—প্রতীকী চিত্র।
এক জনের নামের আগে মহম্মদ। অন্য জনের মুফতি। তাতেই বিপত্তি! এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ।
মুফতি মহম্মদ গোলাম রব্বানির নাম ছিল ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। কিন্তু তাঁর বাকি সব কাগজপত্রে ‘মুফতি’ নেই। যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) ফাঁদে আটকে গিয়ে প্রথমে ‘বিচারাধীন’ তালিকায়। তার পরে বাতিল। জমির দলিল জমা দিয়েও ছাড় মেলেনি। পরিবারে শুধু তাঁর নামটাই কাটা পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। ট্রাইবুনালে আবেদন করে নাম ফেরানোর জন্য দৌড়োদৌড়ি করছেন তাঁর ছেলে। হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েও ছেলে কিন্তু মেনে নিচ্ছেন, ‘‘মুফতি একটা ইসলামি ডিগ্রি। নামের আগে ওটা লিখে রাখার কোনও দরকার ছিল না। এক একটা নথিপত্রে এক এক রকম নাম বা পদবি রেখে দিলে গোলমাল হবেই। আমাদেরও কিন্তু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’’ সেই সঙ্গেই বলছেন, ‘‘এসআইআর-এর পরে এই প্রজন্ম আর নাম নিয়ে ভুল করবে না!’’
কামাল শেখের নামের আগে মহম্মদ কোনও কাগজে ছিল, কোনও কাগজে ছিল না। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) তাঁর নামের উপরে কাঁচি চালিয়ে দিয়েছে। বিভ্রান্ত কামাল এখন বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন একটু বুঝে-শুনে কাজ করলে আমাদের হয়রানি হত না।’’ প্রথম তালিকা থেকে বাদ গিয়েও ট্রাইবুনালে আবেদন করে বাবু শেখ আবার ভোটার হিসেবে নাম ফেরত পেয়েছেন। তালিকা যাচাই করে দেখেননি বটে, তবে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের মুখোমুখি হয়ে ব্যাখ্যা দিতে পেরে তাঁর স্বস্তি মিলেছে।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় মুর্শিদাবাদ জেলাতেই ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় ছিলেন সর্বাধিক ভোটার— ১১ লক্ষ ১ হাজার ১৪৫। তার মধ্যে থেকে বাদ গিয়েছেন ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ১৩৭ জন। ‘বিবেচনাধীন’ পর্যায়ে জেলাভিত্তিক হিসেবে এই সংখ্যাও রাজ্যে সর্বাধিক। আর আগের দুই পর্ব ধরলে জেলা থেকে মোট বাদ হয়েছে ৭ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫৫২ নাম। বাদের ঘরে চলে যাওয়া এই ভোটারদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু মানুষ।
সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত বিভিন্ন বিধানসভা এলাকা জরিপ করতে গেলে বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়াই চোখে পড়বে। ডোমকল, জলঙ্গিতে যেমন হয়রানির জন্য ক্ষোভের পাশাপাশি নিজেদের কাগজে ভুল মেনে নেওয়ার কথাও আসছে। ভুল শুধরে নেওয়ার জন্য তাঁরা নতুন করে তৎপরও হয়েছেন। প্রসঙ্গত, রাজ্যের বিধানসভা কেন্দ্রগুলির মধ্যে আনুপাতিক হারে সব চেয়ে বেশি (প্রায় ৮৮%) সংখ্যালঘু আছেন ডোমকলে। লালগোলা, ভগবানগোলা বা শমসেরগঞ্জে বাদ পড়া ভোটার আছেন, এমন পরিবারের লোকজন ভেবেই পাচ্ছেন না, কী করে এমন হল! তবে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) চালুর চেষ্টা বা কেন্দ্রীয় ওয়াকফ আইনে সংশোধনী আনার প্রতিবাদে প্রবল বেগে রাস্তায় নেমে পড়া মুর্শিদাবাদের জনতা এখনও এসআইআর-প্রশ্নে সে পথে যায়নি। নাম ফেরত পাওয়ার চেষ্টা এখনও চলছে প্রশাসনিক বা আইনি পথে।
যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির নামে মানুষকে ‘হেনস্থা’ করার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন ভগবানগোলার মুস্তারি বানু। তাঁর মতে, এসআইআর থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস, দু’দলই করছে। ভোগান্তি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। ভগবানগোলার সারিফুল ইসলামও একই মতের শরিক। ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার পরে তাঁর অভিযোগ, নথিপত্রের ক্ষেত্রে যে সহায়তা রাজ্য প্রশাসনের কাছে তাঁরা প্রত্যাশা করেছিলেন, সে সব পাননি। শমসেরগঞ্জের মহম্মদ আসিফের অভিযোগও একই রকম। ওই বিধানসভা কেন্দ্রেই তৃণমূলের পুর-প্রতিনিধি মহম্মদ পারভেজ আলমের ভাইয়ের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। একই পরিবারে বাকি পাঁচ ভাইয়ের নাম উঠে গেলেও বাদ গিয়েছেন এক জন। পারভেজের কথায়, ‘‘কোনও কারণ আছে এটার? তুঘলকি কারবার চলছে!’’ বিধানসভা কেন্দ্রভিত্তিক তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ থেকে বাদ হয়ে যাওয়ার নিরিখে শমসেরগঞ্জই সর্বাগ্রে। এই পর্বে সেখানে বাদ গিয়েছেন ৭৪ হাজার ৭৭৫ জন। বিভিন্ন কেন্দ্রেই ভুক্তভোগী মানুষের বক্তব্য, এসআইআর-এর প্রথম পর্বে যে সব নাম বাদ গিয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকেই মৃত বা স্থানান্তরিত। কিন্তু ‘বিবেচনাধীন’ থেকে যে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার বাদ পড়েছেন, তাঁরা সক্রিয় ভোটার এবং তাঁদের সিংহভাগই সংখ্যালঘু।
তালিকা থেকে বাইরে চলে যাওয়া নিয়ে ভোটারের যেমন নানা প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক বিতর্কও তেমন সপ্তমে। মুর্শিদাবাদে এসে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাস, ‘‘যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় বাদ গিয়েছে, ভোট মেটার পরে সকলের নাম আবার উঠে যাবে। এই নিয়ে চিন্তা করবেন না।’’ তবে যাদের জন্য ভোটাধিকারে ছেদ পড়ল, আগামী ৪ মে-র পরে তাদের উপযুক্ত ভাষায় জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন। এসআইআর-এর প্রথম পর্বে দেখা না-মিললেও প্রচারে এসে বহরমপুরের তৃণমূল সাংসদ ইউসুফ পাঠানের দাবি, ‘‘নাম বাদ দেওয়ার যে অন্যায় হয়েছে, তার বিরুদ্ধে দিদি লড়াই করেছেন। মানুষ তৃণমূল প্রার্থীদেরই পক্ষে থাকবেন।’’
মুর্শিদাবাদে এসে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও বার্তা দিয়েছেন, অন্যায় ভাবে বাদ দেওয়া নাম ফেরানোর ব্যবস্থা তাঁরা করবেন। একই সঙ্গে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ও বহরমপুরের প্রার্থী অধীর চৌধুরীর মত, ‘‘রাজ্যের প্রশাসন ঠিক ভূমিকা পালন করলে মানুষের এত হয়রানি হত না, আদালতকেও হস্তক্ষেপ করতে হত না। আগে এনআরসি-র মতো এখন এসআইআর-কে তৃণমূল রাজনৈতিক ফায়দার অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে।’’ ডোমকলের সিপিএম প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমানের (রানা) দাবি, ‘‘নির্বাচন কমিশন, বিজেপি ও তৃণমূলের প্রশাসনের ভূমিকা— সবটাই মানুষ বুঝে ফেলেছেন।’’ উল্টো দিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের দরকার ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা। বাকিটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।’’
দায়িত্ব যারই হোক, রব্বানিরা বুঝে গিয়েছেন, এ বারের ভোটে তাঁরা ব্রাত্যই!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে