Rahul Arunoday banerjee

পাড়ার কদম গাছের নীচে এখনও রাখা রাহুলের নতুন বাইক! ছন্দে ফিরলেও ‘বাবিন’কে হারানোর শোক পল্লিশ্রীতে, আছে ক্ষোভও

গত ৪৮ ঘণ্টায় বিজয়গড়ের ছিমছাম পল্লীশ্রী কলোনির উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছে। তারকা থেকে নেতা, নানা জনের দেখা মিলেছে। ফেরেননি শুধু পাড়ার ছেলে ‘বাবিন’। কেমন আছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাড়া?

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ ২০:২৫
Share:

কেমন আছে রাহুলের প্রিয় পাড়া? গ্রাফিক: সনৎ সিংহ।

গত দুটো দিন ঝড়ের মতো কেটেছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে বিজয়গড়ের পল্লীশ্রী। সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি, অনন্যা আবাসনের নীচে যে দোকানগুলি বন্ধ ছিল, এক এক করে শাটার খুলেছে। পাড়ার চায়ের দোকানি এক কোনায় চা বানাচ্ছেন। বয়স্কেরা গাছের তলায় জড়ো হয়ে বসেছেন। শুধু যুক্ত হয়েছে পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে বাবিনের গলায় মালা দেওয়া ছবি।

Advertisement

গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে বিজয়গড়ের এই ছিমছাম পাড়াটার উপর দিয়ে বড় ঝঞ্ঝা বয়ে গিয়েছে। একে দুঃসংবাদ, তার উপর নেতা-মন্ত্রী-তারকাদের ভিড়। আর এ সবের মধ্যে পাড়ার ছেলে বাবিন ওরফে অভিনেতা রাহুলের অকস্মাৎ মৃত্যুর খবর আসার পর থেকে দুঃখ, ক্ষোভ, হতাশা, চিন্তায় থমথমে পরিস্থিতি গোটা পাড়ায়।

গত দু’দিনে রাহুলের বাড়ির চারপাশেই সময় কাটিয়েছেন পড়শিদের অনেকে। ঠিক করে রান্নাও হয়নি অধিকাংশ বাড়িতে। কারও কাছে এ যেন পুত্রশোক, কারও কাছে বন্ধুকে হারানোর দুঃখ। গত দু’দিন ধরে পাড়ায় তারকাদের আনাগোনা, সংবাদমাধ্যমের ভিড়। রবিবার আর সোমবার চেনা পাড়ার চেহারাই বদলে গিয়েছিল যেন। রানিকুঠী থেকে যাদবপুর ৮বি যাওয়ার অটোর রুট পর্যন্ত ঘুরিয়ে ফেলা হয়েছিল।

Advertisement

শুনশান রাহুলের পাড়া। নিজস্ব চিত্র।

রাহুল নেই, অনন্যা অ্যাপার্টেমন্টের উল্টো দিকে বড় করে লাগানো হয়েছে তাঁর ছবি। গলায় রজনীগন্ধার মালা। তিনতলার বারান্দা ফাঁকা। উপরে অভিনেতার মা রয়েছেন, আছেন পরিবারের অন্য সদস্যেরা। সকলেই এখন অভিনেতার দাদার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। আয়ারল্যান্ড থেকে বুধবার ফেরার কথা তাঁর।

গতিময়তাই জীবন। কাজে ফিরতে হবেই। কিন্তু যে ঝড় বয়ে গিয়েছে, তার ভয়াবহতাকে এখনও মানতে পারছেন না পাড়ার অনেকেই। অভিনেতার বাড়ির নীচে আড্ডা দেন স্বপন মজুমদার। পাড়ার সকলের কাছে ‘ভাইয়াদা’ নামেই পরিচিত। তিনি বলেন, ‘‘পাড়াটা ফাঁকা লাগছে। দেখা হলেও বলত কাকু ভাল আছো? মাথা নিচু করে যাতায়াত করত। মনে হচ্ছে কে যেন চলে গেল একটা। সোমবার পাড়ায় যে কত লোক ছিল, বোঝাতে পারব না। রাহুলের মৃত্যুতে এত লোক হবে ভাবতে পারিনি! ও তো পাড়ায় কখনও তারকাসুলভ কিছু আচরণ করেনি।’’

রাহুলের ছবির সামনে রাখা তাঁর সদ্য কেনা বাইক। নিজস্ব চিত্র।

অভিনেতার মৃত্যুর খবর পেয়ে গাড়ি ভাড়া করে তমলুক চলে গিয়েছিলেন চায়ের দোকানি রবিনদা। প্রায় সময়েই পাড়ার এই দোকানে চা খেতেন রাহুল। চিনি ছাড়া লাল চা। আর যখন জিম করতেন, সেই সময় কালো কফি চিনি ছাড়া এক কাপ। রবিন বলেন, ‘‘ঈশ্বর আমায় কেন নিয়ে গেল না! ওর মতো একটা মানুষের তো সকলের দরকার ছিল। আমার জীবন বাঁচা হয়ে গিয়েছে, ওর তো জীবন অনেক বাকি ছিল। এত ভদ্র ছেলে যে ভাবা যায় না। কখনও মুখে একটা গালিগালাজ শুনিনি। ওর এমন হয়েছে শুনে চলে যাই তমলুকে।’’ চা দোকানি বলে চলেন, ‘‘যখন তমলুকে গেলাম, ততক্ষণে ও আর নেই। তালসারিতে যেখানে শুটিং হয়েছিল, সেই জায়গায় যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রোডাকশনের লোকেরা যেতে দেননি। আমরাও বেশি জোরাজুরি করিনি। ময়নাতদন্তের আগে লাশকাটা ঘরে ওকে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমার ছেলেটা বড় হয়ে ওর মতো অভিনেতা হতে চায়। রাহুল বলেছিল সুযোগ করে দেবে।’’ এক হাতে চা বানাচ্ছেন, তার সঙ্গে সঙ্গে নাগাড়ে রাহুলকে নিয়ে নানা কথা বলে যাচ্ছেন। শেষে তিনি বলেন, ‘‘জন্ম যখন হয়েছে মৃত্যু হবে, কিন্তু এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।’’

