Koushani Mukherjee Interview

বনির জন্য পরিচালক, প্রযোজকদের কাছে বলতে কোনও দ্বিধা নেই, অন্যায় তো কিছু করছি না: কৌশানী

সৃজিত মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়— প্রথম সারির পরিচালকদের পছন্দের তালিকায় এখন অনেকটাই এগিয়ে কৌশানী মুখোপাধ্যায়। কেশসজ্জা করতে করতেই নায়িকা বলে চললেন অভিনয়জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস, বনির সঙ্গে প্রেম, পারিশ্রমিক আর নিজের ওঠা-পড়ার কথা।

Advertisement

উৎসা হাজরা

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৫
Share:

কৌশানী মুখোপাধ্যায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কী বললেন? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: ২০২৪ থেকে কৌশানী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু হয়েছে। এটা কি বলা যায়?

Advertisement

কৌশানী: হ্যাঁ, একদমই। অভিনয়জীবনের এটা এমন একটা সময় যেটা খুব উপভোগ করছি। চেষ্টা করব এই সময়টাকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখতে পারি। আমি যে সময়টার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি এখন, অভিনয়জগতের সঙ্গে যুক্ত যে কোনও মানুষের জীবনের স্বপ্ন তো এটাই। আমি যে ‘লম্বা রেসের ঘোড়া’, এটা যেন প্রমাণিত হয়, এটাই চাইব।

প্রশ্ন: ১০ বছরের অভিনয়জীবন। গত দু’বছরে আপনাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হচ্ছে। কোন কোন বাক্সে টিক চিহ্ন পড়লে এমন সোনালি সময়ে পৌঁছনো সম্ভব? নাকি কিছুটা হলে জ্যোতিষ, ভাগ্য, নানা ধরনের টোটকার উপর নির্ভর করতে হয়?

Advertisement

কৌশানী: সবার যাত্রা এক হয় না। সাফল্য যেমন দরকার, ব্যর্থতারও খুব প্রয়োজন আছে। জীবনে এই সময়টাও দেখা প্রয়োজন। যেখানে হয়তো আমাকে নিয়ে চর্চা হবে না। আমাকে নিয়ে মাতামাতি হবে না। টিক চিহ্ন বলব না। তবে আমার মনে হয়, ধৈর্য রাখা প্রয়োজন। এটা তো পুরোটাই সময়ের খেলা। আমি তো চুনি পরেছিলাম। কিন্তু তার পরে কিছুই কাজ করল না। এখন খুলে ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি। শুধুই হিরে পরে আছি। আসলে সময় না এলে চেষ্টা করলেও সাফল্য পাওয়া যায় না। আমরা আসলে এক একটা ঘুঁটি। ভাগ্য যেমন ভাবে চালনা করবে সে ভাবেই এগোতে হবে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ধারাবাহিক ভাবে পরিশ্রম করতে হবে। ঠিক সময়েই নিজের প্রাপ্যটা মিলবে। এ ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ নির্ভর করে ভাগ্যের উপরে।

প্রশ্ন: আনন্দবাজার ডট কম-এর সাক্ষাৎকারেই বনি সেনগুপ্ত জানিয়েছিলেন, শুধুমাত্র ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য এমন কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, যেগুলোতে না করলেও চলত। টলিউডে টিকে থাকার জন্য কৌশানীও কি এই দর্শনে বিশ্বাসী?

কৌশানী: আমার মতামত একেবারেই আলাদা। বছরে পাঁচটা ছবিতে কাজ করার চেয়ে দুটো এমন ছবিতে কাজ করা উচিত, যেটার জন্য আরও পাঁচটা বছর দর্শক আমাকে মনে রাখবে। টিকে থাকার লড়াইয়ে আমি এই দর্শনেই বিশ্বাস করি। বনির ভাবনার সঙ্গে এ ক্ষেত্রে আমার একেবারেই মেলে না। অনেক ছবির ক্ষেত্রে আমিই বনিকে অনেক বার বলেছি, ‘আমার মনে হয় এই ধরনের ছবিতে তোমার অভিনয় করা উচিত নয়।’ দর্শক হিসাবে মনে হয়েছিল বলে বলেছিলাম।

প্রশ্ন: অর্থাৎ এই আলোচনাও হয় আপনাদের মধ্যে?

কৌশানী: কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো অবশ্যই আলোচনা হয়। আসলে কার জীবনে কী কী দায়িত্ব আছে সেটা তো সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এখন আবার আমরা এমন একটা পর্যায়ে রয়েছি, যেখানে বনিকে হয়তো আমি বলছি, ওই ছবিটা করতে পারো। এখন ও বলছে, না, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে।

প্রশ্ন: ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ সিরিজ়ে অভিনয়ের সিদ্ধান্তও কি ভেবেচিন্তে নেওয়া? কারণ, তপন সিংহর বিখ্যাত ছবি, অভিনেত্রীর তনুজার অভিনয়ের অনেক তুলনাই তো আসতে পারে এখানে।

কৌশানী: এই ওয়েব সিরিজ় কিন্তু পরিচালক তপন সিংহের ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ ছবিটির অনুপ্রেরণায় তৈরি নয়। এটা একেবারেই বর্তমানের গল্প। কর্মক্ষেত্রে একটি মেয়ের যৌন হেনস্থা, তার লড়াই এবং পারিপার্শ্বিক সমাজের গল্প। তাই সেই তুলনা না টানাই ভাল।

প্রভাবশালী পরিবারের ঘনিষ্ঠ হওয়া কি লাভজনক? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রজগতে শোনা যায়, প্রযোজক-ঘনিষ্ঠ না হলে কাজ পাওয়া কঠিন। আপনার পরিবারের তো কেউ এই পেশায় ছিলেন না। সে ক্ষেত্রে আপনাকে কখনও অস্বস্তিকর প্রস্তাবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল?

কৌশানী: কেরিয়ারের শুরুর দিকে বরং আমাকে এমন কোনও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। তবে পরবর্তী কালে আমার কাছে অস্বস্তিকর প্রস্তাব এসেছে। না বললে ভুল বলা হবে। আমার একটা সুবিধা আছে। মুখের উপরে স্পষ্ট জবাব দিয়ে দিতে পারি। একটা মেয়ের অতটাই সাবলীল হওয়া উচিত বা এমন একটা গণ্ডি টানা উচিত, যাতে কেউ সেই গণ্ডি পার না করতে পারে। আর না বলতে শেখা দরকার। আর আমি মনে করি, একতরফা কিছুই হয় না। দু’হাতেই তালি বাজে।

প্রশ্ন: অনেকেরই ধারণা, প্রভাবশালী পরিবারের অংশ হলে নিরাপত্তা বেশি পাওয়া যায়। আপনিও কি সহমত। কারণ, আপনার প্রেমিক বনি সেনগুপ্ত, তাঁর মা পিয়া সেনগুপ্ত টলিউডের একটি প্রভাবশালী পদে রয়েছেন।

কৌশানী: উল্টে সমস্যা বেড়ে যায়। অনেক বেশি চোখ আমার উপরে থাকে। সেই পদের সম্মানের কথা অনবরত মাথায় রেখেই কিন্তু আমাদের চলতে হয়। আর অস্বস্তিকর প্রস্তাবের সঙ্গে কিন্তু পারিবারিক প্রতিপত্তির কোনও যোগ নেই। প্রতিপত্তিই যদি সব হত তা হলে তো বনির হাতে কাজের পর কাজ থাকত। আর প্রতিটা প্রযোজক, পরিচালক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন বনির বাড়ির বাইরে। এই ভাবনাটাই সত্যি নয়।

পারিশ্রমিক কতটা বদলাল? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: আপনি তো বেশ কিছু আলোচিত কাজের অংশ হয়েছেন এই দু’বছরে। বলিউডের শিল্পীরা সাধারণত একটা হিট ছবি বা ওয়েব সিরিজ়ের অংশ হলে একধাক্কায় অনেকটা পারিশ্রমিক বাড়িয়ে ফেলতে পারেন। এই দু’বছরে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে কতটা পরিস্থিতি বদলাল আপনার?

কৌশানী: বলিউডের ক্ষেত্রটা অনেক বড়। আমরা তো আঞ্চলিক ভাষায় কাজ করি। এখানে নিজেকে চালানোর লড়াই আছে। তবে এখানে পরিস্থিতি বদলেছে। কিন্তু একটা হিট ছবির নিরিখে সঙ্গে সঙ্গে পারিশ্রমিক বেড়ে গিয়েছে সেটা বলতে পারব না। হয়তো আমি শুরু করেছিলাম ১০ টাকা দিয়ে। এখন হয়তো আমি পাচ্ছি ৩০ টাকা। কিন্তু এটা অনেকেই জানেন না, ওই ১০ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে আমি টানা পাঁচ বছর কাজ করেছি। পরিবর্তন এসেছে পরের পাঁচ বছরে। এটাই হল পার্থক্য। তবে আগের থেকে পারিশ্রমিকের অঙ্ক অনেকটাই বদলেছে। এটা যদিও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

প্রশ্ন: আপনিও কি তা হলে এ বার হিন্দিতে কাজের কথা ভাবছেন? এখন তো আপনি আলোচিত নায়িকা, কাজ পাওয়ার জন্যে কি অডিশন দিতে রাজি হবেন?

কৌশানী: এখন যে কয়েকটা কাজ করছি আমি, সবগুলোতেই তো আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে, আমি যোগ্য। কোনওটাই তো ফ্রি-তে আসছে না! আমার ব্যক্তিগত জীবনেও অনেক কিছু ত্যাগ করতে হচ্ছে। মুম্বইয়ে অডিশন দেওয়ার ব্যাপারে আমার কোনও সঙ্কোচ নেই। আগেও ছিল না, এখনও নেই। ভবিষ্যতেও কোনও সঙ্কোচ থাকবে না। হিন্দিও আমি ভাল বলি। আসলে এই প্রক্রিয়াটা খুব লম্বা। শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। আগে অনেক সুযোগও পেয়েছিলাম। বলতে কোনও দ্বিধা নেই, ‘খাকি: দ্য বেঙ্গল চ্যাপ্টার’ সিরিজ়ে একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বলা হয়েছিল। অডিশন দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সিলেক্ট করা হয়নি। নেপথ্যে নানা কারণই থাকতে পারে। আমিও চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন: রাজনীতিকে কি একে বারে ভুলে গেলেন? কয়েক বছর আগেও তো খুব সক্রিয় ভাবে দেখা গিয়েছিল আপনাকে।

কৌশানী: ভুলব কেন? দেখুন, রাজনীতির ডাক পেয়েছিলাম অভিনেত্রী কৌশানী হয়ে ওঠার পড়েই। তাই অভিনয়ের সঙ্গে কোনও আপোস করতে চাই না। আর ভগবানের দয়ায়, এই বছরে আমার আর কোনও ‘ডেট’ খালি নেই। রাজনীতি একটা আলাদা জগৎ। আলাদা দায়িত্ব। দর্শক কিন্তু দুই জায়গাতেই এক। যাঁরা এখানে টিকিট কেটে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে আমাদের দেখছেন। তাঁদেরই বাড়ির দরজার সামনে গিয়ে ভোট চাইছি। এ ক্ষেত্রে আর একটা কথা বলব?

আর কি রাজনীতিতে দেখা যাবে না কৌশানীকে? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন।

কৌশানী: সত্যি, সিনেমায় অভিনয় ছাড়া এখন কিছুই ভাবছি না। অনেকে তো প্রশ্ন করেন বিয়ে নিয়ে। সেটার কথাও ভাবতে পারছি না। আমি আমার কাজের সঙ্গেই বিবাহিতজীবন কাটাচ্ছি। আর বনি আমাদের সন্তান। তাই এত কিছুর মাঝে রাজনীতির ক্ষেত্র নিয়ে ভাবতেই পারছি না। যেদিন মানসিক ভাবে পুরোপুরি দিতে পারব, তখনই হ্যাঁ করব।

প্রশ্ন: কর্মক্ষেত্রের এত চড়াই-উতরাই, অনিশ্চয়তা— আপনার এবং বনির সম্পর্ককে কতটা বদলাল?

কৌশানী: বাড়িতে তো আমরা অভিনেতা নই। সিনেমার জন্য তো বনিকে আমি বেছে নিইনি। আমার যখন খারাপ সময় গিয়েছে, তখন ওকেও বলেছিলাম আমার হয়ে বলতে। আর এখনও যদি আমাকে ওর জন্য বলতে হয় আমি বলব। দুটো ছবি খারাপ চলছে বলে তা সম্পর্ককে কী ভাবে পাল্টে দিতে পারে? বন্ধু বা সঙ্গী হলে তো পরস্পরকে ভাল রাখার চেষ্টা করব যে কোনও পরিস্থিতিতেই। সেটাতেই আমরা বিশ্বাসী। তাই কর্মক্ষেত্রে ওঠা-পড়া আমাদের সম্পর্কে

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement