অনতিদীর্ঘ কেরিয়ার তাঁর। তবে বৈচিত্রময়! ইংরেজি নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম জীবনে অল্প কিছু দিনের জন্য বিমানসেবিকার কাজ করেছিলেন। যদিও গ্ল্যামারের দুনিয়ায় অনন্যার আগমন একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় জেতার পর। তার পর চাকরি, মাঝে সিনেমার জগতে অল্পবিস্তর চেষ্টা করেছিলেন। তবে শিকে ছেঁড়েনি। এর পরে কলকাতা পুরসভার ভোটে লড়ে ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ফের গ্ল্যামার দুনিয়ায় শুরু হয় তাঁর অনায়াস বিচরণ। এ বার সেই অনন্যার অফিস থেকেই উদ্ধার ‘বিতর্কিত’ কিছু জিনিসপত্র। তা নিয়ে রীতিমতো হইচই।
অনন্যার রাজনৈতিক উত্থান মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে। ২০২১ সালে পুরসভা নির্বাচনে জিতে পুরপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। এলাকার পরিচ্ছন্নতা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, স্থানীয় উন্নয়ন এবং নাগরিক পরিষেবা নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সামাজিক প্রচারাভিযান ও জনসংযোগমূলক কর্মসূচিতেও তাঁকে নিয়মিত দেখা যায়। সেই সময় থেকে টলিউডের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে অনন্যার। দেবের ‘প্রধান’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ হয় অনন্যার।
‘প্রধান’-এর পর পরিচালক রাজর্ষি দে’র ছবি ‘সাদা রঙের পৃথিবী’-তে অভিনয় করেছিলেন। ২০২৫ সালে আরও কয়েকটি ছবিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’ থেকে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘রক্তবীজ ২’, অরিন্দম শীল পরিচালিত ‘কর্পূর’— যে ক’টি ছবি করেছেন সব ক’টিতেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পেয়েছেন। যদিও অনন্যার ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া নিয়ে টলিউডের অন্দরেই রয়েছে নানা গুঞ্জন। শোনা যায়, প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের কাছের মানুষ বলেই অনন্যা একের পর এক বড় ছবিতে সুযোগ পেয়েছেন।
যদিও অনন্যা সরাসরি বিতর্কে জড়ান ২০২৪ সালে। পুরসভার বাজেট বিতর্কে যোগ দিয়ে তৃণমূল পুরপ্রতিনিধি অনন্যা ‘যৌনগন্ধী’ মন্তব্য করায় ‘ক্ষুব্ধ’ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আসার পর তিনি কঠোর পদক্ষেপ করতে নির্দেশ দেন তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে। অনন্যা যাতে আর পুর অধিবেশনে বক্তৃতা করার সুযোগ না-পান, সে নির্দেশও দেওয়া হয়। সেই ঘটনার দু’বছর পরে অবশ্য অনন্যার উপর থেকে ‘নিষেধাজ্ঞা’ ওঠে।
আসলে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে নিয়ে অনন্যার বক্তব্যেই বিতর্ক বাধে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরসভার সেই বাজেট বিতর্কে যোগ দিয়ে পশ্চিমি সংস্কৃতিতে ‘ফাদার’ এবং ‘নান’দের (সন্ন্যাসিনী) সম্পর্ক নিয়ে নানা গল্পের কথা উল্লেখ করেছিলেন অনন্যা। সেই সময়ে প্রতিবাদ উঠেছিল বিরোধী দল বিজেপির তরফে। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি পুরপ্রতিনিধি সজল ঘোষ এবং ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি পুরপ্রতিনিধি বিজয় ওঝা প্রতিবাদ করেছিলেন। এ হেন মন্তব্যের কারণে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন অনন্যা।
তার পর থেকে অনন্যার পরিচিতির বহর বেড়েছে। পাশাপাশি বিতর্কও বেড়েছে তাঁকে নিয়ে, যার মধ্যে অন্যতম ‘হাতিবাড়ি’ বিতর্ক। ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৯৭ নম্বর সন্তোষপুর অ্যাভিনিউয়ে একটি বিরাট বাড়ি তৈরি করেছেন অনন্যা। বছরখানেক আগে পুর অধিবেশনে এই অভিযোগ করে বিজেপির পুরপ্রতিনিধি সজল ঘোষ দাবি করেন ওই বাড়িটি বেআইনি। তাঁর দাবি ছিল, মিনুরানি ভাওয়ালের কাছ থেকে দোতলা বাড়িটি কেনেন অনন্যা ও তাঁর পরিবার। বাড়িটি ‘বেআইনি’ ভাবে পাঁচতলা করা হয়। এর পর বাড়ির পিছনের জমিটি কিনে সেখানে ‘অবৈধ’ ভাবে আরও একটি পাঁচতলা বাড়ি তৈরি করে সামনের বাড়িটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পুরসভার পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘অ্যামালগামেশন’। সরকার বদলের পর শহর জুড়ে অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে বুলডোজ়ার অভিযানের সময় বার বার ফিরে এসেছে অনন্যার ‘হাতিবাড়ি’র কথাও।
অনন্যার ব্যক্তিগত জীবনও বার বার আলোচনায় উঠে এসেছে। যার মধ্যে অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হল তাঁর ও প্রয়াত অভিনেতা জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাম্পত্যজীবন। অনন্যা যখন ‘মিস্ ক্যালকাটা’ সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় জয়ী হন, সে বার বিচারকের আসনে ছিলেন জয়। প্রথম দেখাতেই নাকি অনন্যার সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে যান জয়।
তত দিনে জয়ের বাড়ি থেকে পাত্রী দেখা হচ্ছে। পাত্র হিসাবে মহিলামহলে তাঁর চাহিদাও নাকি বাড়ছিল! জয়ের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাইছিলেন তাঁর বাবাও। পাত্রী দেখার পর চার দিনের মধ্যেই অনন্যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে দেন জয়ের বাবা। ২০০০ সালে বিয়ে হয় তাঁদের। একটা সময় মদে আসক্তি বাড়তে শুরু করে জয়ের। শোনা যায়, তাঁদের দাম্পত্য ভাঙার পিছনে এটি নাকি অন্যতম কারণ। যদিও এ নিয়ে মুখ খোলেননি অনন্যা কিংবা জয়ের পরিবারের কেউই।
জয়ের মাধ্যমেই ২০১০ সালে তৃণমূলে প্রবেশ অনন্যার। যদিও যোগদানের চার বছরের মাথায় বিজেপিতে যোগ দেন জয়। বিচ্ছেদ হয় অনন্যার সঙ্গে। ২০১৯ সালে ফের বিয়ে করেন জয়। তার পর থেকে ‘সিঙ্গল’ অনন্যা। তবে ২০২৫ সালে জয়ের মৃত্যুর পরে, শেষযাত্রায় দেখা গিয়েছিল অনন্যাকে।
এর পর থেকেই প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে বলে খবর। সমাজমাধ্যমে অরূপের সঙ্গে তাঁর অনেক ছবি দেখা যেত। এখনও এমন অনেক ছবি ঘোরাফেরা করছে সমাজমাধ্যমের পাতায়। একটা সময় শোনা যেত, সিনেমায় অনন্যা থাকলেই নাকি সেই ছবির নন্দনে হল পাওয়া নিশ্চিত। যদিও এ সব বিতর্ককে কখনওই প্রশ্রয় দেননি অনন্যা। উড়িয়ে দিয়েছেন বরাবর।
সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস, যিনি টালিগঞ্জের ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সদ্যপ্রাক্তন সভাপতি। সেই গ্রেফতারি প্রসঙ্গে অনন্যার প্রতিক্রিয়া, “ব্যক্তি নয়, প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই হওয়ার প্রয়োজন। না হলে এমনটা চলতেই থাকবে। মনে হচ্ছে সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আশা করছি, সাধারণ মানুষের, বিশেষত টলিপাড়ার রাজনীতিতে মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভের সুবিচার হবে। বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রয়েছে আমার।”
এই ঘটনার দিনকয়েকের মধ্যে ফের চাঞ্চল্য! অনন্যার ওয়ার্ড অফিস থেকে উদ্ধার নানা ত্রাণসামগ্রী। এমনকি, গর্ভনিরোধকও! ঝাঁ চকচকে ওয়ার্ড অফিসের মধ্যে নাকি রয়েছে একটি মেকআপ রুম ও ম্যাসাজের সামগ্রীও!
এই ওয়ার্ড অফিস আর তাঁর নয়, দাবি অনন্যার। ইতিমধ্যেই ভেঙে গিয়েছে বোর্ড অফিস। অনন্যা বলেন, “এটা তো কলকাতা পুরসভার ১০৯ নম্বরের ওয়ার্ড অফিস। কোনও দলীয় কার্যালয় নয়। ৮ জুন বোর্ডটাই ভেঙে গিয়েছে। আর এই ওয়ার্ড অফিস শুধু এলাকার জনপ্রতিনিধির নয়। পুরসভায় যে সরকারি আমলারা কাজ করেন, তাঁরাও যান। এটা তাঁদেরও অফিস।” পাশাপাশি, অনন্যার যুক্তি, যে অফিস তাঁর নয়, সেখানে হঠাৎ একদল লোক ঢুকে নিষিদ্ধ জিনিস দেখাচ্ছে। এটা তো সরকারি অফিস। অনন্যার মতে, এই ধরনের কার্যকলাপ নিম্নরুচির পরিচয়।
অরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ বলেই প্রচারের আলোয় ছিলেন অনন্যা, এমনটাই দাবি ইন্ডাস্ট্রির একাংশের। আপাতত পুলিশ এই মুহূর্তে অরূপের খোঁজে। এ দিকে, বোর্ড ভেঙে যাওয়ায় পুরপ্রতিনিধিও নন অনন্যা। সিনেমার কাজও নেই হাতে। তবে কি এ বার নতুন কোনও ভূমিকায় দেখা যাবে অনন্যাকে? এর উত্তর আপাতত ভবিষ্যতের গর্ভে।