—প্রতীকী চিত্র।
‘‘ইতনা সান্নাটা কিঁউ হ্যায় ভাই?’’
বিধানসভা ভোটের আবহে হাওড়া সদরের উত্তর থেকে দক্ষিণে এমনই পরিস্থিতি। ভোটের দিন ঘোষণার পর থেকেই শাসক-বিরোধী সব দল যখন বর্ণাঢ্য মিছিলে ঢাক, তাসা, ডিজে বাজিয়ে এলাকা কাঁপাতে শুরু করেছে, তখন তাঁদের বাইরে অধিকাংশই প্রতিক্রিয়াহীন, নির্লিপ্ত। কেন? সেটা বুঝতে হাওড়া সদর ঘুরে দেখাগেল পরিস্থিতি।
উত্তর হাওড়ার সালকিয়ার ভৈরব ঘটক রোডের দোতলা ফ্ল্যাটে বসে মেয়ের কথা মনে করে অঝোরে কাঁদছিলেন সুচিত্রা দাস। ২০২৪ সালের ২ অগস্ট। বাড়ির সামনেই বৃষ্টির জমা জলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছিল এম এসসির প্রথম বর্ষের ছাত্রী পৌরবী দাসের। সুচিত্রা বলছিলেন, ‘‘ভোট আসবে যাবে, আমরা মেয়ে তো ফিরবে না!’’ পৌরবীর মায়ের মতোই নাতির মৃত্যু ভুলতে পারেন না দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্রের হরেকৃষ্ণ নগরের গণেশ খাসকেল। ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। সাড়ে তিন বছরের নাতি রূপমকে স্কুল থেকে নিয়ে নিজের টোটোয় চাপিয়ে ফিরছিলেন গণেশ। বাড়ির সামনেই ভাঙা রাস্তায় টোটো উল্টে তার নীচে চাপা পড়ে মারা যায় শিশুটি। ভোট নিয়ে প্রশ্ন করতেই জল ভরা চোখে গণেশ বললেন, ‘‘সেই রাস্তা আজও সারানো হয়নি।’’
অভিযোগ, মানুষের মৃত্যুও টনক নড়ায় না হাওড়া প্রশাসনের। তাই পৌরবীর পরেও ভৈরব ঘটক রোডের নিকাশি সংস্কার না-হওয়া অবস্থায় থাকে। ছোট্ট রূপমের জীবনের বিনিময়েও ফেরে না হরেকৃষ্ণ নগরের রাস্তার হাল। বালি থেকে দক্ষিণ হাওড়ায় ভোটে তাই বিরোধীদের অন্যতম ইসু বেহাল নিকাশি ওভাঙা রাস্তাঘাট।
২০১৩ থেকে ২০২৬। ১৩ বছরে দু’টি বিধানসভা নির্বাচন হয়ে তৃতীয়টি দোরগোড়ায়। অথচ, ২০১৩ সালের পরে বালি এবং হাওড়া পুরসভায় নির্বাচন হয়নি। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের পরে হাওড়ার ৬৬টি ও বালির ৩৬টি, মোট ১০২টি ওয়ার্ড গত ১৩ বছর ধরে জনপ্রতিনিধিহীন। পুর পরিষেবা শিকেয় ওঠার ছাপ হাওড়া জুড়ে স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বার ভোটে এসআইআরের মতোই বড় বিষয় পরিষেবা নিয়ে বালি ও হাওড়ার বাসিন্দাদের ক্ষোভ।
সঙ্গে যোগ হয়েছে বালি থেকে দক্ষিণ হাওড়া পর্যন্ত বেআইনি বহুতল, তোলাবাজি, কাটমানি, পুকুর ভরাট, সিন্ডিকেট আর দুষ্কৃতীমূলক কার্যকলাপের অভিযোগ।
বালির বাসিন্দা, রাজ্যের প্রাক্তন অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল অশোক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সচেতন নাগরিক ভাবছেন, যেখানে পরিষেবা পাই না, সেখানে কেন ভোট দেব? আর কাকে ভোট দেব? মানুষ এ বার চুপ এই কারণেই।’’ দক্ষিণ হাওড়ার তৃণমূলের কার্যালয়ে বসে এক যুব নেতার স্বীকারোক্তি, ‘‘প্রার্থীর সঙ্গে প্রচারে বেরিয়ে বুঝতে পারছি, মানুষ ভোট নিয়ে নির্বিকার।’’
২০২১ পর্যন্ত হাওড়া জেলার ১৬টি বিধানসভা কেন্দ্র বিরোধী শূন্য। ওই বছর নির্বাচনে বিরোধী বিজেপির প্রার্থীর থেকে সব থেকে কম ব্যবধানে জেতা দু’টি আসন বালি ও উত্তর হাওড়া। বালিতে তৃণমূল জিতেছিল ৬২৩৭ ভোটে, উত্তর হাওড়ায় জিতেছিল ৫৫২২ ভোটে। বালিতে এসআইআরের পরে ভোটার বাদ যাওয়ার আশঙ্কা ৮-৯ হাজার। অন্য দিকে, উত্তর হাওড়ায় বাদ গিয়েছে ১১-১২ হাজার ভোটার। বাদের এই সংখ্যা ইভিএমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।
গত নির্বাচনে বালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন রানা চট্টোপাধ্যায়। এ বার রানা বনাম যুব নেতা কৈলাস শর্মার গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জয়ী কৈলাস। রানাকে শিবপুর কেন্দ্রে সরানো হয়েছে। বালি কেন্দ্রে টিকিট পেয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের প্রার্থী কৈলাস। কৈলাসের দাবি, ‘‘প্রার্থী হয়েই বালিকে জঞ্জালমুক্ত করেছি। রাস্তা করেছি। বালির ছেলেকেই তাই মানুষ ভোট দেবেন।’’ উত্তর হাওড়ায় অবশ্য তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা বিদায়ী বিধায়ক গৌতম চৌধুরীর উপরেই আস্থা রেখেছে দল। প্রার্থী বলছেন, ‘‘গত পাঁচ বছর এই কেন্দ্রের মানুষের পাশে থেকেছি। নিকাশি, রাস্তাঘাট সব কাজ করেছি। মানুষের রায় মাথা পেতে নেব।’’
৬ মার্চ কালবৈশাখীর পরে জলমগ্ন জিটি রোডের ছবি দেখিয়ে উত্তর হাওড়ার বিজেপি প্রার্থী উমেশের বক্তব্য, ‘‘গত পাঁচ বছরে এই কেন্দ্রের বিধায়ক ও এ বারের প্রার্থী কতটা মানুষের পাশে থেকেছেন, আধ ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বোঝা গিয়েছে। ১৫ বছর ধরে পুরসভার নিকাশির দায়িত্বে থেকে কী করেছেন তিনি?’’
