—প্রতীকী চিত্র।
গলির মুখে পুরসভার জলের কল। সময় মেপে পানীয় জল আসার আগেই পাত্রের লম্বা লাইন বেশ কিছু দূর চলে গিয়েছে। ‘তীর্থের কাকের মতো’ কলপাড়ে জলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে মহিলারা। সময় মেপে জল পড়া যখন শুরু হল, সরু ধারা দেখে তিতিবিরক্ত এক মহিলাকে বলতে শোনা গেল, ‘‘আমাদের ভাগে এই কানাকড়িটুকুই ভরসা!’’
‘অবাক জলপান’ নাটকের ‘বলি একটু জল পাই কোথায়?’— চিরন্তন এই সংলাপই ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক এন্টালি বিধানসভা কেন্দ্রের আনাচকানাচে। বাসিন্দাদের এই জল-যন্ত্রণাকে সামনে এনেই ভোট-বৈতরণী পার হতে চাইছে বিরোধী দল। প্রচারে বিজেপি-সিপিএম-কংগ্রেস প্রার্থীরা এলাকায় এলাকায় পানীয় জলের সঙ্কট নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিঁধছেন শাসককে। পাল্টা ‘জলের জোগানে সমস্যা নেই’ বলে দাবি করে ওয়ার্ডভিত্তিক বুস্টিং পাম্পিং স্টেশন তৈরির ভাবনা প্রচারে ‘ফেরি’ করছেন তৃণমূল প্রার্থী সন্দীপন সাহা।
কিন্তু ওয়ার্ডভিত্তিক বুস্টিং পাম্পিং স্টেশন এত দিন হল না কেন? বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেই প্রশ্নই তুলছেন এন্টালির সিপিএম প্রার্থী আব্দুল রউফ। দলের ভাতা এবং শ্রমিকদের সঙ্গে বছরের পর বছর বন্ধ কারখানায় ভিতরে রাত কাটানো বাম প্রার্থী বলছেন, ‘‘২০১১ সাল থেকে এন্টালি বামেদের হাতছাড়া, তৃণমূল ক্ষমতায়। তৃণমূল প্রার্থী নিজে এই এলাকার পুরপ্রতিনিধি। তা হলে এই ব্যর্থতার দায় কার?’’
২০১১ সাল থেকে পর পর তিন বার এন্টালি বিধানসভা এলাকায় জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের স্বর্ণকমল সাহা। কিন্তু এ বারের ভোটে তাঁর বদলে কলকাতা পুরসভার দীর্ঘদিনের পুরপ্রতিনিধি, বিদায়ী বিধায়ক-পুত্র সন্দীপনের উপরে আস্থা রেখেছে দল। সন্দীপন যদিও এন্টালি বিধানসভা এলাকায় জল-সঙ্কটের অভিযোগ মানতে নারাজ। বরং তাঁর দাবি, এলাকায় জলের জোগান পর্যাপ্ত রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘জলের জোগান বা জলকষ্টের কোনও সমস্যা নেই। গত কয়েক বছরে এলাকায় জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। বহুতল হচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসাবেই জনসংখ্যার গুরুত্ব বিচারে ওয়ার্ডভিত্তিক বুস্টিং পাম্পিং স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।’’
এন্টালি বিধানসভা এলাকার মধ্যে রয়েছে কলকাতা পুরসভার পাঁচটি ওয়ার্ড —৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮ ও ৫৯। ওয়ার্ডগুলি ঘুরে দেখলে একাধিক সমস্যা নজরে আসছে। আনন্দপল্লি, বালিপাড়া, ধাপা-সহ ওয়ার্ডভিত্তিক বহু এলাকায় নিকাশির সমস্যা রয়েছে বলে অভিযোগ। বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, একটু বৃষ্টিতেই নালা থেকে জল উপচে ঘরে ঢুকে যায়। সেই জল নামতে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নিকাশি সংক্রান্ত সমস্যার জন্য বাসিন্দারা এলাকায় যথেচ্ছ গজিয়ে ওঠা বেআইনি নির্মাণকেই দায়ী করছেন। বেআইনি নির্মাণের দিকে অভিযোগ বাম প্রার্থীরও। তাঁর আরও দাবি, এলাকায় নিকাশি সংক্রান্ত যেটুকু কাজ, তা হয়েছে বাম আমলেই। শাসক তৃণমূল যদিও নিকাশির অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছে।
সেই সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বেহাল রাস্তা। এলাকার এই সমস্যাকেই মূলত প্রচারে হাতিয়ার করেছেন বিজেপি প্রার্থী, আইনজীবী প্রিয়ঙ্কা টিবরেওয়াল। নিকাশি বা পানীয় জলের সঙ্গে বেহাল রাস্তা, বেআইনি নির্মাণের প্রসঙ্গই তাঁর প্রচারের হাতিয়ার। প্রিয়ঙ্কা বলছেন, ‘‘পুর এলাকায় ন্যূনতম যে পরিষেবা সাধারণ মানুষের পাওয়ার কথা, তার কিছুই এখানে নেই। কয়েক জন ব্যক্তিবিশেষের শুধু উন্নতি হয়েছে। সাধারণ মানুষ সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছেন।’’ একই সুর কংগ্রেস প্রার্থী কাসিফ রেজায় গলায়। সাধারণ মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তাঁদের না পাওয়ার ছবিটাই দেখতে পাচ্ছেন বলে জানালেন। রেজার কথায়, ‘‘প্রতিটি ঘরে গেলেই সাধারণ মানুষ তাঁদের যন্ত্রণার কথা শোনাচ্ছেন। শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। ভোটের ফলে এর বহিঃপ্রকাশ হবে।’’
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের সঙ্গে এন্টালি কেন্দ্রেও পরিবর্তন হয়েছিল। তৃণমূল প্রার্থী স্বর্ণকমল জয়লাভ করেন। ২০১৬ সালেও এর পরিবর্তন হয়নি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে স্বর্ণকমল এই কেন্দ্রে ব্যবধান আরও বাড়ান। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, বিজেপির প্রিয়ঙ্কাকে সে বার হারিয়েছিলেন ৫৮ হাজারেরও বেশি ভোটে। যদিও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিধানসভাভিত্তিক ফলে এইব্যবধান কার্যত কমে অর্ধেক হয়ে দাঁড়ায়— ২৯ হাজারে।
তবে সংখ্যার বিচারে তৃণমূলের আপাত নিশ্চিত এই আসনে হিসাব এলোমেলো করতে পারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এসআইআর ‘কাঁটা’র সঙ্গে তৃণমূল প্রার্থীকে ঘিরে বিরোধীদের ‘পরিবারতন্ত্রের’ খোঁচাও সামলাতে হচ্ছে। তবে ‘পরিবারতন্ত্র’ নিয়ে বিরোধীদের প্রচার নিয়ে চিন্তায় নেই সন্দীপনের। তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র বলে কিছু হয় না। মানুষের কাজ করে তাঁদের মন জয় করতে হয়। তবেই তাঁরা আপনাকে সমর্থন জানাবেন। শুধু ভোটের সময় এলে হয় না।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে