Haranath Chakraborty Interview

এই প্রজন্মের পরিচালকেরা বিশাল ভাবেন নিজেদের, বছরে ১০০টার মধ্যে ১০টা ছবিও ভাল হচ্ছে না: হরনাথ

টলিউডে প্রায় ৪০ বছরের বেশিও কাটিয়ে ফেলেছেন পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী। এখনকার বাংলা ছবি, সিনেমার ব্যবসা, রাজনীতি— এই সব কি ভাবায় পরিচালককে? আনন্দবাজার ডট কম-এর সামনে অকপট পরিচালক।

Advertisement

উৎসা হাজরা

শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৬
Share:

পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী বর্তমান যুগের ছবি তৈরি নিয়ে কী ভাবছেন? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: আপনার নতুন ওয়েব সিরিজ়ের নাম ‘ইচ্ছেপূরণ’, ৪০ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানোর পরে আপনার কি সব ইচ্ছে পূরণ হয়েছে?

Advertisement

হরনাথ: সিনেমার পরিচালক কিংবা অভিনেতা— তাঁদের ইচ্ছা কখনও পূরণ হয় না। অঞ্জনদার (চৌধুরী) ‘শত্রু’ ছবির চতুর্থ সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেছিলাম। সেই সময়ে ম্যাটিনি শো হত। প্রেক্ষাগৃহের সামনের তিনটে ‘সারি’র আসন ভরে গেলেই মনে হত সব পূরণ হয়ে গিয়েছে। আসলে তো আমাদের কোনও অবসর নেই। তাই ইচ্ছে পূরণের সময় অনেকটা বেশি।

প্রশ্ন: এক দিকে যেমন অবসর নেই, তেমনই তো পেনশন, পিএফ, গ্র্যাচুইটিও তো নেই। এত বছর পরে কি এগুলো ভাবায়?

Advertisement

হরনাথ: কঠিন বাস্তব কথা বললেন। তবে আমরা যাঁরা এই পেশায় রয়েছি তাঁদের কাছে কিন্তু অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল কাজের মধ্যে থাকা। ভাল কাজ করলে মনে হয় আয়ু বেড়ে গেল। খারাপ কাজ হয়তো অনেক সময় পয়সার জন্য করতে হয়। উপায় থাকে না।

প্রশ্ন: হরনাথ চক্রবর্তী শুধুমাত্র টাকার জন্য ছবি তৈরি করেছেন?

Advertisement

হরনাথ: আমরা যাঁরা পুরনো দিনের মানুষ, তখন এতটা বাহ্যিক দিক দিয়ে সবটা বিচার করতাম না আমরা কেউই। বরং ভাবতাম, ভাল ছবি তৈরি করব। ‘হাউসফুল’ বোর্ড ঝুলবে। প্রযোজক লাভ করবে। এই কথাই মাথায় থাকত। যেমন, শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্‌ ব্যবসাটা বন্ধই করে দিচ্ছিল। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ডেকে মণি এবং শ্রীকান্তের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। বলেন দুটো বাচ্চা ছেলে ওরা চলে যাবে বলছে। ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদেরও অনেক লোকসান হয়েছে। সবাই মিলে ভাল কাজ করার কথা ভাবা হয়। তখনই ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ তৈরি করেছিলাম। আমরা কেউ পারিশ্রমিক নিইনি। ছবি মুক্তি পাওয়ার পরে সবাই পারিশ্রমিক নিয়েছিল। এখন তো তারা পুরোদস্তুর কর্পোরেট হয়ে গিয়েছে। এখন নামও ‘এসভিএফ’ হয়ে গিয়েছে। আসলে ওদের নিষ্ঠাও ছ

পারিশ্রমিকের জন্য কখনও ছবি তৈরি করেছেন হরনাথ? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: এখনকার প্রজন্মের প্রযোজক এবং পরিচালকদের দেখে কী মনে হয়?

হরনাথ: আসলে আমি তিনটে প্রজন্ম দেখলাম। প্রথম যখন এসেছিলাম, তখন সাউন্ড পজ়িটিভ, সাউন্ড নেগেটিভ ছিল। আমার চোখের সামনে সেই পরিবর্তন দেখলাম। এল ম্যাগনেটিক টেপ। তার পরে এল ডিজ়িটাল। তার পর তো ফিল্মই উঠে গেল। বর্তমান প্রজন্মের পরিচালকেরা যাঁরা নিজেদের বিশাল কিছু ভাবেন তাঁরাও এত কিছু দেখেননি। ফিল্মের গন্ধ পাননি। আমরা চার-পাঁচ জনই আছি সেই যুগের। আমরা মনিটর না দেখে ছবি করতাম। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো হতাশই লাগে বর্তমান প্রজন্মকে দেখলে।

প্রশ্ন: এখন তো মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবি নিয়ে নানা জনের নানা মত...

হরনাথ: আমাদের এখানে দুই শ্রেণির দর্শক রয়েছেন। এক অংশ বুদ্ধিজীবী। তাঁরা একটু গুরুগম্ভীর ছবি ভালবাসেন। আর একাংশ মধ্যবিত্ত বাঙালি। যাঁরা জীবনের নানা চাপের মাঝে ছবি দেখে একটু জীবনে আরাম চান। আমরা সেই ধরনের ছবি তৈরি করতাম। এখনও সেই ছবি টেলিভিশনে চললে ভাল টিআরপি দেয়। বর্তমান প্রজন্মের পরিচালকেরা ছবিকে দরকচা করে ফেলেছেন। না মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি, না একেবারে গুরুগম্ভীর, বুদ্ধিজীবীদের জন্য তৈরি ছবি। ভাবছেন, বিশাল অন্য রকম কিছু করে ফেলছেন। তা হলে কেন দর্শকের ভাল লাগবে ছবি? এখানে মিডিয়ারও কিছুটা দোষ আছে।

প্রশ্ন: কী রকম?

হরনাথ: মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবিকে খারাপ বলতে বলতে নেতিবাচকতা তৈরি করেছে। ‘শত্রু’ যখন মুক্তি পায় তখন শিরোনাম হয়েছিল, ‘শত্রুর মতো ছবি টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিকে শশ্মানে পরিণত করবে’। সেই ছবি কিন্তু এক বছর চলেছিল। মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবিকে ‘ভাল নয় ভাল নয়’ বলতে বলতেও অনেকটা ক্ষতি হয়েছে। আমার তো কোনও ছবিই কেউ ভাল বলেননি। কিন্তু হিট হয়েছিল সব ছবি।

প্রশ্ন: কিন্তু এখন তো বাংলা ছবিতে ব্যবসার সঠিক হিসাবই পাওয়া যায় না...

হরনাথ: বক্সঅফিস বলে কিছু হয় না। দুটোই বক্সঅফিস রয়েছে। একটি হলেন মিঠুন চক্রবর্তী। আর অপর জন হলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আমি এখনও এটাই ভাবি। ওই রকম হিসাবেই দেখি। আর এখন যেমন ছবি তৈরি হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে বক্সঅফিসের হিসাব চাওয়া বৃথা।

প্রশ্ন: এখন ভাল বাংলা ছবি তৈরি হচ্ছে না বলছেন?

হরনাথ: আপনার মনে হচ্ছে? আমি প্রতিটি বাংলা ছবি দেখি। তা ছোট হোক কিংবা বড়। আমি নন্দনের প্রিভিউ কমিটিতে আছি। সব ছবি জমা পড়ে ওখানে। আমি তো সব ছবিরই চেহারা দেখছি। বছরে ১০০টা ছবি দেখলে, ১০টাও তার মধ্যে ভাল নয়। হিট করার মতো নেই কিছু।

‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ এই সময়ে তৈরি হলে কি হিট হত? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: এখন যদি ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ তৈরি করতেন, সেটা হিট হত বলে আপনার মনে হয়?

হরনাথ: সেটা বলা খুবই কঠিন ব্যাপার। ১৯৯৯ সালের ছবি। তখনকার পরিবেশ, সেই সময় দর্শকের মানসিকতা— সব কিছুই এখনকার সঙ্গে আকাশপাতাল পার্থক্য। এখন ওই ছবি করতে গেলে বর্তমানের ঘরানায় সেটাকে ফেলতে হবে। সেই ভাবে করতে হবে। কিন্তু করবে কে?

প্রশ্ন: টলিউডে কোনও নায়ক নেই বলছেন?

হরনাথ: কোথায় তেমন হিরো? নতুন ছেলেমেয়েদের নিয়ে ‘ট্রেন্‌ড’ করিয়ে করতে হবে। ভাল গান তৈরি করতে হবে। ভাল গান গাইবার শিল্পীরও অভাব। শুনলে মনে হয় একই ধরনের গান গাইছে। গানের কোনও বৈচিত্র নেই। চিত্রনাট্যকার নেই ভাল। তেমন লেখক নেই। কোনও ভাল জুটি নেই।

প্রশ্ন: কেন নেই?

হরনাথ: তৈরি হয়নি। যাঁরা করছেন, তাঁদের ছবি চলছে না। না আঁতেল, না বাণিজ্যিক— সবটা মিশিয়ে ফেলছেন। হাতে গোনা দু’এক জন আছেন। না হলে তো প্রযোজকই গল্প লিখছেন। দর্শকের ভাল লেগে গেলে বাহবা নিচ্ছেন। আর ভাল না লাগলে কারও একটা ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাকাবাবু ‌কেমন লেগেছে পরিচালক হরনাথের? ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: এখনকার কোনও ছবিই তা হলে ভাল নয় বলতে চাইছেন?

হরনাথ: বাণিজ্যিক ঘরানার প্যাকেজ হিসাবে ‘প্রজাপতি ২’ আমার ভাল লেগেছে। সাধারণ মানুষের কথা ভেবে ছবিটা হয়েছে। বুম্বাদার (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) কাকাবাবু, কোয়েলের (কোয়েল মল্লিক) ‘স্বার্থপর’ ভাল লেগেছে। সবার কথা ভাবা হয়েছে। টালিগঞ্জে কিন্তু বক্স বলে আদপে কিছু নেই। ছবি চললে তবেই বক্স। পুজোর সময়ে তো কোনও ছবিই চলেনি।

প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রিতে এত হিট ছবির পরিচালক হওয়ার পরে কেন মনে হয় বর্তমানে বাংলা ছবি বেশি লাভের মুখ দেখছে না?

হরনাথ: আমাদের এখানে প্রচুর গল্প আছে। কাল্পনিক গল্প নয়, এখানে সাহিত্যের সম্ভার। কেউ তো আসলে গল্পই পড়ে না। কিন্তু বইমেলা হয়। সবাই ধুলো খেতে যায়। সে সব নিয়ে একটু ভাবুক সবাই। চিত্রনাট্য যদি ভাল করে তৈরি করা যায়, তা হলে সব দাঁড়িয়ে যাবে। এখন প্রযোজকেরা বলেন ১০ দিনে শুটিং করতে। সেটা করলে হবে না। গল্প অনুযায়ী পরিচালককে সময় দিতে হবে। সেই স্বাধীনতা দিলে বাংলা সিনেমা ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে রাজনীতি কি কিছুটা প্রভাব ফেলছে?

হরনাথ: রাজনীতি নিজের জায়গায়। ছবির সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। সুতরাং রাজনীতির উপরে দোষ চাপালে চলবে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement