ভোটের প্রচারে নয়া কৌশল তৃণমূলের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সরকারি পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গত কয়েক বছর ধরেই ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচি করেছে নবান্ন। এ বার বিধানসভা ভোটের আগে পকেটে পকেটে সরকারি পরিষেবার ‘প্রচার’ পৌঁছে দিতে নামছে তৃণমূল। শুধু তা-ই নয়। আসন্ন নতুন বঙ্গাব্দে বাড়ি বাড়ি দুয়ারসজ্জার উপকরণও পৌঁছে দেবে শাসকদল। যার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বাঙালিয়ানা। এবং কিঞ্চিৎ হিন্দুত্বও।
সোমবার রাতেই আনন্দবাজার ডট কম-এ লেখা হয়েছিল, তৃণমূল পাড়ায় পাড়ায় সাপ-লুডোর বোর্ড বিলি করবে ভোটের প্রচারে। যে বোর্ডে দেখানো হয়েছে উপরে ওঠার ‘সিঁড়ি’ হিসাবে কাজ করছে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের প্রকল্প। আর ‘সাপের মুখ’-এর জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের বিজেপি নেতাদের মুখের অবয়ব। জানা যাচ্ছে, শুধু লুডো নয়। তার সঙ্গে জুড়ে থাকছে আরও দুই প্রচার সামগ্রী। তৃণমূল সূত্রের খবর, মঙ্গলবারেই অনেক জায়গায় এই তিন সামগ্রী পৌঁছে গিয়েছে। বুধবার থেকেই বিলি করা শুরু হয়ে যাবে। দু’এক দিনের মধ্যে রাজ্যের সর্বত্র বুথস্তরে পৌঁছে যাবে ওই তিন ‘উপহার’।
২০২৬ সালের ইংরেজি বছরের পকেট ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে তৃণমূল। যা ভাঁজ করা। সেই ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে ‘যুবসাথী’, ঘরে ঘরে পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া, আবাস যোজনার মতো সরকারি প্রকল্পের উল্লেখ। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে তৃণমূলের ইস্তাহারে ঘোষিত নতুন সাত জেলা ও কয়েকটি পুরসভা গঠনের কথাও। সেই সংক্রান্ত গ্রাফিকও রয়েছে ওই ভাঁজ করা ক্যালেন্ডারে। যাতে লক্ষ্মীর ভান্ডারের মাধ্যমে মহিলাদের স্বনির্ভর করা-সহ একাধিক প্রকল্পের সামাজিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। অল্পকথায় লিখে ভোটারদের কাছে তা পৌঁছে দিতে চাইছে তৃণমূল। ক্যালেন্ডারের একেবারে সামনের অংশে মমতার ছবি দিয়ে লেখা থাকছে, ‘আবার জিতবে বাংলা’। নীচে লেখা, ‘যে লড়ছে সবার ডাকে, সেই জেতাবে বাংলা মাকে’। ঘটনাচক্রে, বিজেপি যখন জাতীয়তাবাদী বোধকে চাগিয়ে দিতে ‘ভারতমাতা’র কথা উল্লেখ করছে তখন তৃণমূল তাদের বাংলা ও বাঙালি গরিমার পুরনো কৌশলেই নতুন স্লোগান সাজিয়েছে। যেখানে পশ্চিমবঙ্গকে ‘মা’ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলা নববর্ষে দরজার উপরে চাঁদমালা জাতীয় বিভিন্ন উপকরণ লাগানোর চল রয়েছে। সেই আঙ্গিকে তৈরি হয়েছে দুয়ারসজ্জার উপকরণ। সেখানে চাঁদমালার মতো ছ’টি জায়গা ভাগ করে ছ’টি প্রকল্পকে ছবির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। তাতে লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কৃষকবন্ধুর মতো প্রকল্পগুলির উল্লেখ থাকছে। উপরে বা’দিকে লেখা ‘শুভ নববর্ষ’। তার দু’পাশে শোভা পাচ্ছে গাঁদাফুল ও আম্রপল্লবের ছবি। ডান দিকে মমতার ছবি এবং তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীকের মাঝে লেখা ‘আবার জিতবে বাংলা’ স্লোগান।
তৃণমূলের সাপ-লুডোর বোর্ড জুড়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের খতিয়ান। তবে সেই সব প্রকল্প রয়েছে সিঁড়ির তলায়। সেই সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে এমন ঘরে, যেখানে থাকছে প্রকল্পের উপভোক্তাদের ছবি। আবার কোথাও কোথাও সিঁড়ির তলায় রয়েছে প্রকল্পের বাস্তব রূপের ছবি। সিঁড়ি দিয়ে উঠলে পৌঁছে যাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নামটিতে। তৃণমূলের তৈরি লুডোর বোর্ডের ৯ নম্বর ঘরে রয়েছে ‘বাংলার বাড়ি’। সেই ঘরে থাকা সিঁড়ি ধরে ঘুঁটি পৌঁছে যাবে সোজা ৩০ নম্বর ঘরে। সেখানে দেখানো হয়েছে সরকারের ওই প্রকল্পের মাধ্যমে কী কী পাচ্ছেন উপভোক্তা। তেমনই বোর্ডের ১২ নম্বর ঘরে রয়েছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’। ওই ঘরে থাকা সিঁড়ি ধরে সোজা পৌঁছে যাওয়া যাবে ৯৬ নম্বর ঘরে। অর্থাৎ, খেলা জিততে গেলে প্রয়োজন মাত্র চার। উল্লেখ্য, গোটা বোর্ডে সেটিই সবচেয়ে লম্বা সিঁড়ি। তবে ১০০ বা ‘জয় বাংলা’র ঘরে পৌঁছোতে গেলে খেলোয়াড়দের পেরোতে হবে ‘দু’মুখো সাপ’। তার এক দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর অন্য দিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মুখাবয়ব। বোঝানো হয়েছে, ওই দুই ঘরে ঘুঁটি গেলে সাপের মুখে প়ড়তে হবে খেলোয়াড়কে। নেমে আসতে হবে নীচে। বোর্ড জুড়ে যে সব ঘরে সাপের মুখ রয়েছে, সেখানে সেখানে কোনও না কোনও বিজেপি নেতার মুখাবয়ব রয়েছে। হয় শুভেন্দু অধিকারী অথবা সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ বা শমীক ভট্টাচার্য। সেই সব ছবির পাশে লেখা ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র অভিযোগের কথা।
এ হেন প্রচারসামগ্রী নির্মাণের নেপথ্যে যে পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক রয়েছে, তা দেখলেই স্পষ্ট হচ্ছে। জনবিন্যাস দেখে, হিসাব কষেই এই সব সামগ্রী বিলি করবে তৃণমূল। প্রথম দফার ভোট যে আসনগুলিতে হবে, সেখানে মোটামুটি ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত স্থানীয় স্তরের প্রচারেই জোর দেওয়া হবে। প্রার্থী পরিক্রমার সঙ্গে থাকবে স্থানীয় সংগঠকদের একাধিক বার প্রতিটি বাড়িতে যাওয়ার দায়িত্ব। সেই পর্বেই এ হেন সামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে তৃণমূল।
ভোটের মই বেয়ে কি ফের নবান্নের ১৪ তলায় পৌঁছোবে তৃণমূল? উত্তর মিলবে মঙ্গলবার থেকে ৩৪ দিন পরে।