বালি-সহ উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ হাওড়ায় ভেঙে পড়া পুর পরিষেবা এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোলাবাজি ও দুষ্কৃতী-রাজকে সম্বল করে প্রচারে নেমেছে বিরোধী দল বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস। বালির বিজেপি প্রার্থী, বিজেপির রাজ্য নেতা সঞ্জয় সিংহ বলছেন, ‘‘বালিতে গত কয়েক বছর ধরে দুষ্কৃতীরাজ, তোলাবাজি বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে জঞ্জালের স্তূপ।’’
এক সময়ের লাল দুর্গ বালিতে সিপিএম প্রার্থী করেছে প্রবীণ নেতা শঙ্কর মৈত্রকে। তাঁর দাবি, ‘‘অর্থ আর পেশিশক্তির জোরে বালি দখলের চেষ্টা করছে তৃণমূল-বিজেপি। মানুষ তাই ফের লালেই ফিরেছেন।’’
২০২১ সালে হাওড়া জেলায় তৃণমূল ভোট পেয়েছিল ৪ লক্ষ ৫৪ হাজার ৮৭৩টি। এ বার এসআইআরে বাদ পড়েছে ৫ লক্ষ ৯৫ হাজার ৯১৬ জনের নাম। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হওয়ায় চাপ বেড়েছে তৃণমূলের। শুধু তাই নয়, অন্দরমহলেও গোষ্ঠী কোন্দলের জেরে সংগঠন যে নড়বড়ে, মানছেন তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা। প্রথম সারির এক নেতা বলছেন, ‘‘জেলার সংগঠন শেষ। কিছু তোলাবাজ, দুষ্কৃতী দলে ঢুকে ক্ষতি করেছে।’’
হাওড়ার জীবনরেখা জিটি রোড। যার দু’পাশে বালি থেকে দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্র। প্রতিটি কেন্দ্রে জমি অগ্নিমূল্য। সেখান থেকেই গোটা হাওড়া জুড়ে শুরু হয়েছে প্রোমোটার-রাজ। তিন ফুট গলিতে মাথা তুলেছে ১০তলা বেআইনি বাড়ি। বদ্ধ নিকাশি। তৈরি হয়েছে নির্মাণ-সিন্ডিকেট। যা নিয়ে প্রায়ই খুনখারাপি হয়। দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্রের গঙ্গার ধারে বহুতলের সাম্রাজ্য। বিরোধীদের প্রচার, বেআইনি বাড়িথেকেই নেতাদের পকেটে আসছে কাটমানি।
যদিও এই সব প্রচার নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে মত হাওড়ার তিন বারের বিধায়ক মন্ত্রী অরূপ রায়ের। মধ্য হাওড়ার এই প্রার্থী বলছেন, ‘‘এসআইআর নিয়ে বিজেপি যা করছে, তাতে মানুষ বিরক্ত। মানুষ দিদির উপরেই আস্থা রাখবেন।’’
বিরোধীদের অভিযোগ, এত বছরেও দক্ষিণ হাওড়ার একমাত্র রাস্তা আন্দুল রোড দখলমুক্ত করে চওড়া হয়নি। বকুলতলার যানজট কাটাতে তৈরি হয়নি একটিও উড়ালপুল। সামান্য বৃষ্টিতেই ভেসেছে হাওড়া পুরসভার ৬৬টি ওয়ার্ডের ৩৫টি। পদ্মপুকুর জল প্রকল্প ধুঁকছে।উত্তর হাওড়ার সিপিএম প্রার্থীপ্রাক্তন অধ্যাপক গৌতম রায়, মধ্য হাওড়ার বিজেপির বিপ্লব মণ্ডল, সিপিএমের ইমতিয়াজ আহমেদঅথবা দক্ষিণ হাওড়ার বিজেপি প্রার্থী শ্যামল হাতি প্রচারে এই সব বিষয়গুলিকে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের সামনে এনেছেন। মিছিলে মিটিংয়ে সে সব মানুষ শুনছেন। বিরোধীরা বলছেন, মানুষ দিশাহীন হয়ে হয়ে চুপ করে গিয়েছেন। এমনকি সংখ্যালঘুরাও।
এই নীরবতাই কি আসন্ন কোনও ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে? জানতে ৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে