অনীকের সঙ্গে কয়েক মাস আগে দেখাও হয় দেবদূতের! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
প্রয়াত অনীক দত্ত। মৃত্যুর খবর শুনে স্তম্ভিত দেবদূত ঘোষ। বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরিচালক আর নেই। শোকজড়ানো গলায় জানালেন, কিছু দিন আগেই কথা হয়েছিল অনীক দত্তের সঙ্গে। রাহুল অরুণোদয়ের পরে অনীক দত্ত— দুই মৃত্যুই বড় ধাক্কা, জানান দেবদূত।
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন দেবদূত। কিন্তু অনীক দত্তের সঙ্গে তার আগেই কাজ করেছিলেন তিনি। স্তম্ভিত অভিনেতা বলেন, “আমি এই মাত্র খবর পেলাম। বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না। অনীকদার সঙ্গে দীর্ঘ পরিচয় আমার। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর বহু আগে ওঁর সঙ্গে আলাপা। ওঁর পরিচালনায় বিজ্ঞাপনে কাজ করেছি।”
শুধু অভিনয় নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শেও রয়েছে মিল। বামপন্থী অনীককে নিয়ে দেবদূত বলেন, “অনীকদার মতো সরল সোজা মানুষ খুব কম হয়। ওঁর পরিষ্কার মনে কিছু আড়াল থাকত না। যা মনের মধ্যে থাকত, তা-ই মুখে বলতেন। অনীকদার এমন মর্মান্তিক পরিণতি, ভাবতেই পারছি না।” অনীক দত্তের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি অবসাদে ভুগছিলেন? ১৭ মে পরিচালক একটি পোস্ট করেছিলেন। কালো পশ্চাদ্পটে ইংরেজিতে লেখা ‘মা’। সেই পোস্টের নীচেই দেবদূত লিখেছিলেন, “দাদা, সাবধানে থাকবেন।” অবসাদ নিয়ে অভিনেতা বলেন, “অনীকদা অসুস্থ ছিলেন ঠিকই। কিন্তু অবসাদে রয়েছেন এমন মনে হয়নি। বরং আশার কথাই বলতেন। বামপন্থা নিয়ে আশাবাদী ছিলেন।”
বামপন্থার সঙ্গে ঠিক কতটা যোগ ছিল পরিচালকের, তা-ও জানান দেবদূত। তাঁর কথায়, “বামপন্থী চর্চা বা পড়াশোনার মাধ্যমে উঠে আসেননি তিনি। তবে বামপন্থী মানুষের জীবনযাপন, স্বচ্ছতা ওঁকে আকৃষ্ট করেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রতি আগ্রহ থেকে বিষয়টি আরও বাড়তে থাকে। অনীকদা নিজে মার্কসবাদী মানুষ, এমন নয়। তিনি আসলে বামপন্থাকে ভিতর থেকে ভালবাসতেন।”
যে কোনও বিষয় নিয়ে চাচাছোঁলা প্রতিবাদ করতেন অনীক। নন্দনে ছবি মুক্তির সুযোগ না পাওয়া থেকে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে সলমন খানের উপস্থিতির কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি। দেবদূতের কথায়, “স্পষ্টবাদী ছিলেন। ‘ভবিষ্যতের ভূত’ নিয়ে বিতর্কের সময়ে সরাসরি বলেছিলেন, ‘ছবির জগতের মানুষের থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বেশি কেন?’ এই প্রশ্ন তোলার মতো সাহস ছিল ওঁর। তার পর থেকে নন্দনে আর ওঁর ছবি সুযোগ পেত না।”
নিয়মিত যোগাযোগ ছিল অনীক দত্তের সঙ্গে দেবদূতের। তবে সামনাসামনি দেখা হয়নি বহু দিন। অভিনেতা বলেন, “অনীকদার ম্যানেজার ছিলেন নান্টুদা। তিনি প্রায়ই ফোন করতেন আমাকে। তিনিই কয়েক দিন আগে ফোন করে বলেন, ‘এক দিন দেখে আসি অনীকদাকে। শরীর ভাল নেই। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা হয়েছে।’ কথা জড়িয়ে যেত ওঁর।”
অনীক দত্তের সঙ্গে ফোনে কথা হলে রাজনীতি নিয়েই বেশি কথা হত দেবদূতের। স্মৃতি হাতড়ে অভিনেতা বলেন, “আমরা বামপন্থী কর্মীরা মনের জোর পেতাম ওঁর সঙ্গে কথা বলে। নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ দীপ্সিতা, মিনাক্ষীদের খুব পছন্দ করতেন। আশা করতেন, আমাদের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে একটা বদল আসবে। গত ২২ মে জন্মদিন ছিল।”
শেষ কবে দেখা হয়েছিল পরিচালকের সঙ্গে? দেবদূতের বক্তব্য, “মাস খানেক আগে ফোনে কথা হয়েছিল। তার আগে ওঁকে বাড়িতে দেখতে গিয়েছিলাম। খুব অসুস্থ ছিলেন। ছবি নিয়ে কোনও কথা হয়নি। দেখা হলেই জানতে চাইতেন, প্রচার কেমন করছি। মানুষ কেমন সাড়া দিচ্ছে। আর একটা কথা প্রায়ই বলতেন ইদানিং, ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ হয়তো আমার শেষ ছবি। আর মনে হয় কাজ করা হবে না।’ শরীরের জন্যই বলতেন এই কথা। তাই আর নতুন কোনও কাজ নিয়েও কথা বলেননি তিনি।”
একই বছরে দুই বামমনস্ক শিল্পীর অস্বাভাবিক মৃত্যু। গত ২৯ মার্চ রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু। ২৭ মে অনীক দত্ত প্রয়াত। এমন ঘটনায় তাই থমকে গিয়েছেন দেবদূত। তাঁর কথায়, “কাকতালীয় ঘটনা। দুইয়ের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে, এমন নয়। তবে আমাদের বামপন্থীদের কাছে এই দুই ঘটনাই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। দু’জনেই উৎসাহ দিতেন। তাই মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।”