রাহুলের স্মৃতি যেন পাড়া জুড়ে। চায়ের দোকানের পাশে আর একটি বড় ছবি অভিনেতার। খানিক অল্প বয়সের ছবি। লেখা, ‘বিদায় কমরেড’। অভিনেতা নিজেকে বামপন্থী হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর মরদেহ নিয়ে সিপিআইএম-এর দীপ্সিতা ধর, অভিনেত্রী ঊষসী চক্রবর্তী-সহ অনেকেই স্নোগান দিতে দিতে কিছুটা দূর যান। সেই নিয়ে বিতর্ক সমাজমাধ্যমে। অভিনেতার প্রতিবেশী, তাঁর বাবার বন্ধু পাড়ার প্রবীণ প্রথমে সন্দেহ প্রকাশ করেন শুটিংয়ে সঠিক নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে। পাশপাশি তিনি বলেন, ‘‘গত দু’দিন ধরে আমাদের পাড়ার সকলেরই প্রায় খাওয়াদাওয়া বন্ধ ছিল। সকলেই অপেক্ষায় ছিল বাবিনকে শেষ বার দেখার জন্য। আমার বয়স হয়েছে, তাই শ্মশানে যেতে পারি না। তবে গতকাল এখানে ভাবতে পারবেন না কত ভিড় ছিল। সাধারণ মানুষ থেকে সংবাদমাধ্যম। তার মাঝেই হঠাৎ দেখলাম সিপিএম-এর নেতারা এসে দাবি করে বসলেন, ‘ও আমাদের’। এটা কেমন ব্যাপার? ও তো আমাদের সকলের বাবিন। এটা পাড়ার লোকেরা ঠিক ভাবে নেননি।’’

বেলা যত বেড়েছে, পাড়ায় যান চলাচল তত বেড়েছে। তা ছাড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত আর তেমন কোনও শব্দ নেই। অভিনেতার বাড়ির নীচে মোমোর দোকানে ধীরে ধীরে মোমো তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কেউ পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে নীরবে গণশক্তি পড়ছেন। কেউ দোকান সামলাচ্ছেন। কেনাবেচা হচ্ছে। তবে সবটাই যেন নীরবে।

এরই মাঝে পাড়ার চা দোকানে হাজির রাহুলের ছোটবেলার বন্ধু কচি। সোনার দোকানে কাজ করেন। হুগলির ছেলে, ৬ বছর বয়সে এই বিজয়গড় এলাকায় কাজ করতে আসেন। সেই সময় থেকে রাহুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব। কচির কথায়, ‘‘ওদের বাড়ির নীচে সোনার কারখানা ছিল। সেখানে অরুণ বাটখারা নিয়ে পালিয়ে যেত। ওকে ভয় দেখাতে ওখানে বন্ধ করে রাখতাম। ওর সঙ্গে কত যে স্মৃতি, বলে শেষ করতে পারব না। প্রথম সিগারেট খাওয়া ওর সঙ্গে। এক গেলাসের বন্ধু আমরা। ছয় মাসের ব্যবধানে আমার দু’জন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেললাম এক জ়ুবিন গার্গ, আর একজন অরুণ।’’ বলতে বলতে চোখ ভিজে গেল কচির। দোকান থেকে কিছুটা সময় বিরতি নিয়ে এসেছিলেন। যাওয়ার আগে বলেন, ‘‘কিছু দিন আগে বাইক কিনল। আমি বললাম এই ব্যাটারিচালিত বাইক কেন কিনলি? ও হাসল। এই তালসারি যাওয়ার আগে বলেছিল, ফিরে দেখা হবে।’’ ঠোঁটে হাসি। কিন্তু তখনও চোখের জল মুচছেন কচি। বিদায় নিলেন। বললেন, ‘‘আমি মুসলিম। কিন্তু ও কখনও ধর্মীয় ভেদাভেদ করেনি। আমি জানি ওর সঙ্গে দেখা হবেই। এ বার যাই। নয়তো দোকানে দেরি হয়ে যাবে।’’

অভিযাত্রিক ক্লাবের মাঠে রাহুলের পোস্টার। নিজস্ব চিত্র।

পাড়ার ভিতরে অভিযাত্রিক ক্লাবের মাঠে ইস্টবেঙ্গলের জার্সি পরা রাহুলের বড় ছবি। বাইকে দাঁড়ানো যুবক নিজে থেকেই বলেন, ‘‘বাবিনদা খেলার ভক্ত ছিল। জ্ঞানও ছিল অনেক। এমন যে হবে, তা কল্পনাতীত।’’

গত দু’দিন ধরে গান্ধী গেটের যে রাস্তা প্রায় গার্ডরেল দেওয়া ছিল, সেখানে এখন স্বাভাবিক জীবন। শুধু কদম গাছের তলায় একাকী দাঁড়িয়ে অভিনেতার সদ্য কেনা বাইক। পাড়ার আনাচ-কানাচে শুধু আক্ষেপ ‘কী-ই বা বয়স! এ কি চলে যাওয়ার সময়!’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement