নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। —নিজস্ব চিত্র।
সোনারপুরের মানুষ তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্থানীয়েরা কেউ হামলায় জড়িত নন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে আগে থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ওই এলাকায় লোক ঢুকিয়েছে বিজেপি। শারীরিক হেনস্থা নিয়ে এমনই অভিযোগ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নিশানা করলেন শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের পুলিশ-প্রশাসনকেও। নিজের ভাঙা চশমা দেখিয়ে বললেন, ‘‘মেরে ফেলতে চেয়েছিল আমাকে।’’
নিহত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে বসে অভিষেক জানান, তাঁর উপরে যে আক্রমণ হবে, বাইরে থেকে লোক ঢোকানো হচ্ছে, সেই খবর ছিল। কিন্তু পুলিশ-প্রশাসনের কেউ পদক্ষেপ করেননি। এমনকি, হামলা-অশান্তির সময় পুলিশ-প্রশাসনের কাউকে দেখা যায়নি। ফোন-মেসেজ করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। নিহত তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে বসে যখন তিনি ওই অভিযোগ করছেন, তখন বাইরে একদল নারী-পুরুষ অভিষেকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। তাঁকে বেরিয়ে আসতে বলছেন। অভিষেককে জলের বোতল এগিয়ে দেন নিহ তৃণমূল কর্মীর মা। অভিষেক তাঁকে ওই বোতল ঘুরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘আগে আপনি খেয়ে নিন।’’
ওই বাড়িতে বসে অভিষেক বলেন, ‘‘রাজ্য প্রশাসন কে চালাচ্ছে? তৃণমূল না বিজেপি? রাজ্য পুলিশকে ফোন, মেসেজ করার পরেও কোনও প্রতিক্রিয়া আসেনি। আমরা বার বার বলেছি, ওখানে বাইরের লোক ঢুকেছে। কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?’’ তিনি বলেন, ‘‘শাসকদল বা সরকার এ ভাবে দায় এড়াতে পারে না। আমি তো এখানে প্রশাসনকে জানিয়ে এসেছি। আমি কী করতে এসেছি এখানে? একজন মৃত সহকর্মীর বাড়িতে এসেছি। আইসি-কে বলেছি। তার পরেও পুলিশের কেউ একজন আসেনি। মুখে বললে হল? যারা এগুলো করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’’ অভিষেক আরও বলেন, ‘‘যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়, তাদের রাজ্য সভাপতির নাম শমীক ভট্টাচার্য। সেই ভারতীয় জনতা পার্টি রাজ্যের সরকার পরিচালনা করছে। মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির, পুলিশমন্ত্রী বিজেপির। জেলা পুলিশ, রাজ্য পুলিশ কার নির্দেশে চলে? তার পরেও পুলিশকে ফোন করার পরে ফোন ধরেনি। মেসেজের উত্তর দেয়নি।’’
অভিষেকের অভিযোগ, সকাল ১১টা থেকে বাইরে থেকে লোক এনে জড়ো করানো হয়েছিল। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে এবং পরিকল্পনা করে এই অশান্তি ঘটানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘লোক ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঢুকবে, তার পরেই আক্রমণ শুরু করবে। আমাদের সহকর্মীরা বুদ্ধি করে আগে থেকে দুটো হেলমেট জোগাড় করে রেখেছিল । আমার মাথা দু’টুকরো হয়ে যেত আজ। ইট-পাটকেল, ঢিল মেরেছে। আমার পোশাকের অবস্থা দেখুন।’’
ঘামে ভেজা, কাচা ডিম লেগে থাকা শার্ট দেখিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘‘এই বিজেপি সরকারের শাসনের নমুনা? মহিলাদের চুল ধরে টেনে ফেলে দিচ্ছে। আমার সহকর্মী যারা এসেছেন, দু’-তিন জন মহিলা, তাঁদের লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এটা বাংলার কৃষ্টি-সংস্কৃতি? আমার দীর্ঘ দিনের সহকর্মী মারা গিয়েছে। তার পরিবারের সঙ্গে আমি দেখা করতে আসতে পারি না? আমি এখানে কী করতে এসেছি যে আমাকে এ ভাবে আটকানো হল?’’
অভিষেক অভিযোগ করেন বহিরাগতদের দিয়ে হামলা করানো হয়েছে তাঁর উপর। তিনি বলেন, ‘‘মানুষ রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে, সৌজন্য বিনিময় করছে। বহিরাগত বিজেপির গুন্ডারা ইট-পাটকেল ছুড়ছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার চোখে সাত বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ১০ বছর আগে রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। ইট পাটকেল ছুড়েছে আমায়। ডান চোখ-বাঁ চোখ দু’দিকেই। চশমার অবস্থা দেখুন।’’ ভাঙা চশমা দেখিয়ে অভিষেক জানান, তাঁকে শারীরিক নিগ্রহ করেছেন বিজেপির লোকজন। আর তাদের লোকজন যদি কিছু করে না থাকেন, তা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? তিনি বলেন, ‘‘আমি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাই কোর্টে যাব। সুপ্রিম কোর্টেও যাব। পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গলরাজ চলছে?’’
তৃণমূল নেতার দাবি, গত ১৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেনি এ রাজ্যে। তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। অভিষেক বলেন, ‘‘যাঁরা আমাদের কটাক্ষ করতেন যে, আমরা বিশাল কনভয় নিয়ে ঘুরে বেড়াই। আজ কিছু নেই তা-ও মানুষের সঙ্গে। আর এই সরকারের কাছে আমি নিরাপত্তা আশাও করি না। যাঁদের আমলে নিরীহ মানুষদের উপরে অত্যাচার করা হয়, রাতারাতি বুলডোজ়ার চালিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হয়... হাজার হাজার তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী আক্রান্ত। সেই সরকারের নিরাপত্তা আমার প্রয়োজন নেই।’’
তিনি জানান, নিহত তৃণমূল কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করবেন তাঁরা। পিটিয়ে খুনের পরেও ওই কর্মীর পরিবারের অভিযোগ নেয়নি পুলিশ। আপাতত ওই নিহত কর্মীর বাড়ির লোকজনকে অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পুলিশকে নিশানা করে অভিষেকের কটাক্ষ, ‘‘সংবিধানকে সামনে রেখে নিয়ম অনুযায়ী কাজ করুন।’’ দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে অভিষেকের বার্তা, ‘‘আগামিদিন কারও উপর এমন আক্রমণ হলে পাশে থাকব। আমার সকল সহকর্মীকে কুর্নিশ জানাচ্ছি। লড়াই শরু হয়েছে। এই লড়াইয়ের শেষ আমরা দেখে ছাড়ব। ময়দান ছেড়ে পালাব না।’’