West Bengal Elections 2026

দিনমজুরিতে কেন ভরসা ওড়িশা, খোঁচা বিরোধীদের

কেশিয়াড়ি, দাঁতন, নারায়ণগড়ের মতো বিধানসভায় ঘুরতে ঘুরতে জানা গেল, এই সব ব্লকেই বেশি দিনমজুরের বসবাস। রয়েছে ঝাড়গ্রামের কাছে সাঁকরাইল কিংবা ওড়িশার লাগোয়া নয়াগ্রামের মতো ব্লকও।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১৬
Share:

এ ভাবেই দিন মজুরির কাজে যান দাঁতন, কেশিয়াড়ি, নারায়ণগড়ের মানুষ। — ফাইল চিত্র।

এখানকার গ্রামের মিনি অসমের চা বাগানে যায় না। মিনিকে কেউ অসমে যাওয়ার জন্য বলেও না। এখানকার মিনি কটক যায়, বালেশ্বর যায়। ধান রোপণের সময়ে মিনি কিংবা মিনির প্রিয় জন দলে দলে ছোট লরিতে সওয়ার হয়ে বসে কাকভোরে। রোজগারের সন্ধান দেন স্থানীয় দালাল। সকাল থাকতে পড়শি রাজ্য ওড়িশায় পৌঁছে সারা দিন মাঠে, বাজারে দিন মজুরির কাজ করে। তার পরে বিকেলে, সন্ধ্যায় সেই ছোট লরিতে চেপে মিনির দল গ্রামে ফেরে, দু’চোখের পাতা এক করে।

এই কাহিনী পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি, দাঁতন, নারায়ণগড়ের মতো বিধানসভার প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকার বহু মানুষের। পেটের দায়ে ঔপনিবেশিক আমলে এক সময়ে দলে দলে আদিবাসীরা আড়কাঠির মাধ্যমে চালান হয়ে পৌঁছে যেতেন অসমের চা বাগানে। সেখানে আদিবাসীরা গান বেঁধেছিলেন, ‘চল মিনি আসাম যাব, দেশে বড় দুখ রে।’

নারায়ণগড়ের বেলদা স্টেশনের চায়ের দোকানদার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘‘এখানে কি দুঃখ কিছু কম আছে? গ্রামে কাজ নেই। কলকারখানা ধুঁকে ধুঁকে চলছে, নয়তো বন্ধ। বড় কারখানায় স্থানীয় লোক নেয় না। রোজ কাকভোরের লোকাল ট্রেনে দলে দলে মানুষ চলে যান ওড়িশায় দিনমজুরি খাটতে। ফিরে আসেন বিকেলে। না হলে পেট চলবে কী করে?’’

অসমের চা বাগানে তৈরি সেই লোকগানের সঙ্গে এই সব এলাকার তফাত এটাই যে এখানে আড়কাঠি কিংবা শ্রমিক নিয়ে অন্য রাজ্যে যাওয়ার দালালেরা এই সব গরিব মানুষের কাছে ভগবান, এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। কেশিয়াড়ির বাসিন্দা সুজয় মাইতি নিজে লোক জোগাড় করে ভিন্ রাজ্যে খাটাতে নিয়ে যান। কারণ, গ্রামে বছরে হাতে গোনা সময়ে ধান রোপণের কাজ থাকে। যা কাজ হয়, তাতে সংসার চলে না। সুজয়ের কথায়, ‘‘এ রাজ্যের লাগায়ো ওড়িশার চন্দনেশ্বর, কটকের মতো জায়গা থেকে কাজের খবর আসে ওই দিকের দালাল মারফত। এখান থেকে আমরা লোকজন নিয়ে যাই। দৈনিক পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচশো টাকা মজুরি পান শ্রমিকেরা।’’

আগামী ২৩ এপ্রিল এই সব এলাকায় ভোট। উদাসীন অতি দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষদের অনেকেই জানাচ্ছেন, সরকারি ভাতার সামান্য কিছু টাকায় সংসার চলে না। চাকরির কোনও সংস্থান নেই। বন্ধ হয়ে গিয়েছে একশো দিনের কাজও। ফলে নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। যে কারণে রোজ সকালে দিনমজুরের কাজে ওড়িশায় ছুটে যাওয়া। পরিবহণ বলতে কখনও লোকাল ট্রেন, কখনও ছোট লরি।

কেশিয়াড়ি, দাঁতন, নারায়ণগড়ের মতো বিধানসভায় ঘুরতে ঘুরতে জানা গেল, এই সব ব্লকেই বেশি দিনমজুরের বসবাস। রয়েছে ঝাড়গ্রামের কাছে সাঁকরাইল কিংবা ওড়িশার লাগোয়া নয়াগ্রামের মতো ব্লকও। স্থানীয় মানুষ জানাচ্ছেন, মূলত ধান রোপণের সময়ে গ্রামে চাষবাসের জন্য খেতে যা কাজ থাকে, সেটা সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে হয়ে যায়। তার বাইরেও আরও অনেক ধরনের শ্রমিকের কাজ থাকে ওড়িশায়। যাতায়াত আর দালালকে দেওয়ার পরেও তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো টাকা সঞ্চয় হয়।

এ বার এখানে বেকারত্বের পাশাপাশি দিনমজুরি করতে লোকজনের পড়শি রাজ্যে ছোটার সমস্যাকে বিজেপি এবং বামফ্রন্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। নারায়ণগড় কেন্দ্রের সিপিএম নেতা তথা বামফ্রন্টের প্রার্থী তাপস সিংহকে দেখা গেল কাঠফাটা দুপুরে গ্রামের রাস্তায় এই নিয়ে প্রচার করতে। তাপসের কথায়, ‘‘কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের কারণে একশো দিনের কাজও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারে কত টাকা হয় যে মানুষের পেট চলবে! লরি, ট্রেনে চেপে মানুষ এখানে দিনমজুরির কাজ করতে যান। আমরা এটাই বোঝানোর চেষ্টা করছি। তার সঙ্গে রাস্তাঘাট, পানীয় জলের সমস্যা, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবের মতো একাধিক বিষয় রয়েছে।’’

কেশিয়াড়ির সুকুমার হাঁসদা, নারায়ণগড়ের শুকরা সিংহের ওড়িশার নিত্যযাত্রী হয়ে দিনমজুরি করেই রোজগার হয়। তাঁরা জানান, ধান রোপণের সময়ে মূলত শ্রমিকদের চাহিদা তুঙ্গে থাকে পড়শি রাজ্যে। ধান কাটা হয় যন্ত্রে। তবে অনেক জায়গায় ধান কাটার শ্রমিকেরও চাহিদা থাকে। যে কারণে সারা বছর রোজগারের সুযোগ রয়েছে। তাই ধান রোপণের সময়ে এই সব এলাকা থেকে দু থেকে আড়াই হাজার মানুষ প্রতি দিন দিনমজুরির কাজে যান।

বিজেপির কেশিয়াড়ির প্রার্থী ভদ্র হেমব্রমের অভিযোগ, কর্মসংস্থানের কোনও ব্যবস্থা তৃণমূল এখানে করেনি। তিনি বলেন, ‘‘এখানে যা চাষের কাজ হয়, তাতে আট-দশ দিন পরে লোকের হাতে কাজ থাকে না। তখন বাড়িতে বসে থাকলে তো পেট চলবে না। আমরা ইস্তাহারে ঘোষণা করেছি ক্ষমতায় এলে সুবর্ণরেখা নদীর পাশে চাষের ক্ষেত্রের উন্নয়ন করব। চাষির জন্য হিমঘর তৈরি করব। একইসঙ্গে মহিলারা যাতে হস্তশিল্পের কাজ করে স্বনির্ভর হতে পারেন, সেটাও দেখব। যাতে সংসার ফেলে তাঁদের পড়শি রাজ্যে না ছুটতে হয়।’’

কিন্তু বামফ্রন্ট তো অভিযোগ করছে যে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতে একশো দিনের কাজ বন্ধ হওয়ার পরে মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছ? নারায়ণগড়ের বিজেপি প্রার্থী রমাপ্রসাদ গিরির দাবি, ‘‘একশো দিনের কাজের টাকা তৃণমূল চুরি করেছে। মানুষ তাঁর প্রাপ্য পাননি। যাঁরা এ ভাবে দিনমজুরি করছেন, তাঁদের অনেকে সঙ্গে নুন মেখে খান। তৃণমূল এঁদেরও লুট করেছে।’’

যদিও পশ্চিম মেদিনীপুরের তৃণমূলের জেলা সভাধিপতি তথা নারায়ণগড়ের তৃণমূল প্রার্থী প্রতিভারানি মাইতির দাবি, জেলায় রোজগারের যথেচ্ছ ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘অজস্র কারখানা রয়েছে এখানে। যেখানে স্থানীয় মানুষ কাজ করেন। আপনি যে বিষয়টি বলছেন, সেটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে যাওয়ার মতো। এ দিকে কাজের অভাব নেই। স্থানীয়েরা কাজ পান। অনেকে হয়তো বাড়তি রোজগারের জন্য ওড়িশা যাচ্ছেন। রমাপ্রসাদবাবু নিজেই তো তৃণমূলে থাকার সময়ে দু’টি চাকরি জুটিয়েছিলেন।’’

আর কেশিয়াড়ির তৃণমূল প্রার্থী রামজীবন মান্ডি বলেন,‘‘এই ধরনের কোনও সমস্যা এ দিকে নেই। বরং ওড়িশার শ্রমিকেরা এখানে এসে কাজ করেন।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন