জেলা নেতৃত্ব, বিভাগ নেতৃত্ব ও প্রার্থীদের নিয়ে ডাকা বৈঠকে। দ্বিতীয় দিন মহিলা, যুব-সহ বিভিন্ন শাখা সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা বৈঠকে। দল এবং দলের শাখা সংগঠনগুলির জন্য দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিভিন্ন স্তরের ‘প্রবাসী প্রভারী’রা এসেছেন। কেউ কাজ করছেন জ়োন স্তরে। কেউ বিভাগ, জেলা, বিধানসভা স্তরে। কেউ কাজ করছেন মূল দলের হয়ে। কেউ কাজ করছেন কোনও শাখা সংগঠনের হয়ে। নিতিন তাঁদের উদ্দেশে বার্তা দেন, যদি এখানে কাজ করতে ভাল না লাগে, চলে যেতে পারেন। থাকতে চাইলে পরিশ্রম করতে হবে। প্রয়োজনে ‘বিনিদ্র রজনী’ কাটাতে হবে। নিতিন মনে করিয়ে দেন, এখানে প্রবাসীরা নির্বাচন কর্মী হিসাবে এসেছেন, ছুটি কাটাতে আসেননি। তাঁর কথায়, ‘‘কেউ যেন মনে না-করেন যে, এটা ৮টা-৫টার ডিউটি।’’ রাতে চার-পাঁচ ঘণ্টার বেশি না-ঘুমানোর পরামর্শও দেন তিনি।
বিজেপির একটি সূত্রের ব্যাখ্যা, একে ‘ধমক’ বা ‘তিরস্কার’ না বলাই ভাল। বরং বলা যেতে পারে, যাঁরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তাঁদের নিতিন মনে করিয়ে দিয়েছেন, এখন ক্লান্তির সময় নয়। উত্তর ২৪ পরগনার এক বিজেপি নেতার কথায়, ‘‘প্রবাসীরা কেউ কাজ করছেন না, এমন ধারণা ঠিক নয়। অধিকাংশই উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন। মাসের পর মাস পশ্চিমবঙ্গে পড়ে রয়েছেন। কেউ কেউ ফাঁকি দিচ্ছেন বা ছুটি নিয়ে চলে যাচ্ছেন সে কথা ঠিক। সতর্কবার্তাটা তাঁদের উদ্দেশেই ছিল।’’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি সাংগঠনিক জেলা সামলানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নেতার বক্তব্য, ‘‘এমন কিছু প্রবাসী এসেছিলেন, যাঁরা অল্প দিনেই পালিয়ে গিয়েছেন।’’ ওই নেতার কথায়, ‘‘খাস দিল্লির বাসিন্দা। পুরোদস্তুর শহুরে জীবনে অভ্যস্ত। সুন্দরবন অঞ্চলের এক বিধানসভার দায়িত্ব তাঁর উপরে পড়েছিল। মাসের পর মাস সেই বিধানসভা এলাকাতেই তাঁকে থাকতে হত। না-পেয়েছেন পছন্দমতো থাকার জায়গা, না-পেয়েছেন অভ্যাসের খাবার। তাই থাকতে পারেননি।’’ কিন্তু ‘পলাতক’ প্রবাসীর পরিবর্ত হিসাবে যিনি এসেছেন, তিনি আবার পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই কাজ করছেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি।
তবে দুই পরগনার এই দুই বিজেপি নেতার মতো রাজ্য বিজেপির প্রত্যেকেই যে প্রবাসী ‘কার্যকর্তা’দের আগমনে এতটা সন্তুষ্ট, তা নয়। ভিন্রাজ্য থেকে আসা এই নেতাদের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাস ধরে বিজেপির রাজ্য দফতরেই বেশ কয়েক জনকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছিল। প্রবাসীরা কোথায় থাকবেন, তাঁরা কী খাবেন, তাঁদের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী রাঁধুনির ব্যবস্থা কী ভাবে হবে, তাঁদের যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা কে সামলাবেন— এমন নানা দায়দায়িত্ব রাজ্য বিজেপির উপরেই পড়েছে। সেই অতিরিক্ত কাজের ‘বোঝা’ মাথায় নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের ‘আপত্তি’ ছিল। যে প্রবাসীদের চাহিদা একটু বেশি, তাঁদের দেখভালের ক্ষেত্রে সেই ‘আপত্তি’ পর্যবসিত হচ্ছিল ‘ক্ষোভে’।
এই পরিস্থিতির খবর নিতিনের কাছেও পৌঁছেছিল। তিনি সম্ভবত বুঝেছিলেন, আগামী দেড় মাস এই ‘ক্ষোভ’ বহন করেই কাজ করতে যদি রাজ্য বিজেপি-কে বাধ্য করা হয়, তা হলে ক্ষোভের বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। তাই পর পর দু’দিন নিতিন রাজ্য নেতাদের সামনেই ‘ধমক’ দিয়েছেন প্রবাসীদের। তাতে প্রবাসীরা তো সতর্ক হয়েছেনই। যাঁরা ফুঁসছিলেন, তাঁদের ‘ক্ষোভ’ও প্রশমিত হয়েছে।
এক পক্ষকে সতর্ক করা আর এক পক্ষকে প্রশমিত করা ছাড়া একটি তৃতীয় কাজও করেছে নিতিনের ‘ধমক’। প্রার্থিতালিকা ঘোষিত হওয়ার পরে যে সব আসনের বিজেপি কর্মীরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিলেন, সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ গতি পেয়েছে। প্রবাসীরা সে কাজ আগে থেকেই শুরু করেছিলেন। কারণ, পছন্দের নেতা টিকিট না-পাওয়ায় যে কর্মীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন, তাঁদের প্রাথমিক রাগ গিয়ে পড়ছিল জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের উপরেই। অনেকে প্রকাশ্যে জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও শুরু করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আসনে দলের বিবদমান অংশগুলিকে স্থানীয় নেতারা যে এক টেবিলে আনতে পারবেন না, তা বোঝাই যাচ্ছিল। তাই প্রবাসী নেতাদের সে কাজে নামানো হয়েছিল। বেশ কিছু আসনে বিজেপির দুই গোষ্ঠীর মধ্যে মধ্যস্থতা করে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে তাঁরা সফলও হচ্ছিলেন। নিতিনের সফরের পরে সে কাজে প্রবাসীরা আরও বেশি করে মন দিয়েছেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর। কারণ, স্থানীয় স্তরের এই মধ্যস্থতার কাজে প্রবাসীরা এখনও পর্যন্ত স্থানীয় বা রাজ্য নেতাদের চেয়ে বেশি সফল। তাই প্রবাসীদের অনেকেই সর্বভারতীয় সভাপতির ‘ধমক’ শোনার পরে দ্রুত সাফল্য দেখানোর বিষয়ে বেশি করে মন দিয়েছেন। তার ফলে প্রার্থিতালিকা কেন্দ্রিক অসন্তোষ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সুবিধা হচ্ছে বলে বিজেপি সূত্রের দাবি।