— প্রতীকী চিত্র।
গ্রামের বড় রাস্তার উপরেই হলুদ রঙের দোতলা বাড়ির দরজায় তালা ঝুলছে। তারই গা-ঘেঁষে ঢুকে যাওয়া রাস্তা ধরে কয়েক পা এগোলেই জঙ্গলে ভরা চত্বরে ‘অনিয়ম’-এর প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে পলেস্তারাহীন কয়েকটি ঘর। কোনওটির টালির ছাউনি উড়ে গিয়েছে। কোনওটি ভেঙে পড়েছে।
সামনে যেতেই দেখা গেল, ওই জায়গা ঘিরে রাখা পুলিশের সুরক্ষা ফিতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঘরের মেঝেতে পড়ে ধুলো মাখা, ভেজা সুতলি মোড়া চকলেট বোমা। এই বাজি কারখানাতেই গত জানুয়ারিতে বিস্ফোরণে এক নাবালক-সহ তিন জনের মৃত্যু হয়েছিল।
ঘটনাস্থল— বারুইপুর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের চম্পাহাটির হারাল গ্রাম। মাত্র চার মাস আগে ঠিক কোন জায়গায় বিস্ফোরণটা হয়েছিল? প্রশ্ন করলেই উত্তর এসেছে, ‘‘আর একটু সামনে।’’ আবার সামনের দিকে এগিয়ে শুনতে হয়েছে, ‘‘না, না। আর একটু পিছনের দিকে।’’ কেন এত লুকোচুরি? মাথায় ঘোমটা টেনে, শাড়ির খুঁট দাঁতে চেপে ধরা মহিলা চাপা স্বরে বললেন, ‘‘এ গ্রামের ঘরে ঘরে বাজির কারখানা। সব কি আর নিয়ম মেনে হয়?’’ এখনও কি বাজি তৈরি হচ্ছে? তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার মাঝেই বধূর উত্তর, ‘‘এখন ইলেকশন। তাই বন্ধ।’’
ভোট আসে, ভোট যায়। চম্পাহাটির এই চিত্র বদলায় না বলেই অভিযোগ। যদিও আতশবাজির আড়ালে হারালের ঘরে ঘরে তৈরি শব্দবাজির রমরমা ও নির্দিষ্ট লাইসেন্স ছাড়া বাজি তৈরিকে সরাসরি অবৈধ বা বেআইনি বলতে নারাজ রাজনীতির ডান-বাম, সব পক্ষই। রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, প্রতিটি দলই স্রেফ নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখার জন্য বিরূপ মন্তব্যে রাজি নয়। তবে গ্রামের শেষ প্রান্তে কাটাখাল সংলগ্ন এলাকায় বাজি হাবে ২০০টির মধ্যে ৫০টি দোকান ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া, বাজি উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট ক্লাস্টার তৈরি, দমকল কেন্দ্রের নির্মাণ প্রভৃতি শুরু হয়েছে বলেই দাবি বারুইপুর পূর্বের তৃণমূল প্রার্থী বিভাস সর্দারের।
কিন্তু ঘরের চার দেওয়াল, বাঁশবাগানের আড়ালে যেখানে একশো টাকার বারুদ কিনে অন্তত এক হাজার টাকার চকলেট বোমা বানানো হয়, সেখানকার লোকজন কি সরকারি জায়গায় আদৌ যাবেন? মেঠো পথে প্রচারের ফাঁকে সিপিএম প্রার্থী স্বপন নস্করের পাল্টা দাবি, ‘‘ক্লাস্টারের পরিকল্পনা আমাদের আমলের। আর, বাম আমলে বাজি শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছিল। তৃণমূল আসার পরে শুধু টাকার খেলা চলছে।’’ আর হারাল গ্রামে তাঁদের সমর্থকদের ইচ্ছাকৃত ভাবে বেআইনি বাজি তৈরিতে ফাঁসানো হয় বলে অভিযোগ করছেন বিজেপি প্রার্থী টুম্পা সর্দার।
দাবি, পাল্টা দাবি যা-ই থাকুক, ‘ভোট বড় বালাই’-এর রাজনীতিতে অবশ্য হারালকে ‘বাজি’ রাখতে চায় না কোনও পক্ষই। তাই, প্রচারেও তেমন ভাবে নেই বাজি কারবারের কথা। শুধু গ্রামের বাড়ির দেওয়ালে বিরোধীরা রং-তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে শিল্প এবং কর্মসংস্থানের স্লোগান।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-এ বারুইপুরের এই বিধানসভা কেন্দ্রে ৪৯ হাজার ৬৪১ ভোটে জিতেছিল তৃণমূল। তিন বছর পরে লোকসভায় অবশ্য সেই ব্যবধান কমে হয়েছিল ৪৮ হাজার ৭৭৬। সামান্য ওইফারাক নিয়ে যদিও ভাবতে নারাজ দলের শীর্ষ দুই নেতৃত্বেরই ঘনিষ্ঠ বিভাস। কারণ, স্থানীয় সংগঠনের সব স্তরে পারস্পরিক সম্পর্কের দৃঢ়তা। বারুইপুর পূর্বে প্রায় ৩৩ শতাংশসংখ্যালঘু ভোট রয়েছে। এ বারে সেই ভোটে ভাগ বসাতে আইএসএফ ও সিপিএমের জোট হলেও, তাতে আমল না দিয়ে বিভাস বলছেন, ‘‘উন্নয়ন, শান্তি, সম্প্রীতি দেখে মানুষ ভোট দেবেন।’’
সত্যিই কি তাই? খাকুড়দহ হাট, সরবেড়িয়া, সূর্যপুর হাট এলাকার মেঠো পথে হেঁটে যাওয়া লোকজন যে বলছেন ‘অন্য কথা’। পানীয় জলের সমস্যা থেকে স্থানীয় মেজো ও ছোট নেতাদের ‘দাদাগিরি’ যেন সেখানে বড় ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে সকলের অজানতেই!
যেমন ভাবে বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের কাছারিবাজার এলাকার মানুষজনের ক্ষোভ রয়েছে স্থায়ী বাজার তৈরি না হওয়া নিয়ে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাস্তার উপরে বসা ওই বাজারেই আসেন স্থানীয় চাষিরা। সেখান থেকেই পেয়ারা-সহ অন্যান্য ফল পাড়ি দেয় ভিন্ রাজ্যে। কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরলেও স্থায়ী বাজার, হিমঘর কিছুই তৈরি হয়নি। রাজ্যের আর পাঁচটা হেভিওয়েট কেন্দ্রের মতো এই বিধানসভা কেন্দ্রও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, খোদ বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। এ বারও তিনিই প্রার্থী।
কাছারিবাজারকেই তাঁর প্রচারের মূল ইস্যু করেছেন আইএসএফ ও সিপিএম জোটের প্রার্থী লাহেক আলি। তাঁর কথায়, ‘‘বার বার প্রতিশ্রুতি মিললেও কাজ হয়নি। তাই প্রচারে স্থায়ী বাজার, হিমঘর, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ইন্ডাস্ট্রি তৈরিতে বেশি জোর দিচ্ছি।’’ যদিও ওই সমস্ত প্রকল্প তাঁরা ইতিমধ্যেই ভাবনাচিন্তা করেছেন, সরকারি জায়গাও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে দাবি করছেন বিমান।
পোড় খাওয়া রাজনীতিক বিমান। তাই দলের অন্দরে স্থানীয় স্তরে ছোটখাটো ক্ষোভ থাকলেও তা সামাল দিতে তিনি সিদ্ধহস্ত হওয়ায়, ভোটে গোষ্ঠী-কাঁটার খোঁচা প্রত্যক্ষ ভাবে নেই বলেই পর্যবেক্ষণ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-এ এই বিধানসভায় ৬১ হাজার ৯১০ ভোটে জয়ী হয়েছিল শাসকদল।
লোকসভায় তা অনেকটাই কমে ব্যবধান দাঁড়িয়ে ছিল ৪০ হাজার ২৪৮। এ বার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার কারণে ঠিক কত নাম বাদ গিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলেই অভিযোগ করছেন বিমান। তবে সেটি জয়ের ফলাফলে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বলেও তাঁর দাবি। বরং প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক অটুট রেখে জয়ের ব্যবধান বাড়বে বলেই আশাবাদী তৃণমূল।
দাবি শুনে অবশ্য হাসছে পদ্ম শিবির। পুরসভা ও পঞ্চায়েত এলাকায় ঘেরা বারুইপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রে পুকুরের পাড় বাঁধানো নিয়ে দুর্নীতি, জলা ভরাট থেকে মাটি কাটা ঘিরে সিন্ডিকেটের রমরমা নিয়ে অভিযোগ তুলছে বিরোধী শিবির। সেই সূত্র ধরেই বিজেপি প্রার্থী বিশ্বজিৎ পালের আশা, ‘‘মানুষ এ বার দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।’’ যদিও রাজনৈতিক মহলের মতে, বারুইপুর পূর্ব ও পশ্চিম— দু’জায়গাতেই বিরোধীদের সংগঠন তত শক্তিশালী নয়। ফলে শুধু স্থানীয় অভাব-অভিযোগকে হাতিয়ার করে কে কতটা ‘ঝড়’ তুলতে পারবে, সেটা স্পষ্ট নয়।
যদিও পড়ন্ত বিকেলে কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে তেঁতুলিয়ার মাঠের পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ বললেন, ‘‘ঝড় আসছে!’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে