ফল বেরোতেই জেলায় জেলায় বিরোধীদের উপর হামলার অভিযোগ

নির্বাচনী ফল ঘোষণার পরেই কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিরোধীদের উপর হামলার অভিযোগ উঠল শাসক দলের বিরুদ্ধে। তৃণমূল অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কলকাতার সল্টলেক, হাওড়া, বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা— একের পর এক জায়গা থেকে হামলার অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০১৬ ১৯:৫৩
Share:

জলপাইগুড়ির শিরীষতলায় সিপিএমের পার্টি অফিসের সামনে তৃণমূলের পতাকা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।—নিজস্ব চিত্র।

নির্বাচনী ফল ঘোষণার পরেই কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিরোধীদের উপর হামলার অভিযোগ উঠল শাসক দলের বিরুদ্ধে। তৃণমূল অবশ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কলকাতার সল্টলেক, হাওড়া, বর্ধমান, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা— একের পর এক জায়গা থেকে হামলার অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজনৈতিক হিংসার জেরে চিড়িয়া মোড় এবং বেলেঘাটায় জখম হয়েছেন দু’জন। দুই ক্ষেত্রেই অভিযোগের তীর শাসক দলের দিকে। অভিযোগ, এ দিন দুপুর দুটো নাগাদ চিড়িয়া মোড়ের কাছে দমদম রোডে অলোক চক্রবর্তী নামে এক সিপিএম সমর্থককে মারধর করা হয়। তিনি জানান, এই দিন দুপুরে স্থানীয় একটি ক্লাবে বসে তিনি কয়েক জনের সঙ্গে আড্ডা মারছিলেন। আচমকাই সবুজ আবির মাখা একদল তৃণমূল সমর্থক ওই ক্লাবের মধ্যে ঢুকে তাঁর উপরে হামলা চালায়। অলোকবাবু বলেন ‘‘ওরা ক্লাব থেকে আমাকে বের করে রাস্তায় ফেলে মারধর করে। মাথায় বন্দুকের বাট দিয়ে মারে।’’

এই ঘটনার কথা জানিয়ে অলোকবাবুর পরিবারের তরফে খোকন শীল, বাপি গুহ-সহ বেশ কয়েক জন তৃণমূল সমর্থকের নামে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়। অলোকবাবুর পরিজনেরা অভিযোগ করেন, ঘটনার পরেও তাঁদের শাসানি এবং হুমকি দেন তৃণমূলের কয়েক জন সমর্থক।

Advertisement

অন্য দিকে, বেলেঘাটায় লুনা শিকদার নামে এক সিপিএম সমর্থককে মারধর করা হয়। তিনি বলেন, ‘‘ভোটের দিন শাসক দলের তরফে আমায় ভোট দিতে বারণ করা হয়েছিল। আমি শুনিনি বলে আমায় মারধর করা হয়।’’

সল্টলেকের নয়াপট্টি এলাকায় বাইক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রেও অভিযোগের আঙুল উঠেছে তৃণমূলের দিকে। যদিও তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ দিন বিকালে হাওড়ার বিভিন্ন কেন্দ্রে দলীয় প্রার্থীদের জয়লাভের খবর পাওয়ার পরেই শিবপুরের কাউসঘাট রোডে সিপিএমের একটি কার্যালয়ে হামলা চালায় একদল যুবক। তৃণমূলের পতাকা নিয়ে আসা ওই যুবকেরা দরজা ভেঙে ঢুকে ঘরের ভিতর থাকা টিভি-সহ সমস্ত আসবাব ভাঙচুর করে। ঘরে থাকা সমস্ত কাগজপত্র ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাঙচুরের সময় ওই যুবকেরা তৃণমূলের নামে স্লোগানও দেন। খবর পেয়ে শিবপুর থানা থেকে পুলিশ আসার আগেই হামলাকারীরা অবশ্য পালিয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাফ নামানো হয়।

শিবপুর ছাড়াও এ দিন লিলুয়ার আনন্দনগর ও বাঁকড়ার লালবাড়ি এলাকার দু’টি ক্লাবেও ভাঙচুর চালাবার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে অবশ্য ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা মধ্য হাওড়ার বিজয়ী প্রার্থী অরূপ রায় বলেন, ‘‘আমি দলীয় কর্মীদের সংযত থাকতে বলেছি। কারা এ কাজ করেছে খোঁজ নিয়ে দেখছি।’’

পশ্চিম মেদিনীপুরের একাধিক এলাকায় সিপিএম কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, দুপুরে ফাঁকাই ছিল মেদিনীপুর শহরের রাঙামাটিতে সিপিএমের লোকাল কমিটির কার্যালয়। সুনসান দোতলা কার্যালয়েই ভাঙচুর চালায় একদল তৃণমূল কর্মী। কাগজপত্রে আগুন দেওয়া হয়। ঝর্নাডাঙাতেও সিপিএমের একটি অফিসে হামলা হয়েছে। হবিবপুরে সিপিএমের শাখা অফিসের সামনে লাল পতাকা খুলে তৃণমূলের পতাকা টাঙানো হয় বলে অভিযোগ। একই ঘটনা ঘটে শহর লাগোয়া কালগাঙে। সিপিএমের মেদিনীপুর শহর জোনাল সম্পাদক সারদা চক্রবর্তী বলেন, “ভোটে হার-জিত থাকেই। তাই বলে এমন সন্ত্রাস হবে কেন?” কেশপুরেও একাধিক শাখা অফিস আক্রান্ত হয়েছে বলে সিপিএমের অভিযোগ।

ঝাড়গ্রামের রাজ কলেজ কলোনি এলাকায় সিপিআইয়ের ছাত্র সংগঠনের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায় তৃণমূলের লোকজন। খবর পেয়ে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে যান ঝাড়গ্রামের আইসি তানাজি দাস। ঝাড়গ্রাম পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে সিপিএমের ঝাড়গ্রাম শহর জোনাল কমিটির কার্যালয়। সেখানেও চড়াও হয় তৃণমূলের লোকজন। অভিযোগ, ইট-পাটকেল ছুড়ে জানালার কাচ ভেঙে দেওয়া হয়। প্রাঙ্গণের শহিদ বেদির লোহার দণ্ডটি বেঁকিয়ে দেওয়া হয়।

বেলপাহাড়ি ব্লকের হাড়দায় সিপিএমের লোকাল কমিটির কার্যালয়েও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে সিপিএমের অভিযোগ। হাড়দায় দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগে বিনপুর থানায় ২২ জন তৃণমূল নেতা-কর্মীর নামে অভিযোগ করেছে সিপিএম। তবে পুলিশ কোনও মামলা রুজু করেনি বলে অভিযোগ করেছেন সিপিএমের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য প্রদীপ সরকার। তৃণমূলের ঝাড়গ্রাম জেলা সভাপতি চূড়ামণি মাহাতো বলেন, “জোট করেও হালে পানি না পেয়ে হতাশায় কংগ্রেসের লোকেরা সিপিএম কার্যালয়ে ও বিজেপির লোকজনের উপর হামলা চালিয়েছে বলে শুনেছি। আমাদের কর্মীদের সংযত ভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বলেছি।”

হুগলির খানকুলের ঘোষপুরে সিপিএম নেতা কাজল ঘোষালের খোঁজে গিয়ে তাঁকে না পেয়ে রাস্তায় তাঁর ভাই তাপসবাবুর মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। নিমাই কর নামে এক সিপিএম কর্মীর বাড়ি ভাঙচুর এবং লুঠ হয়। ইছাপুরে সুশান্ত সামন্ত এবং ঠাকুরানিচকে স্বদেশ চোয়ান নামে দুই সিপিএম নেতার বাড়ি ভাঙচুর ও মারধর করার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। খানাকুলেরই কুতুবচক, গণেশপুর, চব্বিশপুরে তৃণমূলের লোকজন সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের লাঠিপেটা করে বলে অভিযোগ। পুরশুড়ার ভাঙামোড়ায় কয়েক জন সিপিএম কর্মীর বাড়িতে ঢুকে মারধর, ভাঙচুর ও পানীয় জলের কল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

গোঘাটের বালি অঞ্চলে সিপিএম নেতা অসিত সিংহ রায় এবং মানস ভঞ্জর বাড়ি ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ। হাজিপুরে সিপিএমের দলীয় কার্যালয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া থেকে নকুন্ডায় বাসু সাঁতরা এবং বাপী পাত্র নামে দুই সিপিএম কর্মী সহ ছয় জনকে মারধর করা হয়। সব ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত তৃণমূল। আহতদের ৩ জনকে আরামবাগ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আরামবাগের বনমালিপুরে তৃণমূলের হামলা ঠেকাতে পাল্টা হামলার অভিযোগ ওঠে সিপিএমের বিরুদ্ধে। হামলায় হাঁসুয়ার আঘাতে গুরুতর জখম উদয় সিংহ, দিলীপ সিংহ, মিতা সিংহ, সমাপ্তি সিংহ-সহ আট তৃণমূল কর্মীকে আরামবাগ মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। আরামবাগের হোড়পুরেও একই ঘটনা ঘটে। পুলিশ গিয়ে তিন সিপিএম কর্মীকে গ্রেফতার করে।

অন্য দিকে, বর্ধমানের আসানসোল, কালনা, ভাতার, বরাবনির মতো জায়গা থেকে হামলার অভিযোগ ওঠে।

উত্তরবঙ্গের বালুরঘাট শহরের খিদিরপুরে তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষে জখম হয়েছেন দু’জন। তৃণমূলের ওয়ার্ড কার্যালয়ে ভাঙচুর। হাসপাতালে ভর্তি এক তৃণমূল কর্মী। জলপাইগুড়ির শিরীষতলায় সিপিএমের পার্টি অফিসের সামনে তৃণমূলের পতাকা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement