টলিউডে মহিলাদের কী অবস্থান? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সংসদে এবং দেশের বিধানসভাগুলিতে, মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষণের বিষয়টি কবে কার্যকর হবে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়। কিন্তু অনিবার্য একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। যেখানে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোনও মহিলা নভশ্চর মাসের পর মাস মহাকাশে গবেষণা করে যেতে পারেন, দুর্গম শৃঙ্গ জয় করতে পারেন, সেই যুগে বসেও রাজনীতিতে তাঁদের সংরক্ষণের জন্য এত রাজনীতি হবে কেন? এখনও কি মহিলাদের হাতে সমান ক্ষমতা দিতে ভয় পায় ‘পুরুষকেন্দ্রিক’ ভারতীয় রাজনীতি?
যদিও দেশের বেশ কিছু দল ইতিমধ্যেই মহিলা জনপ্রতিনিধির সংখ্যা বাড়িয়েছে। সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য স্থানে রয়েছে এ রাজ্যের শাসক দলও। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, রাজ্যের শাসক দলের সেই মহিলা প্রতিনিধি-তালিকায় রয়েছেন বিনোদনজগতের কিছু মানুষ। গত কয়েক বছর ধরেই এই ‘ট্রেন্ড’ তৈরি করেছে তারা। বিরোধী বিজেপি দল থেকেও টলিউড অভিনেত্রী সাংসদ হয়েছেন আগে।
এই প্রেক্ষিতেই উঠে আসে বাংলার অন্যতম বিনোদনজগৎ টলিউডের প্রসঙ্গ। দেশের অন্যান্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নিরিখে টলিউড খুবই ছোট্ট একটা পরিসর। কিন্তু নিন্দকেরা বলে, পরিসর ছোট হলে হবে কী! সমস্যা এখানে নাকি পাহাড়প্রমাণ! গত কয়েক বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রির নানা ঘটনা থেকে শুটিংস্থলে এক অভিনেতার মৃত্যুর ঘটনা অন্তত তেমনটাই বলে। মহিলা বিল নিয়ে দেশ জুড়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে এখানেও প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে, টলিউডের কাজকর্মে মেয়েদের ক্ষমতায়ন কতটা? এই ইন্ডাস্ট্রিতে কি পুরুষদের সমান অধিকার মেয়েদের দেওয়া হয়? নাকি তাঁরা পুরুষদের তথাকথিত লিঙ্গ-রাজনীতির শিকার? জানতে চেয়েছিল আনন্দবাজার ডট কম। উত্তরে কী বললেন টলিউডের তিন অভিনেত্রী?
অপরাজিতা আঢ্য। তিন দশক ধরে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এই অভিনেত্রী। অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্য়ায়-নন্দিতা রায়ের মতো পরিচালকদের ছবিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা অপরাজিতার ঝুলিতে। তাঁর কথায়, ‘‘ছোটপর্দার গোল্ডেন পিরিয়ড-এর মানুষ আমি। টলিপাড়ায় কিন্তু মহিলাদের আলাদা জায়গা দেওয়া হত, তাদের জন্য আলাদা করে চরিত্রের কথা ভাবা হত। যেটা এখন ছবির ক্ষেত্রেও হয়। রাজনীতি, ষড়যন্ত্র অবশ্যই আছে, কিন্তু সেটা ছেলেমেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই আছে। অনেক সময়ে অনেকে মেয়েদের সুযোগ নিতে চায়। ছেলেদের হয়তো একরকম ভাবে বঞ্চিত করা হয়, মেয়েদের অন্য ভাবে। আমি তো টেলিভিশন, ছবি— সব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেই যুক্ত, সেখানে মেয়েদের আলাদা একটা জায়গা আছে। মহিলাদের ‘ডমিনেট’ করা হয়, এমন আমার মনে হয়নি।’’
আবার এই অপরাজিতার সঙ্গেই এই ইন্ডাস্ট্রিতে ঘটেছে বেনিয়ম। পুরুষদের কারণে অপরাজিতা কাজ থেকে বাদ পড়েছেন, এ ঘটনা ঘটেছে তাঁর সঙ্গে। অপরাজিতা বলেন, ‘‘এমন আমার ক্ষেত্রেও বহু বার হয়েছে যে, কোনও পুরুষের জন্য কাজ থেকে বাদ পড়েছি। খুব সম্প্রতিও এমন ঘটনা ঘটেছে। হয়তো আমার সঙ্গে কথা বলে, আমার ‘ডেট’ও নিয়ে নিয়েছেন নির্মাতারা, তার পরে খুব বোকা কারণ দেখিয়ে বাদ দিয়েছে। পরিষ্কার কারণ জানিয়ে কাজ থেকে বাদ দেওয়ার মেরুদণ্ড কারও নেই। সবচেয়ে বড় কথা হল, তারিখ নিয়ে নেওয়ার পরে কাজটা যে হচ্ছে না, সেটা এক বার জানায় না। ফোনও ধরে না তখন। আমি তো যথেষ্ট সিনিয়র, এমন ব্যবহার আমার প্রাপ্য নয়। কিন্তু, এমন হয়।’’
এই ধরনের বৈষম্য দূর করতে অপরাজিতার মতো অভিজ্ঞ অভিনেত্রী কি উদ্যোগী হবেন? অভিনেত্রীর জবাব, ‘‘আমি তো বৈষম্য দূর করার কেউ নই। আমার ক্ষমতা খুব সীমিত। আমার নিজের লড়াইটা আমি খুব জোর লড়ে নিতে পারি। এই যে আমার কাজ থেকে বাদ পড়ার কথা বললাম, এটা আমার কাছে একটা লড়াই। এটা আমার যুদ্ধ। আমি ঘটনাগুলো বলার ক্ষমতা রাখি। সকলে পারে না, কারণ সকলেরই কাজ হারানোর ভয় থাকে।’’
রূপাঞ্জনা মিত্র বাংলা টেলিভিশন ও বড়পর্দার পরিচিত নাম। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের পরে তিনি যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। তবে গত বছর তিনি গেরুয়া শিবির ছেড়ে রাজ্যের শাসক শিবিরের ছাতার তলায় এসেছেন বলে খবর। তাঁর বক্তব্য, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে নারী-পুরুষ সমানাধিকার কতখানি রয়েছে, সেটা যথেষ্ট ভাববার বিষয়। তবে তাঁর কথায়, ‘‘শুধু টলিউডের ক্ষেত্রে তো নয়, মেয়েদের ক্ষমতা দিতে সমাজই ভয় পায়।’’ টলিউডে এমন বৈষম্য দেখলে তিনি তা দূর করতে কি উদ্যোগী হবেন? রূপাঞ্জনার জবাব, ‘‘সেটা এখনই বলা কঠিন। এই লড়াই একেবারেই ব্যক্তিগত একটা লড়াই। লড়াই করেই জমি নিতে হয়। যে কোনও পেশার ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য তা প্রযোজ্য। এক জন মানুষ বা কর্মী হিসাবে, রোজগেরে মা হিসাবে, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয়, মানুষ মাত্রই তাকে উদ্যোগী হতে হয়, যাতে সমাজের ভারসাম্য বজায় থাকে।’’
অভিনেত্রী ঊষসী চক্রবর্তী বামপন্থী আদর্শের মানুষ। সক্রিয় ভাবেই দলীয় রাজনীতি করেন। তাঁর বক্তব্য, সমাজেরই প্রতিফলন ঘটছে ইন্ডাস্ট্রিতে। তাঁর কথায়, ‘‘সমাজেই যদি পুরুষ-নারী সমান না হয়, তা হলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে হবে কী করে! এটা শুধু ‘ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি’র সমস্যা বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। সমাজটাই তো যথেষ্ট পিতৃতান্ত্রিক। কর্পোরেট ক্ষেত্রে, পরিবারে, স্কুল-কলেজ সর্বত্রই তা প্রতিফলিত হয়।’’
টলিউডে কি লিঙ্গ-রাজনীতির শিকার হতে হয় মেয়েদের? ঊষসীর কথায়, ‘‘আমি আলাদা করে পুরুষদের এ ধরনের কোনও রাজনীতির মধ্যে পড়িনি। আবার এটাও সত্যি, যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁদের মধ্যে কখনও ‘ডমিনেটিং’ কাউকেও সে ভাবে পাইনি।’’
তবে ইন্ডাস্ট্রিতে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ থাক বা না থাক, মেয়েদের নির্যাতিতা হিসেবে দেখানো হলে সেই ধারাবাহিকের টিআরপি বেশি থাকে, এমনটাই মত ঊষসীর। আবার উল্টোটাও আছে। বললেন, ‘‘এটাও মানতে হবে, ধারাবাহিকে কিন্তু ‘ফিমেল ডমিনেটেড’ চরিত্রই থাকে। আসলে আমি মূলধারার ছবিতে অভিনয় করিনি, ফলে সেটার দিকটা বলতে পারব না। তবে টেলিভিশন অনেক বেশি গণতান্ত্রিক।’’