Exclusive Interview Of Sudipto Sen

গোটা পৃথিবী ঘুরে দেখতে পাচ্ছি, ধর্মই মানুষকে শান্তি দিচ্ছে না! এই নিয়েই যত সমস্যা: সুদীপ্ত

কেরল থেকে বাংলার চড়ক। পরিচালক-প্রযোজক সুদীপ্ত সেনের গতিপথ বদলাল কেন? কেনই বা তাঁর ছবি ঘিরে এত বিতর্ক? তিনি কি ইচ্ছা করেই এই বিষয় বাছেন?

Advertisement

উপালি মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৫
Share:

অকপট পরিচালক-প্রযোজক সুদীপ্ত সেন। ছবি: ফেসবুক।

সুদীপ্ত সেনের কি বিতর্কলগ্নে জন্ম? জবাব খুঁজছেন তিনিও। তিনটি ছবি বানিয়েছেন। একটিও ‘শান্তি’ দেয়নি তাঁকে! ‘প্রোপাগান্ডা ছবি করিয়ে’র তকমা নিয়েই কলকাতায় ‘চড়ক’ ছবির প্রযোজক। আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে রাজনৈতিক আড্ডা দিলেন? না কি ধর্মগন্ধী?

Advertisement

প্রশ্ন: কলকাতায় স্বাগত, শহরটাকে কেমন লাগছে?

সুদীপ্ত: কলকাতা তো আমার শহর। আমি উত্তরবঙ্গের ছেলে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা এই শহরেই। এখন অবশ্য কম আসা হয়। কিন্তু যখনই আসি, পুরনো দিনে ফিরে যাই। ইদানীং ছবির পরিচালক বা প্রযোজক হিসাবে আসছি। তাতে একটু যেন বাড়তি খাতিরযত্ন পাই। (হা হা হাসি)

Advertisement

প্রশ্ন: কলকাতা বদলেছ‌ে?

সুদীপ্ত: বদলায়নি। যেটুকু বদলেছে সেটা পরিকাঠামোগত বদল। না বদলানোটাই ভাল। ছবির কারণে সারা পৃথিবী ঘুরে দেখলাম, কলকাতার বুকে নতুন আর পুরনোর অদ্ভুত শান্তিপূর্ণ সহবাস। ভিক্টোরিয়াল মেমোরিয়াল হল বা ময়দানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে এখনও কলেজবেলা পিছু ডাকে। আবার, মেট্রো বা বহুতল এই প্রজন্মের কথা বলে। মুম্বইয়ে এই সহাবস্থান নেই! পুরো জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছে।

প্রশ্ন: ছবির দুনিয়া বলছে, সুদীপ্ত সেন নাকি বদলে গিয়‌েছেন! ‘কেরল স্টোরি’ থেকে বাংলায় পা। সেখানকার ধর্মীয় উৎসব ‘চড়ক’ এ বারের ছবির বিষয়।

সুদীপ্ত: (একটু সময় নিয়‌ে) ‘কেরল স্টোরি’-তে তিন জন অত্যাচারিত নারীর গল্প দেখাতে চেয়েছিলাম। ওঁদের জীবন খুব কাছে থেকে দেখেছি। কোচি থেকে ৩০ কিমি দূরে বিদ্যুৎহীন, জলহীন বাড়িতে ১২টি মেয়ের বাস। ওঁরা আইসিস জঙ্গিগোষ্ঠীর শিকার। ছবি বানানোর পর শুনলাম, আমি নাকি রাজনৈতিক ছবি বানিয়েছি! কেন এমন কথা বলা হল? কারণ, আমাদের দেশে দরিদ্রকে খাবার দিতে বললে সেটাও নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ‘বস্তার’ বা ‘চড়ক’-এও মানুষের সমস্যার কথা বলেছি। আমার মনে হয়েছে, যে বাঙালি পরিচালক ‘কেরল স্টোরি’ বানাতে পারেন, তাঁর পক্ষেই ‘চড়ক’ বানানো সম্ভব। এর জন্য আমি গর্বিত।

কলকাতায় প্রচারে টিম ‘চড়ক’। ছবি: সংগৃহীত।

প্রশ্ন: ‘চড়ক’-এ সমাজের কোন দিক তুলে ধরেছেন?

সুদীপ্ত: বাংলার ‘চড়ক’ বহু যুগের আগের। কথিত আছে, চৈত্রসংক্রান্তির এই বিশেষ দিনে দেবী কালী আর মহাদেব একসঙ্গে মর্ত্যে নেমে আসেন। তাঁদের আবাহনের দিন। তাই মেলায় যেমন গাজন সন্ন্যাসীদের দেখা যায়, তেমনই কালীর উপাসনায় নরবলি হয়! প্রত্যন্ত গ্রামে এই কারণেই তিনটি শিশু হঠাৎ উধাও। এ ঘটনা শুধুই বাংলার নয়। ২০২৪-এ হাথরসে একটি স্কুলের রেজাল্ট খারাপ হতে থাকায় তন্ত্রমতে একটি দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুকে বলি দেওয়া হয়েছিল! বিদেশেও এই ঘটনা ঘটে। একদিকে প্রযুক্তির চূড়ান্ত উন্নতি। আর একদিকে কুসংস্কারের এই অবস্থান! মানা যায়? যে ভাবেই হোক, বন্ধ করতে হবে এই কুপ্রথা। সে কথাই বলবে এই ছবি।

প্রশ্ন: আপনার প্রত্যেক ছবিতে ধর্ম থাকবেই। সুদীপ্ত সেন ধর্মগন্ধী না ধর্মবিরোধী?

সুদীপ্ত: জলপাইগুড়িতে আমাদের যৌথ পরিবার। সেখানে সব পুজো হয়। ইজ়রায়েল থেকে ঘুরে এলাম সম্প্রতি। অন্যান্য দেশও ঘোরা। সব ধর্মকেই খুব কাছে থেকে দেখে বুঝলাম, ধর্ম নিয়ে সাধারণ মানুষের যত সমস্যা। ধর্ম মানুষকে শান্তি দিচ্ছ‌ে না।

প্রশ্ন: সে তো ভারতেও! এখানে কে কী পরবেন, কোন মাংস খাবেন— ধর্মের জিগির তুলে সেটাও ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।

সুদীপ্ত: তার পরেও বলব, ধর্ম নিয়ে আমার কোনও বার্তা নেই। কিন্তু ধর্মের কুপ্রভাবে বিশ্বে অশান্তি। তার বিজ্ঞানসম্মত প্রতিবাদ আমার তিনটি ছবিতে। জানেন, ইয়োরোপের চার্চগুলোয় এই প্রজন্ম যায় না! চার্চ এখন নানা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। প্যারিসের কিছু ধর্মস্থান এখন দর্শকের দ্রষ্টব্য স্থান। সেখানে আর প্রার্থনা হয় না। মানুষ এখন বুঝতে শিখেছ‌ে, ধর্ম মানুষের উন্নতির সহায়ক নয়। আমিও সেই স্রোতে গা ভাসিয়েছি।

প্রশ্ন: আপনার ছবি দ‌েখে তো সে কথা কেউ বলছ‌েন না! সবাই বলেন আপনার ছবি আদতে ‘প্রোপাগান্ডা’।

সুদীপ্ত: আমি কি পাগল? কখনও বিজেপি-র পক্ষে, কখনও বিজেপি-র বিপক্ষে, কখনও আবার বামদলের হয়ে কথা বলি? প্রত্যে‌ক বার মানুষের কথা বলি। বাকিরা রাজনৈতিক রং খোঁজেন। কারণ, এখন প্রেম-ভালবাসাতেও রাজনীতি ঢুকে পড়েছ‌ে। তবে হ্যাঁ, আমি ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরোধিতা করবই। এটা শুধুই বিশ্বের নয়, আমাদের দেশেরও সমস্যা। এর জন্যই প্রত্যেক দেশ থেকে দলে দলে মানুষ উদ্বাস্তু। এটা এখন এক ভয়ঙ্কর সমস্যা। আমি কোনও ‘প্রোপাগান্ডা’ ছবি বানাই না।

‘চড়ক’ ছবিতে কোন কুসংস্কারের দিকে আঙুল উঠবে? ছবি: ফেসবুক।

প্রশ্ন: ‘কেরল স্টোরি’ যদি নরেন্দ্র মোদীর জন্য বানান, ‘চড়ক’ দেখে কি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুশি হবেন?

সুদীপ্ত: (হা হা হাসি) আজ থেকে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ছবি। কিছু জন দায়িত্ব নিয়ে বলবেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘চড়ক’ মুক্তি পাচ্ছে। এতে সন্তবিরোধী কথা আছে। তাতে না কি রাজ্যের মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক জোরালো হবে! যেমন, ২০২৩-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে ‘কেরল স্টোরি’ মুক্তি পে‌য়েছিল।

প্রশ্ন: এমনও শুনতে পারেন, সর্বধর্মসমন্বয়ের মতোই সর্বরাজনীতিসমন্বয় ঘটানো আপনার লক্ষ্য! তিনটি ছবিতে সব রাজনৈতিক দলকেই ছুঁয়ে গিয়‌ে‌ছ‌েন।

সুদীপ্ত: (আবার হাসি) কিচ্ছু করার নেই। যে রাজনৈতিক দল মানবতাবিরোধী, আমি তার ঘোর বিরোধী। সেই প্রতিবাদ আমার ছবিতে থাকবেই। সেই জন্যই আমার ছবি দেখতে দর্শক পছন্দ করেন। মুম্বইয়ে ‘চড়ক’-এর বিশেষ প্রদর্শনে সব দলের লোকেরাই এসেছিলেন। প্রত্যেকে ছবির শেষে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছেন। কেউ কিন্তু রাজনৈতিক ছবি বলেননি।

প্রশ্ন: হিট পরিচালক হয়েও কেন ‘কেরল স্টোরি ২’র পরিচালক নন? প্রযোজক বিপুল শাহ আপনার চিত্রনাট্যের নিন্দা করেছেন!

সুদীপ্ত: (দম নিয়ে) বিপুল স্যরকে সম্মান করি। তাই ওঁকে নিয়ে কিছু বলব না। আমার কথা বরং বলি। ‘কেরল স্টোরি’-তে যে বিষয় নিয়ে বলা হয়েছে, ফ্র্যাঞ্চাইজ়িতে পটভূমি বদলে গিয়েছে। কেরলের বদলে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান। আমি কেরলের গল্প জানি। মধ্যপ্রদ‌েশ, রাজস্থানের গল্প জানি না। না জেনে, গবেষণা না করে কাজের পক্ষপাতী নই। উত্তরবঙ্গ‌ের চড়কমেলা নিজের চোখে দেখা। এই পার্বণের ইতিহাস-ভূগোল জানি। তাই এই ছবিতে আছি। ‘ক‌েরল ২’-তে নেই।

প্রশ্ন: যেমন ‘চড়ক’ পরিচালনা করেও শিলাদিত্য মৌলিকের নাম সে ভাবে কোথাও নেই!

সুদীপ্ত: আছে তো! আসলে, আমার নাম তুলনায় বেশি পরিচিত। তাই ‘সুদীপ্ত সেনে‌র ছবি’ বলা হচ্ছে। বাস্তবে আমরা দুই পরিচালক ভাগাভাগি করে কাজ করেছি। সেটে আমি বসে থেকেছি। শিলাদিত্য পরিচালনা করেছেন। প্রচারে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবমঞ্চের দায়িত্বে আমি। তা ছাড়া, শিলাদিত্য এখন বিদেশি প্রযোজনার একটি ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত। আমাদের মধ্যে বিরোধ নেই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement