West Bengal Assembly Election 2026

এসআইআর আবহেও প্রশ্ন, মন্ত্রীমশাই জিতবেন তো!

২০২১ সালে ২২ হাজারের বেশি ভোটে জেতা বিপ্লবও মানছেন যে, এসআইআর আবহে ভোটের মার্জিন কমতে পারে। তবে ‘টেনেটুনে’ পাশ করবেন, তেমন ভাবছেন না। বরং, দাবি করছেন, ‘‘উন্নয়নের জোয়ারেই জিতব।’’

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১১
Share:

বিপ্লব মিত্র। ছবি: অমিত মোহান্ত।

আপনাদের মন্ত্রীমশাই জিতছেন?

প্রশ্ন শুনেই গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলেন তৃণমূলের জেলা স্তরের এক নেতা। গলায় জোর এনে বললেন, ‘‘অবশ্যই!’’ তার পরে গলা খাদে নামল। বললেন, ‘‘এসআইআর বড় ক্ষতি করেছে। মার্জিন অনেক কমবে। তবে, দাদা হয়তো টেনেটুনে...।’’

বিপ্লব মিত্র। হরিরামপুরের বিধায়ক, রাজ্যের ক্রেতা সুরক্ষা মন্ত্রী এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের রাজনীতিতে পোড়খাওয়া নেতা। কিন্তু ২০২১ সালে ২২ হাজারের বেশি ভোটে জেতা বিপ্লবও মানছেন যে, এসআইআর আবহে ভোটের মার্জিন কমতে পারে। তবে ‘টেনেটুনে’ পাশ করবেন, তেমন ভাবছেন না। বরং, দাবি করছেন, ‘‘উন্নয়নের জোয়ারেই জিতব।’’

‘‘কোথায় উন্নয়ন? বহিরাগত বিধায়ক হরিরামপুরের জন্য কিছুই করেননি! উনি গঙ্গারামপুরের লোক’’, বলছেন বিজেপি প্রার্থী দেবব্রত মজুমদার। হাওয়া ঘোরানোর লড়াইয়ে দেবব্রত গ্রামে-গ্রামে ঘুরে গাছতলায় চাটাই পেতে কর্মিসভা, মিছিল করছেন। একদা বাম জমানার মন্ত্রী নারায়ণ বিশ্বাসের কেন্দ্র হরিরামপুরে ২০১৬ সালেও সিপিএম জিতেছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে বামেদের ভোট গেরুয়া ঝুলিতে গিয়েছে। ‘‘এ বারও বামেদের ভোট আমরা পাব’’, আশাবাদী দেবব্রত। তবে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমে পড়েছেন শুভাশিস পাল ওরফে সোনা। একদা তৃণমূল নেতা সোনা পাল ২০২১ সালে বিজেপিতে ভিড়েছিলেন। এ বার ভোটে নেমেই তুড়ি মেরে জেতার কথা বলছেন। যদিও জেলার রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ‘‘সোনা জিতবেন না। তবে কয়েক হাজার ভোট টানলে পাশা বিজেপির পক্ষে উল্টোতে পারে।’’

আর রয়েছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। জেলার সব দলের নেতারাই মনে করেন, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব একাধিক আসনে বিপাকে ফেলতে পারে তৃণমূলকে। বিপ্লবের বিরুদ্ধেই দলের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। আবার বিপ্লব-ঘনিষ্ঠ, কুশমণ্ডির তৃণমূল প্রার্থীরেখা রায়কে নিয়ে আপত্তি করায় দলবল-সহ অন্য কেন্দ্রে প্রচারে পাঠানো হয়েছে ওই তল্লাটের টিকিট-প্রত্যাশী এক যুব নেতাকে। রেখা অবশ্য বলছেন, ‘‘সবাইকে নিয়েই চলি। কোনও দ্বন্দ্ব নেই।’’ ওই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী তাপসকুমার রায় ‘ডাকাবুকো’ যুব নেতা হিসাবে পরিচিত। তাঁর হাতিয়ার, দুর্নীতি-বিরোধী প্রচার ও সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি। এলাকায় গুঞ্জন, তৃণমূলের রাজবংশী ভোটেও বড় থাবা বসাতে পারেন তাপস।

দ্বন্দ্বের ছায়া তফসিলি জনজাতি সংরক্ষিত আসন তপনেও। গত বারও এই আসনে হেরেছিল তৃণমূল। এ বার তপনের তৃণমূল প্রার্থী চিন্তামণি বিহা দলে বিপ্লব-ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত। জেলা পরিষদ সভাধিপতি চিন্তামণি কেন বিধানসভার টিকিট পাবেন, সে প্রশ্ন উঠেছে দলেই। তৃণমূল নেতাদের একাংশের ব্যাখ্যা, ২০২৩ সালে তপনের দুই আদিবাসী মহিলাকে দলে ফেরানোর আগে বালুরঘাটে দণ্ডি কাটানো হয়েছিল। সে ক্ষত সারেনি। এ বার বলা হয়েছিল, তপনে সাঁওতাল সমাজ থেকে প্রার্থী দেওয়া হোক। কিন্তু আমল দেওয়া হয়নি। এক প্রাক্তন তৃণমূল জেলা সভাপতি মানছেন, ‘‘আমাদের সাঁওতাল ভোটে বিজেপির বুধরাই টুডু থাবা বসাতে পারেন!’’

গঙ্গারামপুরেও আঁক কষছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। ২০১১ সালে এই আসনে জিতেছিলেন জোড়া ফুলের সত্যেন্দ্রনাথ রায়। ২০১৬ সালে তিনি হারেন কংগ্রেসের গৌতম দাসের কাছে। গৌতম হাত ছেড়ে জোড়া ফুলে এসেছিলেন এবং সত্যেন্দ্রনাথ চলে যান বিজেপিতে। ২০২১-এ গৌতমকে সাড়ে চার হাজার ভোটে হারান সত্যেন্দ্রনাথ। জোড়া ফুল শিবিরই মানছে, ব্যক্তিগত ভোটের ঝুলি নিয়েই দল বদলেছেন সত্যেন্দ্রনাথ। পদ্মের পালে হাওয়াও আছে। সেই স্রোতের বিরুদ্ধে জেতার আশা নিয়ে লড়ছেন গৌতম। দলের মহিলা কর্মীদের বলছেন, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ‘দিদি’র প্রকল্প নিয়ে মানুষকে কাছে টানতে হবে। তবে বিপ্লবের ‘খাসতালুক’ গঙ্গারামপুরেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কাঁটায় রক্তক্ষরণ!

‘‘শুধু গঙ্গারামপুর কেন, জেলার সব শহরাঞ্চলেই বিজেপি বড় অঙ্কের লিড নেয়। পুরসভা দখলের পরেও কেন বিধানসভা-লোকসভায় হারছি, সে কথা দল বিবেচনা করেনি,’’ বলছেন অনেক তৃণমূল নেতা। বালুরঘাট কেন্দ্রেও এই শহুরে ভোট-ব্যাঙ্ক বড় ভরসা বিজেপির। এই কেন্দ্রে অবশ্য গত বারের জয়ী প্রার্থী অশোক লাহিড়ীকে এ বার টিকিট দেয়নি তারা। বরং, দলে যোগ দেওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যে প্রার্থী হয়েছেন আইনজীবী বিদ্যুৎকুমার রায়। তা নিয়ে বিজেপির অন্দরে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ-বিক্ষোভ। তার পরেও বালুরঘাট শহরের ভোটের হিসাব কি তৃণমূল প্রার্থী অর্পিতা ঘোষের জয়ের পথে বাধা হবে? একদা বালুরঘাটের সাংসদ অর্পিতার ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে ‘বিতর্কিত’ ভূমিকা নাগরিকদের অনেকেই মনে রেখেছেন। অর্পিতা বলছেন, ‘‘বড় মিছিল-সমাবেশের বদলে ছোট-ছোট কর্মিসভা, সাংগঠনিক বৈঠকে জোর দিচ্ছি।’’ তৃণমূল শিবির বলছে, হিলি এবং অন্য গ্রামীণ এলাকায় তৃণমূলের শক্তি বেশি। তবে বালুরঘাট শহরে বিজেপির যা ‘লিড’, তাতে এসআইআরের মতো কোনও কারণে বড় ধস না নামলে জেতার আশা কম।

এখানেই ফের প্রাসঙ্গিক বাম আমলের মন্ত্রী, অধুনা প্রয়াত আরএসপি নেতা বিশ্বনাথ চৌধুরী। এ বার কোদাল-বেলচার প্রার্থী বিশ্বনাথ-পুত্র অর্ণব। বালুরঘাটের খাদিমপুর বাজারে প্রচারে তাঁর আবেদন, ‘‘তৃণমূল হারলেও লক্ষ্মীর ভান্ডার বন্ধ হবে না। কিন্তু কর্মসংস্থান, সুস্থ সমাজের কথা ভেবে ভোট দিন।’’ প্রচারের মাঝেই ছুটে এলেন এক প্রবীণা। বললেন, ‘‘বিশ্বনাথদার ছেলে দাঁড়িয়েছে। আমি ভোট দেবই!’’ অর্ণব মানছেন, গত কয়েক বছরে জেলায় বামেদের সংগঠন দুর্বল হয়েছে, বামের ভোট রামে গিয়েছে। তবে বলছেন, ‘‘সংগঠনের শক্তি ফিরছে। ভোটও ফিরবে।’’ গৌড়বঙ্গের এই জেলার একাধিক আসনে বামেদের ভোট বাড়বে, এই আশায় বুক বাঁধছেন তৃণমূল নেতারাও। কুশমণ্ডির সাত বারের আরএসপি বিধায়ক নর্মদাচন্দ্র রায়ের ছেলে জ্যোতির্ময় এ বার প্রার্থী হয়েছেন। সেখানেও রামে যাওয়া ভোট বামে ফিরবে, আশা করছে জোড়া ফুল শিবির। ‘‘তপনের বাম প্রার্থী বাপ্পাই হরো কিন্তু ওজনদার! ভাল ভোট পেতে পারেন,’’ বলছেন জেলা তৃণমূলের এক ‘হেভিওয়েট’ নেতা।

এই জেলায় তৃণমূল সব থেকে বেশি নিশ্চিন্ত কুমারগঞ্জ কেন্দ্র নিয়ে। রাজ্যে পরিবর্তনের পরে এই আসনে তৃণমূল কখনও হারেনি। ২০২১ সালে প্রায় ২৯ হাজার ভোটে জিতেছিলেন তোরাফ হোসেন মণ্ডল। এ বার বাতিল ও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়থাকাদের তালিকা মিলিয়ে ৩২ হাজার ভোটার নিয়ে চিন্তায় শাসক শিবির। সমাবেশে জনসমাগমও আশাব্যঞ্জক নয়। যদিও তোরাফ বললেন, ‘‘জিতব! তবে জয়ের ব্যবধান অনেক কমবে।’’ সংখ্যালঘু প্রধান এই আসনে জেতার আশা আপাতত জোর গলায় ব্যক্ত করছেন না বিজেপি নেতারা।

২০২১ সালে এ জেলার ছ’টি আসনে সমানে-সমানে ছিল বিজেপি ও তৃণমূল। এ বার তৃণমূল জেলা সভাপতি সুভাষ ভাওয়াল বলছেন, ‘‘ফলাফল ভালই হবে।’’ হাসছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথাবালুরঘাটের বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার। বালুরঘাটের আসন নিয়ে দলের অন্দরের ক্ষোভকে আমল না দিয়ে বলছেন, ‘‘অশোক লাহিড়ীর সময়েও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এ বারেও ও সব মিটে যাবে।’’ এ বার জেলায় ৬-০ করাই সুকান্তের লক্ষ্য। বামেরা যে ভোট ফেরাতে পারবেন না, সে ব্যাপারেও এক রকম ‘নিশ্চিত’ তিনি। তবে তাঁর মুখে ঘুরেফিরে আসছে হরিরামপুর। হাতে ঘুষি মেরে বললেন, ‘‘মন্ত্রীমশাই কিন্তু জিতবেন না!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন