Anoushka Shankar

‘কলকাতা বহু দিন ধরে টানছে,’ ভারত সফরে আসার মুখে বললেন রবিশঙ্করের শিল্পী-কন্যা অনুষ্কা

কলকাতায় অনুষ্ঠান করবেন সেতারশিল্পী অনুষ্কাশঙ্কর। তার আগে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় পণ্ডিত রবিশঙ্করের লন্ডনবাসী কন্যা।

Advertisement

সুচন্দ্রা ঘটক

শেষ আপডেট: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০০
Share:

সেতারশিল্পী অনুষ্কাশঙ্কর। ছবি: সংগৃহীত।

পিতা গুরু, পিতাই পথপ্রদর্শক।

Advertisement

সব ভাবনায়, সব কাজেই যেন এখনও জড়িয়ে আছেন তাঁর বাবা! কলকাতার সাংবাদিকের সঙ্গে কথা এগোতেই তাই বাবার প্রসঙ্গ তোলেন সেতারশিল্পী অনুষ্কাশঙ্কর। শুধু সঙ্গীতশিক্ষা নয়, জীবনদর্শন তৈরির নেপথ্যেও সেই তিনিই আছেন, কথায় কথায় বুঝিয়ে দিতে ভোলেন না শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করের লন্ডনবাসী কন্যা।

বাবার শহর, তাঁর নয়। তবে এ দেশে এলে এক বার কলকাতায় ঘুরে না গেলে মনটা ভাল লাগে না অনুষ্কার। এ শহরে শুধু যে বাবার পরিবারের অনেকে আছেন, তা তো নয়, সঙ্গীতজগতের পরিজনদেরও দেখতে ইচ্ছা করে। তাঁরাও বাবার জগতের কাছাকাছি নিয়ে যান অনুষ্কাকে। তাই কাজের পরে একটা গোটা দিন হাতে রাখছেন শুধু তাঁদের জন্য। সচরাচর তো আসা হয় না এ দেশে। লন্ডনে দুই পুত্রকে নিয়ে সংসার। ব্রিটিশ চলচ্চিকার স্বামী জো রাইটের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকে একাই দেখভাল করেন সন্তানদের। অনুষ্কা বলেন, ‘‘একা মায়ের অনেক ব্যস্ততা থাকে। বুঝতেই পারছেন, খুব বেশি সময় বাড়ি থেকে দূরে কাটাতে পারি না।’’ তবে পরিজনদের দেখতে ইচ্ছা করে খুব। অন্য কথা থামিয়ে আবার বলেন, ‘‘আগের বার কলকাতায় যাওয়া হয়নি। তাই এ বার যখন ঠিক হল, ‘ইন্ডিয়া ট্যুর’ করব, তখনই বলে রেখেছিলাম, কলকাতা যেতেই হবে!’’

Advertisement

২০২৬ সালে যে এ দেশে আসবেন, তা আগেই ঘোষণা করেছিলেন অনুষ্কা। ১৯৯৫ সালে প্রথম শুরু হয়েছিল যাত্রা। সেতার হাতে একা মঞ্চে সেই প্রথম দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সে-ও হয়েছিল এ দেশে। পণ্ডিত রবিশঙ্করের ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে। এ বার অনুষ্কার সঙ্গীতজীবনের ৩০ বছর উদ্‌যাপনের পালা। সে উপলক্ষে শিল্পীর ‘ইন্ডিয়া ট্যুর’ শুরু হচ্ছে শুক্রবার থেকে। প্রথম গন্তব্য হায়দরাবাদ। সব শেষে আসবেন কলকাতায়। ৮ ফেব্রুয়ারি। সে সন্ধ্যায় নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান করবেন। সেই দিনটি নিয়ে বিশেষ উত্তেজনা শোনা যায় টেলিফোনের ও-পার থেকে। তার আগে হায়দরাবাদ ছাড়াও বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুণে, দিল্লি শহরে অনুষ্ঠান করবেন অনুষ্কা।

পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে কন্যা। ছবি: সংগৃহীত।

‘ইন্ডিয়া ট্যুর’ সাধারণত করেন ভিন্‌দেশি শিল্পীরা। ভারতীয় গুণীজনেরা যখন দেশের নানা শহরে অনুষ্ঠান করেন, তখন ঠিক এমন একটি তকমা দেওয়া হয় না সেই অনুষ্ঠানকে। কিন্তু তিনি যে এ দেশেরই কন্যা। মা-বাবা দু’জনেই ভারতীয়। নিজেও থেকেছেন এ দেশে। তবে নিজেকে কি সে অর্থে ভারতীয় মনে করেন না তিনি? বেশিটা বাঙালি, না কি অধিকাংশটাই তামিল অনুষ্কা?

প্রশ্ন শুনে আগেই হাসি পায় তাঁর। ফোনের ও-পার থেকে তার শব্দও ভেসে আসে। ৪৪ বছরের বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠ তার পরে জানিয়ে দেয়, আসলে কোনওটাই ঠিক তিনি নন। অনুষ্কার মধ্যে যেমন আছে কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি (সেখানে ছোটবেলার অনেকটা কেটেছে), তেমনই আছে লন্ডন কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার এনসিনিটাস— যেখানে কেটেছে শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। সব মিলিয়েই তিনি। ঠিক যেমনটা তাঁর সুর-সঙ্গীত, তেমনই তিনি। অনুষ্কা বলেন, ‘‘সব জায়গা থেকে শিখেছি। সব জায়গা থেকেই কিছু না কিছু পেয়েছি। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছি।’’ কোনও মানুষ একরৈখিক হন বলে মনেই করেন না বহুমুখী সঙ্গীতচর্চায় জড়িয়া থাকা এই নারী। যেমন ভারতীয় উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে তাঁকে পাওয়া যায়, তেমনই তাঁর বাজনায় জুড়ে যায় জ্যাজ় কিংবা লন্ডন পপ অথবা ফ্ল্যামেঙ্কো। ১৩ বার গ্র্যামি মনোনীত অনুষ্কা কথায় কথায় বলেন, ‘‘আসলে নানা জায়গার সঙ্গীত নিয়ে বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই বহু জায়গার গান ও বাজনা শুনেছি। সবটা আগলে ধরে রেখেছি নিজের মধ্যে। নিজের কাজে সে সব প্রকাশ করতে ভাল লাগে। মনে হয় সেতারের কত রূপ আছে, তা তো দেখা দরকার। গিটার যেমন বহু ধারার সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়, সেতারও তেমন ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে!’’

কন্যার এতশত ভাবনা ও অনুভবের উপরেও কি স্পষ্ট ভাবে পিতৃ-প্রভাব রয়েছে? ‘‘বড় হওয়া আর সঙ্গীত শিক্ষা, দু’টি আলাদা দিক। বাবা দু’ক্ষেত্রে দুই ভাবে জড়িয়ে আমার জীবনে। গুরু হিসাবে আমার বাবা ছিলেন একেবারে আলাদা। আর অভিভাবক হিসাবে তো তিনি কত কিছুই শিখিয়েছেন,’’ বলেন অনুষ্কা। সে সবের সম্মিলিত রূপটিই কন্যার ভাবনার জগৎ।

ছবি: সংগৃহীত।

শুধু শিল্পী নন, সমাজকর্মী হিসাবেও পরিচিতি আছে অনুষ্কার। শরণার্থীদের সমস্যা থেকে নারী আন্দোলনের হয়ে এগিয়ে যাওয়া, নানা সময়ে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তিনি যদিও নিজেকে সমাজকর্মী মনে করেন না। তাঁর মতে, সেটি আলাদা একটি কাজ। বহু জনে নিজেদের সবটা দিয়ে সে কাজ করেন, তিনি শুধু এক জন শুভ চিন্তাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসাবে তাতে সঙ্গ দেন। আবার ফিরে আসে পণ্ডিত রবিশঙ্করের কথা। তাঁর কন্যা বলেন, ‘‘আসলে এ সবও তো বাবার থেকেই শেখা। যাঁর বিরুদ্ধে কোনও অন্যায় হচ্ছে, বাবা পাশে থাকতেন। তাঁকে দেখেই শিখেছি। তিনি তো বাংলাদেশের জন্য প্রথম বেনিফিট কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন। আমি এটুকু করব না?’’

যে দেশেই থাকুন না কেন, এ দেশ পণ্ডিত রবিশঙ্করের কন্যাকে আপন বলেই মানে। সেই আপনজনের ঘরে ফেরা উপলক্ষে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে নানা শহরে। কথোপকথনের শুরুতেই অনুষ্কা বলে দিয়েছিলেন, কলকাতা টানছে তাঁকে। ফলে এ বছরের ভারত সফরের শেষ ঠিকানা এ শহরই। এক দিন অনুষ্ঠান করেই পিতৃভূমি ছাড়বেন না গ্র্যামি-মনোনীত যন্ত্রশিল্পী। এখানে আরও একটা দিন কাটাবেন প্রিয়জনেদের সঙ্গে। তার পরে ফিরবেন নিজের সংসারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement