West Bengal Elections 2026

প্রত্যাশাহীন মতুয়া-গড়, রাজনীতি তবু ছাড়ে না

নিশ্চিত ভাবে মতুয়াকেন্দ্রিক লড়াইয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁকে কেন্দ্র করে গাইঘাটা বা হরিণঘাটায় ভোট এখনও বিজেপি-মুখী। এ বার তাতে পা রাখতে চাইছে তৃণমূল।

রবিশঙ্কর দত্ত

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৪
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

ডান হাতের কব্জি তুলে যুবক হাসলেন। বললেন, “আমরা? সব ‘জয় শ্রীরাম’!” বাঁ হাতের তালুতে ঢাকা তাস নামিয়ে পরক্ষণে তিনিই বললেন, “ভোট তো দেব। কিন্তু লাভ নেই।” কেন? তাঁর জবাব স্পষ্ট, “এখানে দিলে, ভোট যাবে ঠাকুরবাড়ি।” হেসে উঠলেন বাকি পাঁচ-সাত জনও।

মতুয়াদের ধর্মকেন্দ্র ঠাকুরনগরের কথা বলছেন ওঁরা। বাগদার তৃণমূল ও বিজেপির দুই প্রার্থীই ওই গুরু-পরিবারের। ঠিক একই কথা বলেছিলেন হেলেঞ্চা বাজারের আনাজ বিক্রেতা। অর্থাৎ মতুয়া-কেন্দ্রিক রাজনীতিও এই রকম এক পরিণতির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসকে, তার পরে বিজেপিকে জিতিয়েও প্রত্যাশা কি পূরণ হয়েছে বাগদার? এখানকার মানুষের অভিজ্ঞতা— তৃণমূলের চুরি, দুর্নীতি মন টানে না আর বিজেপি জিতে কাজে আসে না। চৈত্রের ভাজা-ভাজা গরমে নলডুগরির তাসের আড্ডা বাগদার ভোটের মেজাজই বোঝাল। আসলে এ রাজ্যে গত এক দশক যে অঞ্চল মতুয়া ভোট-ব্যাঙ্ক হিসেবে আলাদা করা রয়েছে, অন্তত এ বার তা বাকি রাজ্য থেকে খুব বেশি আলাদা নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সমস্যা।

তৃণমূলের সামনে এখানে বাধা হয়ে উঠেছিল স্থিতাবস্থা-বিরোধিতা। আর এসআইআর-এর পরে নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া আশঙ্কা তাঁদের থেকে খানিক দূরে ঠেলছে বিজেপিকে। এ বারের নির্বাচনে রাজ্যের মতুয়া-অধ্যুষিত দুই লোকসভা আসনের অন্তর্গত ৭-৮ কেন্দ্রের এই মুহূর্তের অবস্থা মোটামুটি এই রকম। আবার বাংলাদেশ লাগোয়া তফসিলি-অধ্যুষিত অঞ্চলটির বিন্যাস এ রকম হলেও জয়-পরাজয় কিন্তু স্থির হবে কেন্দ্র ও রাজ্যের এই দুই শাসক দলের মধ্যেই। এক সময়ে সিপিএম তথা বামেদের দাপট থাকলেও তা ফেরার মতো ইঙ্গিত অন্তত এ বার নেই।

নিশ্চিত ভাবে মতুয়াকেন্দ্রিক এই লড়াইয়ে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁকে কেন্দ্র করে গাইঘাটা বা হরিণঘাটায় ভোট এখনও বিজেপি-মুখী। এ বার তাতে পা রাখতে চাইছে তৃণমূল। তাদের হিসাব, নাগরিকত্ব নিয়ে এখানকার মতুয়া ও তফসিলিদের অমীমাংসিত সমস্যা আরও জটিল করেছে এসআইআর। বিজেপি নিজেদের ভোট-ব্যাঙ্ক নিজেরাই ভেঙে ফেলেছে, এই অঙ্কে হারানো জমি ফিরে পেতে চাইছে তারা।

অঙ্কের হিসাবে তৃণমূলের এই আশা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শুধু বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রে বাদ পড়েছে মোট ৫০ হাজার নাম। বিজেপি ২০২৪ সালে যে ব্যবধানে এগিয়েছিল, তার প্রায় আড়াই গুণ। একই ভাবে বনগাঁ উত্তর ও দক্ষিণ আসনে বাদ পড়েছে মোট ৭৮ হাজার। লোকসভা ভোটে দুই কেন্দ্রে বিজেপির জয়ের ব্যবধানের সামনে সোজা অঙ্কে তা ‘ফ্যাক্টর’। শুধু তা-ই নয়, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে (সিএএ) নাগরিকত্ব নিয়ে উদ্বাস্তু মানুষের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা-ও সে ভাবে না এগোনোয় আশাবাদী তৃণমূল। তৃণমূলের জেলা সভাপতি, দলের বনগাঁ (উত্তর)-এর প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাসের কথায়, “নাগরিকত্ব নিয়ে মানুষকে বিপদের মুখে ফেলেছে বিজেপি। এ বার তার জবাব পাবে! তৃণমূল ক্ষমতায় এসে সকলের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবে।” একই আশ্বাস দিচ্ছেন বিজেপির বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি বিকাশ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, “বিএলও, এইআরও, ইআরও-দের ব্যবহার করে বিজেপির ভোটারদের নাম কেটেছে তৃণমূল। কোনও সমস্যা হবে না। উদ্বাস্তু হিন্দুদের সুরক্ষা দেবে বিজেপি।”

অন্য দিকে, পঞ্চায়েত স্তরে তৃণমূলের দুর্নীতি, স্বজনপোষণ আর এলাকাভিত্তিক গজিয়ে ওঠা নেতাকে ঘিরে ক্ষোভ কম নয়। বনগাঁ শহরে হেঁটে গেলেই পুর-পরিষেবার অব্যবস্থা, আর্থিক অনিয়মের কথা কানে আসবে। গ্রামীণ কেন্দ্রগুলিতে পঞ্চায়েত নিয়েও একই টানাটানি। জমি-বাড়ি বিক্রিতে তৃণমূলের একাংশের ভূমিকা এখনও চায়ের দোকানের আলোচনা। শেষ লোকসভা ভোটেও ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘কন্যাশ্রী’, বিনা পয়সার রেশনের সরকারি প্রকল্প দিয়েও বেকারি ও দাদাগিরির মোকাবিলা করতে পারেনি শাসক শিবির। জন্মলগ্ন থেকে সংগঠনে যুক্ত স্থানীয় এক নেতার কথায়, “স্থানীয় স্তরে স্থিতাবস্থা-বিরোধিতা অস্বীকার করা যাবে না। দু’-এক সময় সরকারের সাহায্য প্রকল্পকেও সে সব ছাপিয়ে যাচ্ছে।” তবে এসআইআর-এর ফলে সে সব কিছুটা আড়ালে গিয়েছে বলে তাঁরা নিজেদেরই আশ্বস্ত করছেন। ধর্মভিত্তিক মেরুকরণে উদ্বাস্তু মন যে ভাবে বিজেপিতে মজে ছিল, তাতে নতুন করে লড়াইয়ে উপকরণ পেয়েছে তৃণমূল।

একই ধারা মতুয়াদের শক্ত ঘাঁটি রানাঘাট লোকসভার অন্তর্গত চার-পাঁচটি কেন্দ্রে। পরপর দু’টি লোকসভা ভোট ও শেষ বিধানসভা ভোটে কার্যত তৃণমূল লড়াইয়েই ছিল না রানাঘাট উত্তর পূর্ব, রানাঘাট উত্তর পশ্চিম ও রানাঘাট দক্ষিণ এবং কৃষ্ণগঞ্জ কেন্দ্রে। বনগাঁর যে ইঙ্গিত মূল মতুয়া-গড় বাগদা বা আশপাশে রয়েছে, নদিয়ার এই অঞ্চলের ভোটের মতিগতিও কিছুটা সে রকমই। বনগাঁর মতো গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব, দুর্নীতির অভিযোগে এখানেও জমি হারাতে হয়েছিল তৃণমূলকে। এসআইআর-এর আবহে তা কাটাতে পারলে এগোতে পারবে তৃণমূল। রানাঘাট ও বনগাঁয় মতুয়া সম্প্রদায়কে নিয়ে টানাটানি চললেও কমবেশি ৪০ শতাংশ উদ্বাস্তু তফসিলি জাতি ও জনজাতি মানুষই এই অঞ্চলের ভোটের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার বড় অংশ এখনও বিজেপির দিকেই ঢলে।

মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক সুকেশ চৌধুরীর কথায়, “উদ্বাস্তুদের কয়েক যুগের এই সমস্যা ফের মাথা তুলেছে। ফলে, নির্বাচনে তার গুরুত্ব নিশ্চিত ভাবে আছে।” তার মানে কি বিজেপির বিপদ? তাঁর জবাব, “কারও জন্য বিপদ হলেও এই মতুয়া, তফসিলি উদ্বাস্তুদের বাঁচাতেও এগোয়নি কেউ। ফলে, বনগাঁ, বাগদা বা রানাঘাটে কেন, সর্বত্রই ভোট তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় দেবেন।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন