‘ধুরন্ধর’-এর ‘প্রোপাগান্ডা’ নিয়েও কথা বললেন বিশ্বদীপ! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বক্সঅফিসের সমস্ত নজির ভেঙেছে আদিত্য ধর পরিচালিত ছবি ‘ধুরন্ধর’। ছবির নির্মাণ, অভিনয় সব নিয়েই প্রশংসা দিকে দিকে। তবে ছবির অন্যতম বিষয় হল এর শব্দ। কোন দৃশ্যে কী শব্দ ব্যবহার করা হবে, সেই বিষয়টিই অন্য মাপে নিয়ে গিয়েছে এই ছবিকে। এই শব্দপ্রয়োগের নেপথ্যে যিনি মূল কারিগর, তিনি হলেন বিশ্বদীপ চট্টোপাধ্যায়। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’, ‘রেনকোট’ থেকে শুরু করে ‘লগে রহো মুন্না ভাই’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘বাজিরাও মস্তানি’, ‘পদ্মাবত’, ‘মাদ্রাস ক্যাফে’ ‘উরি: দ্য সার্জিকাল স্ট্রাইক’ ছবিতে তিনিই শব্দযন্ত্রী, অর্থাৎ সাউন্ড ডিজ়াইনার। ‘ধুরন্ধর’-এ কাজ করার অভিজ্ঞতা কি ভিন্ন? ছবির বিরুদ্ধে ওঠা ‘প্রোপাগান্ডা’ তকমা নিয়েও কথা বললেন বাঙালি শিল্পী।
আদিত্যের বাড়িতে প্রথম ছবি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে গল্প শোনার আগেই পাকিস্তানের ‘লিয়ারি’ এবং রেহমান ডাকাত, বাবু ডাকাত চরিত্রগুলি নিয়েও ধারণা ছিল বিশ্বদীপের। তাঁর কথায়, “আমি ইউটিউবে বেশ কিছু ভিডিয়োয় আগেই দেখেছিলাম কতটা ভয়াবহ ছিল লিয়ারি। কারও কাটা হাত পড়ে রয়েছে, কারও আবার কাটা মুন্ডু রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। তবে ওখানে মাদক বেচাকেনার ব্যবসায় এগুলো নাকি খুবই সাধারণ বিষয় ছিল।” লিয়ারির কথা শুনেই তাই বিশ্বদীপ ভেবে নেন, কী ভাবে ছবির পরতে পরতে শব্দকে সাজাবেন।
ঋতুপর্ণ ঘোষ, সঞ্জয় লীলা ভন্সালী, সুজিত সরকার, রাজকুমার হিরানিদের সঙ্গে কাজ করেছেন বিশ্বদীপ। প্রত্যেকের ভিন্ন কাজের ধরন বলে জানান তিনি। কোন জায়গায় আদিত্য সকলের চেয়ে আলাদা? ২০ বছর আগে থেকে আদিত্য ধরকে চেনেন বিশ্বদীপ। সেই সময়ে বিনোদ চোপড়ার সহ-পরিচালক হিসাবে কাজ করতেন আদিত্য। স্মৃতি হাতড়ে বিশ্বদীপ বলেন, “বিনোদের সঙ্গে আদিত্য আমার স্টুডিয়োয় আসত। ওর মনে নানা রকমের প্রশ্ন ঘোরাফেরা করত। আমারও তখন থেকেই ভাল লাগে আদিত্যকে। খুব বুদ্ধিদীপ্ত ও। আর এখন ওকে দেখে মনে হয়, বয়সের তুলনায় ও অনেকটাই পরিণত। যতই কাজের চাপ থাকুক, ওর মাথা কিন্তু ঠান্ডা থাকে।”
‘ধুরন্ধর’-এর বিভিন্ন দৃশ্যের সাউন্ড ডিজ়াইনিং-এর অভিজ্ঞতা ভিন্ন বিশ্বদীপের। প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই শব্দের ব্যবহার বেশ ‘চ্যালেঞ্জিং’ ছিল। ‘ধুরন্ধর’-এর প্রথম ভাগে একটি বিয়েবাড়িতে বন্দুকের গোলাগুলি ও লড়াইয়ের দৃশ্য ছিল। সেই দৃশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘রাম্বা হো’ গান। তার মধ্যেই গোলাগুলি ও আবহের বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার। বিশ্বদীপ বলেন, “বিভিন্ন দৃশ্যেই গানের ব্যবহার রয়েছে। আবার তার সঙ্গে সাউন্ড এফেক্ট্স। দুটোরই প্রয়োজন। সেই সমতা বজায় রাখা বেশ ‘চ্যালেঞ্জিং’ ছিল। গানের জন্য শব্দ বা শব্দের জন্য গান চাপা পড়ে গেলে চলবে না।” দর্শক বর্তমানে ছবিতে শব্দের ব্যবহারকে আরও বেশি গুরুত্ব দেন এবং দর্শকের একাংশ শব্দের মাধ্যমে ছবিকে আরও ভাল করে অনুভব করার জন্য প্রেক্ষাগৃহে যান। মনে করেন বিশ্বদীপ।
ছবির নির্মাণের সঙ্গে দর্শকের মতে এই ছবির অন্যতম প্রাপ্তি জসকিরত ও হামজ়া চরিত্রে রণবীর সিংহ। পর্দার ওপারে তিনি কেমন? ছবিতে রণবীরের কণ্ঠেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। হামজ়া চরিত্রে তাঁর ভারী কণ্ঠের নেপথ্যে রয়েছে বিশেষ পরিশ্রম। বিশ্বদীপ বলেন, “রণবীর অসাধারণ। ওর কণ্ঠে ভারের প্রয়োজন ছিল। ওটা নিয়ে আমরা বহু কাজ করেছি। ওঁর ডাবিং-এর সময়ে কখনও কখনও বলতাম, ‘দুটো সিগারেট খেয়ে এসো।’ কারণ, আমার ও ভারী কণ্ঠের প্রয়োজন ছিল। ও ধূমপান করে আসত। তার পরে রেকর্ড করা হত।”
পর্দার ওপারে— রণবীর ও বিশ্বদীপ। ছবি: সংগৃহীত।
আরও একটি দৃশ্য ছিল যেখানে হামজ়া বিরিয়ানি খেতে খেতে সংলাপ বলছেন। সেই দৃশ্যের ডাবিং-এর সময়ে সত্যিই রণবীরকে বিরিয়ানি খেতে খেতে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছিলেন বিশ্বদীপ। খুশি হয়েছিলেন ছবির নায়ক। সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কথায়, “ও বিরিয়ানি খেতে খেতেই ডাবিং শুরু করল। যেটা চাইছিলাম, তখন সেটাই পেলাম। রণবীর খুব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।”
প্রথমে একটি ছবিই হওয়ার কথা ছিল। কোনও দ্বিতীয় ভাগের পরিকল্পনা ছিল না ‘ধুরন্ধর’ নিয়ে। তাই সময়ের অভাব ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ভাগের মুক্তি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই করতে হবে, এই পরিকল্পনা ছিল নির্মাতাদের মধ্যে। প্রথম ছবির রেশ থাকতে থাকতেই দ্বিতীয়টি নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল। যার ফলে প্রত্যেককেই কম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হয়েছে বলে জানান বিশ্বদীপ। তবে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন মহলে এই ছবি ঘিরে প্রশংসাই হচ্ছে।
অনেকেই এই ছবিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ হিসেবেও দেখেছেন। সেই বিষয়টিকে পরিচালক আদিত্য ধর কী ভাবে গ্রহণ করছেন? বিশ্বদীপের স্পষ্ট উত্তর, “মানুষের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত থাকেই। তাঁরা হয়তো ছবির রাজনীতির সঙ্গে সহমত নন। কিন্তু ছবির নির্মাণকে তাঁরা সমালোচনা করেননি। বহু তথাকথিত ‘প্রোপাগান্ডা’ ছবি তৈরি হচ্ছে নির্দিষ্ট কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য। কিন্তু এই ছবিটি সম্পূর্ণ আলাদা সেগুলির থেকে।”