হলমালিকেরা কি বিপদে পড়েছেন? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাজ্য সরকারের নির্দেশ, প্রতি দিন একটি করে প্রাইম টাইম শো দিতে হবে বাংলা ছবিকে। এমনি সময়ে তাতে সমস্যা নেই। গোল বাধে উদ্যাপনের আবহে। সেই সময় হিন্দি ছবির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ বাংলা ছবি। প্রাইম টাইম শো-ও তাদের দখলে।
তাতেই নাকি ‘গোসা’ হিন্দি ছবির পরিবেশকদের। অনুযোগ, বাংলায় তাঁদের ছবি কি ‘দুয়োরানি’?
খবর, এই ‘অনুযোগ’ই নাকি ব্যুমেরাং হয়ে ফিরেছে কিছু হলমালিকের কাছে, যাঁরা ‘বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ান’-এর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। বড় বাজেটের হিন্দি ছবি তাঁদের প্রেক্ষাগৃহে জায়গা পায়নি। উল্টে তাঁরা সব ক’টি শো বাংলা ছবিকেই দিয়েছেন। ফলাফল? ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’ দশা! উৎসব মিটেছে। বাংলা ছবিমুক্তির সংখ্যাও কমেছে। সূত্রের খবর, এই পরিস্থিতির পুরো ফায়দা তুলছেন হিন্দি ছবির পরিবেশকেরা। হলমালিকেরা ছবি চেয়ে তাঁদের দ্বারস্থ হলে হাত উল্টে দিয়েছেন! মনে করিয়ে দিচ্ছেন ‘বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ান’ বীজমন্ত্র।
সত্যিই কি এ রকমই কিছু ঘটছে? নাকি পুরোটাই নিন্দকদের রটনা? আনন্দবাজার ডট কম জানতে চেয়েছিল বিনোদিনী সিনেমাহলের মালিক (সাবেক স্টার থিয়েটার) জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, নবীনা সিনেমাহলের মালিক নবীন চৌখানি, প্রিয়া সিনেমাহলের মালিক অরিজিৎ দত্ত, প্রাচী সিনেমাহলের মালিক বিদিশা বসুর কাছে। সমস্যাটি কিন্তু কেউই এড়িয়ে যাননি।
যেমন, বিনোদিনী থিয়েটারের মালিক জয়দীপ। সিঙ্গল স্ক্রিনের কর্ণধার আক্ষেপ করেছেন, “আমার দিনে চারটি শো চলে। এখন সেটি কমে দুটো হয়েছে। কারণ, বাংলা ছবির অভাব।” তাঁর প্রেক্ষাগৃহে এখন ‘মন মানে না’ আর গত শীতের ছবি ‘প্রজাপতি ২’ চলছে। “হলের রক্ষণাবেক্ষণ আছে। কর্মীদের মাইনে দিতে হয়। কোথা থেকে দেব? বুঝতেই পারছি না।” দুশ্চিন্তায় মাথায় হাত হলের কর্মীদেরও। খবর, ইতিমধ্যেই নাকি তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন স্ক্রিনিং কমিটির সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের সঙ্গে। জানতে চেয়েছেন, চারটি শো চালাতে এখন কোন বাংলা ছবি দেখাবেন তিনি?
এই সমস্যার সম্মুখীন এখনও হননি অরিজিৎ, নবীন বা বিদিশা। তবে যে কোনও সময় তাঁরাও জয়দীপের মতো বেকায়দায় পড়তে পারেন, সে কথাও অস্বীকার করেননি। অরিজিতের কথায়, “উৎসবের আমলে হিন্দি আর বাংলা ছবি যেন পাল্লা দিয়ে মুক্তি পায়। তিন-চারটি বাংলা ছবি একসঙ্গে মুক্তি পেলে প্রত্যেককে প্রাইম টাইম শো দিতে গিয়েই সমস্যা হয়। হিন্দি ছবির ভাগ্যে তখন মর্নিং, নুন অথবা নাইট শো। পরিবেশকেরাই বা কেন রাজি হবেন?” উৎসব মিটলেই বাংলা ছবির ভিড় হাল্কা। তখন হিন্দি ছবি দেখানোর কথা বললেও স্বাভাবিক ভাবেই আর রাজি হচ্ছেন না পরিবেশকেরা।
নবীনের যুক্তি, “সবার লক্ষ্য উৎসবের আবহ। তখন ছবিমুক্তির জন্য মারামারি-কাটাকাটি। এটা না হয়ে সারা বছর যদি সমান তালে ছবিমুক্তি পায়, আমরাও ব্যবসা করে খেতে পারি। নইলে আমরাই বা চলব কী করে? আমাদেরও তো অনেক খরচখরচা আছে।” এ প্রসঙ্গে জয়দীপ যোগ করেছেন, “বিদ্যুতের বিল থেকে প্রেক্ষাগ়ৃহের পরিচ্ছন্নতা— সব সামলাতে গিয়ে আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আগের মতো বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি ছবি দেখানোর অনুমতি দিলে এই সমস্যা হত না।” তাঁর আরও ক্ষোভ, হলমালিকেরা নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বাংলা ছবির পাশে। অথচ তাঁদের বিপদের দিনে কিন্তু বাংলা ছবির প্রযোজকদের পাশে পাচ্ছেন না তাঁরা!
এই একই কথা প্রাচী সিনেমাহলের মালিক বিদিশারও। তিনি বলেছেন, “আসলে পুরো বিষয়টিই নির্ভর করে পারস্পরিক সম্পর্কের উপরে। ধরুন, বড় বাজেটের ছবি ‘বর্ডার ২’-এর কথা। তাঁরা কেন প্রাইম টাইম শো না পেলে ছবি ছাড়বেন? এ দিকে তখন বাংলা ছবিও সংখ্যায় বেশি। উৎসবের আবহে বাংলা ছবি প্রাইম টাইম শো পাবে। সে পর্ব মিটলেই নিজের স্বার্থে হিন্দি ছবি দেখাতে চাইলে হিন্দি ছবির পরিবেশকেরা সহযোগিতা না-ই করতে পারেন।” এ প্রসঙ্গে কী বক্তব্য স্ক্রিনিং কমিটির সভাপতি পিয়ার? কারণ, রাজ্য সরকারের নির্দেশ, উৎসবের আবহে ক’টি বাংলা ছবিমুক্তি পাবে সেটা ঠিক করবে স্ক্রিনিং কমিটি। পিয়া জানিয়েছেন, জুন মাস পর্যন্ত স্ক্রিনিং কমিটি একটি সিনে ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে। নির্দিষ্ট সময়ে বাকি ছ’মাসের ক্যালেন্ডার তৈরি হবে।
এ দিকে শোনা যাচ্ছে, যাঁরা ভুক্তভোগী, তাঁরা ভাল বাংলা ছবি না পেলে বন্ধ রাখতে বাধ্য হবেন তাঁদের সিনেমাহল! সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে ‘বাংলা ছবি’ কি হলমালিকদের পাশে এসে দাঁড়াবে? টলিউডের অন্দরের খবর, সবটাই সময় বলবে।