গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে কর্মসংস্থান সমস্যা নতুন নয়। এ দেশের যুব সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ভাল চাকরির জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে দ্বিধা বোধ করেন না। অধ্যাপনা থেকে শুরু করে নির্মাণ শ্রমিক— যে কোনও পদেই প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বিদেশে গিয়ে কাজ করতে চেয়ে আবেদনপত্র জমা দেন। কেউ মোটা বেতনে, কেউ সামান্য স্বচ্ছল জীবনযাপনের জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে চান।
কোথায় কেমন চাকরি?
ইন্টারনেটের দাপট শুরু হওয়ার পর থেকে এই সব দেশের বিভিন্ন সংস্থায় চাকরির আবেদন জমা দেওয়ার পদ্ধতি যেমন সহজ হয়ে উঠেছে, তেমনই বাড়ছে বিপদও। ফোন কল থেকে শুরু করে ই-মেল মারফত অফার লেটার পাঠানো— সবই নকল করে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে থাকে অপরাধীরা।
গত দু’বছরে কৃত্রিম মেধার উন্নতিতে হুবহু একই রকম দেখতে ভুয়ো ওয়েবসাইট তৈরি করে চাকরি নাম করে বিজ্ঞপ্তিও তৈরি করা হয়। তাতে থাকে বেশি বেতন, থাকা খাওয়ার মতো সুযোগ সুবিধার প্রলোভনও। আর সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করলেই বিপদ।
কোথায় লুকিয়ে বিপদ?
সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইট-এ সব ধরনের পদে নিয়োগ-বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে চাকরির জন্য কর্মী নিয়োগের তথ্য সমাজমাধ্যমের সাহায্যেও প্রচার করা হয়ে থাকে। এ ছাড়াও নিয়োগ সংস্থাগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন পদে যোগদানের শর্তাবলি জানিয়ে বিজ্ঞপন দেওয়া হয়। সব বিজ্ঞাপনই যে যথার্থ, তা কিন্তু নয়।
পদক্ষেপে সামান্য ভুল হলে আর্থিক প্রতারণা তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা নিজের নামেই খুঁজে পেয়েছেন অন্যের ব্যবহার করা মোবাইল সিম, সমাজমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, এমনকি সরকারি পরিচয়পত্রও।
এ ক্ষেত্রে নিয়োগ সংস্থার তরফেও বলাই থাকে, যে কোনও চাকরির বিজ্ঞপ্তি ভাল ভাবে খুটিয়ে দেখে এবং যাচাই করেই আবেদন জমা দেওয়া দরকার।
ছাড় পাননি বিশিষ্ট জনেরাও:
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছিলেন এ দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের একজন সাংবাদিক। সমাজমাধ্যমেও জানিয়েছিলেন সে কথা। কিন্তু ই-মেল মারফত বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে জানিয়ে দেওয়া হল তাঁকে কোনও পদে কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করেননি। অর্থাৎ তিনি প্রতারিত হয়েছেন। প্রতারণার অভিযোগ জানানো হলেও সেই ঘটনা কেন ঘটল, তার কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। একটি সাক্ষাৎকারে ওই সাংবাদিক জানিয়েছিলেন, ই-মেল মারফত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসাবে হার্ভার্ড-এর মিডিয়া সেমিনারে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাঁকে। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে ই-মেল মারফত চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং সেই মতো যাবতীয় তথ্য এবং নথি আদানপ্রদান চলে।
তবে, শুধুমাত্র ওই সাংবাদিক-ই নন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সাংবাদিক বৈঠকে যোগদানের ভুয়ো প্রস্তাব সমাজমাধ্যম মারফত পেয়েছিলেন এ দেশের আরও দু’জন সাংবাদিক এবং এক রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র। প্রত্যেকের পাসপোর্ট নম্বর-সহ গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য চেয়েছিল প্রতারকেরা। প্রতিটি ই-মেলে ছিল হার্ভার্ড-এর নিজস্ব লেটারহেড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রতীক চিহ্ন। ওই আমন্ত্রণ বা চাকরির প্রস্তাব যে ভুয়ো তা বুঝেই উঠতে পারেননি তাঁরা।
আবেদনের সময় কী ভাবে বুঝবেন?
বিদেশে উচ্চপদস্থ আধিকারিক থেকে শুরু শ্রমিক— সব ধরনের পদেই চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে যাঁরা আবেদন করবেন, তাঁদের বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
১। সে দেশের সরকারি বিভাগে সংশ্লিষ্ট সংস্থার নাম, ওয়েবসাইট, যোগাযোগের নম্বর, ই-মেল আইডি নথিভুক্ত রয়েছে কিনা, তা দেখে নিতে হবে। প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে সেই তথ্য মিলিয়ে দেখে নেওয়ার পরই আবেদনপত্র জমা দিতে হবে।
২। বিদেশ যাত্রা মানেই ভিসা এবং অভিবাসনের অনুমোদন আদায় করা। প্রতারক সংস্থাগুলি এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে, প্রথমেই টাকা হাতিয়ে নিতে চায়। সে ক্ষেত্রে কোনও সংস্থা বা নিয়োগ কর্তা প্রার্থীর কাছে পরিষেবার জন্য আলাদা করে ফি ধার্য করলেই বুঝতে হবে, ওই চাকরির প্রস্তাব ভুয়ো। সাধারণত আন্তর্জাতিক সংস্থার তরফে নিয়োগের পর প্রার্থীর হয়ে বিনামূল্যেই ওই সমস্ত পরিষেবার ব্যবস্থা করে থাকে।
৩। এখন বেশ কিছু সংস্থার তরফে কৃত্রিম মেধার সাহায্যে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে ইন্টারভিউ চলাকালীন ফোন নম্বর, ই-মেল আইডি, ঠিকানার মতো একাধিক তথ্য চাওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু যদি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, পাসপোর্টের নম্বর, সরকারি পরিচয়পত্রের নথি-র মতো তথ্য শুরুতেই চাওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে ওই ইন্টারভিউ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বহু চাকরিপ্রার্থীই এই ধরনের ইন্টারভিউয়ের পর জানতে পেরেছেন, তাঁরা চাকরিটা পাচ্ছেন না। উপরন্তু রাতারাতি তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চুরি হয়েছে।
৪। কিছু পদের ক্ষেত্রে অন্য দেশে গিয়ে ইন্টারভিউও দিতে হয়। সে ক্ষেত্রে সে দেশের ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাকরির ধরন, মাইনে সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।